ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যুবলীগের হামলায় খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সভা পণ্ড ॥ আহত ১০

খুলনা অফিস : খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদ্য নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভবনে ১ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৫০ টাকা ভুয়া ভাউচার দিয়ে আত্মসাতের বিষয়ে সমিতির সাধারণ সভা যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় প- হয়ে গেছে। এতে এডভোকেট বিধান ও এডভোকেট সোবহানসহ ৮/১০ জন আইনজীবী আহত হন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় আইনজীবীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। আইনজীবী সমিতির সদ্য নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভবনের অর্থ আত্মসাতে অডিট প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে গতকাল সোমবার পঞ্চম সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছিল।
খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বেলা ২টায় সমিতির সভাপতি, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সভাপতি ও পিপি কাজী আবু শাহিনের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। সভায় সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মশিউর রহমান নান্নু স্বাগত ভাষণ দেন। এরপর বহিরাগত যুবলীগের নেতাকর্মীরা ‘জয়বাংলা স্লোগান’ দিয়ে সভাস্থলে প্রবেশ করে। সভার সভাপতি বঙ্গবন্ধু ভবন নির্মাণে চার সদস্যের অডিট কমিটি ১১ জুন জমা দেয়া রিপোর্টের ওপর আলোচনা শুরু করেন এবং বহিরাগতদের বাইরে থাকার জন্য অনুরোধ জানান। তখন সাবেক সভাপতি এডভোকেট সরদার আনিসুর রহমান পপলু বলেন, আজকের সভার খবর স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় আসার কারণে অনেকেই আসছে। তাদের থাকতে কোনো বাধা নেই। একপর্যায়ে যুবলীগের হামলার ছবি তোলার সময় এডভোকেট বিধান ঘোষের কাছ থেকে মোবাইলটি কেড়ে নিয়ে কিল-ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খিস্টান ঐক্য পরিষদের মহানগর সভাপতি বিরেণ ঘোষের ছেলে। হামলার এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে সভার সভাপতি আগামী সোমবার পর্যন্ত সভা মূলতবি ঘোষণা করেন। এতে আপত্তি জানিয়ে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক যুবলীগ ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সরদার আনিছুর রহমান পপলু মাইকে ঘোষণা দেন অডিট প্রতিবেদন সঠিক নয় এ প্রতিবেদন বাতিল করতে হবে। হামলার এক পর্যায়ে উপস্থিত অধিকাংশ আইনজীবী সভাস্থল ত্যাগ করায় সভাপতি সভার কাজ সমাপ্তি ঘোষণা করেন। হামলার সময় সভায় উপস্থিত আইনজীবীরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে। কেউ বা টেবিলের নিচে, কেউ বা বাথরুমে আশ্রয় নেন। নারী আইনজীবীরা বহিরাগতদের ভয়ে চিৎকার করতে করতে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
সমিতির সভাপতি এডভোকেট কাজী আবু শাহীন জানান, অডিট প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থাকায় সাধারণ সদস্যদের মতামত নিয়েই তা  প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোল্লা মশিউর রহমান নান্নু জানান, গতকালের ঘটনা নজির বিহীন। তরুণ এডভোকেট বিধান ঘোষ জানান, বহিরাগতদের মারমুখি ছবি তোলার জন্য তাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। সমিতির সাবেক সভাপতি আনিছুর রহমান পপলু তার মোবাইল কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত হয়। পকেটে থাকা ৪/৫ হাজার টাকাও বহিরাগতরা কেড়ে নিয়েছে। তিনি মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন বলে জানান। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আজ মঙ্গলবার মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
অডিট কমিটির আহ্বায়ক প্রবীণ এডভোকেট এসএম মঞ্জুরুল আলম বলেন, বহিরাগতদের হামলার পরে সভাপতি সাধারণ সভা মুলতবী ঘোষণা করেন। তবে, শুনতে পেয়েছি, তিনি নাকি আবার বহিরাগতদের চাপের মুখে সভা শেষ করার কথা রেজুলেশনে লিখেছেন। এ ধরনের কোন বিধান নেই। তিনি অডিট রিপোর্টের আলোকেই অর্থ আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন।
আয় ব্যয় নিরীক্ষা ও অডিট কমিটির সদস্য, সমিতির সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট এমএম মুজিবর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনজীবী সমিতির সাধারণ সভায় বহিরাগতদের হামলা ছিল নজিরবিহীন। প্রবীণ আইনজীবীরাও জীবন বাচাতে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করেছেন। তিনি হামলাকারীদের চিহিৃত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সাধারণ সভায় যুবলীগের হামলা ও সভা প- প্রসঙ্গে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও মগানগর যুবলীগের আহ্বায়ক এডভোকেট সরদার আনিসুর রহমান পপলু বলেন, সাধারণ সভায় মহানগর যুবলীগের পদধারী কোনো নেতা উপস্থিত ছিল না। তবে, পত্র-পত্রিকায় সাধারণ সভার খবর দেখে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেখানে হামলার মত কোনো ঘটনা ঘটেনি। সভা হট্টগোলের এক পর্যায়ে সভাপতি সভার মুলতবী ঘোষণা করলে আমি ব্যাপারটি নিষ্পত্তি করার দাবি জানাই। সেই আলোকে সভাপতি সভার কার্যক্রম শেষ করেন।
উল্লেখ্য, সদ্য নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভবনে ১ কোটি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৫০ টাকার ভুয়া ভাউচার দিয়ে আত্মসাতের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা আইনজীবী সমিতির চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১১ জুন এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন বারের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। এ কমিটির কর্মকর্তারা ছিলেন-আহ্বায়ক এসএম মঞ্জুরুল আলম, সদস্যবৃন্দ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. আব্দুল মালেক, চিশতি সোহরাব হোসেন শিকদার ও এমএম মুজিবর রহমান। তদন্ত কমিটি ছয় মাস বিভিন্ন ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইট, সিমেন্ট, বালি, পাথর, রড, পাইলিং, টাইলস, গ্রীল, কাঠ, রঙমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রির মজুরির ভাউচার বাস্তবতা বিহীন। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুদানের টাকা খরচের ক্ষেত্রে অবহেলা দেখা যায়। ভবনের কাজে প্রকৌশলীর পরামর্শ নেয়া হয়নি। লিফট ক্রয়ে ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। লিফট ক্রয়ে সরকারি অনুদানের ব্যয়ের শর্তগুলো ভঙ্গ করা হয়েছে। পঞ্চম ও ৬ষ্ঠ তলা নির্মাণে ভাউচারগুলো নিরীক্ষার পর প্রমাণিত হয়েছে অনিয়মতান্ত্রিক ব্যয়। শনি পূজা বাবদ জনৈকা লিলা রাণী সাহাকে ২ হাজার টাকা অনুদান, আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সম্মেলনে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রদান বাবদ ১২ হাজার টাকা অনুদান, জেলা ও দায়রা জজের চিকিৎসা বাবদ ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেখানো হয়েছে। সদ্য বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) হওয়া জেলা ও দায়রা জজ জেসমিন আনোয়ার সীমাহীন নির্লিপ্তভাবে সকল আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। তদন্ত কমিটির কাছে কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে ভুয়া ভাউচার প্রমাণিত হওয়ায় আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদককে গত ১৩ ও ২৪ মে হাজির হওয়ার জন্য দুই দফা চিঠি দেয়া হয়। গত ৩ জুন অডিট কমিটির সামনে হাজির হয়ে কমিটির সদস্য এমএম মুজিবর রহমানের জিজ্ঞাসাবাদে বিজন কৃষ্ণ মন্ডল স্বীকার করেন বঙ্গবন্ধু ভবন নির্মাণে এসকে ট্রেডার্স নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া হলেও তারা কাজ না করায় তিনি নিজে এ দায়িত্ব পালন করেন। অনিয়মতান্ত্রিক ব্যয়ের অভিযোগ সম্পর্কে সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এসকে ট্রেডার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনজীবী সমিতির বঙ্গবন্ধু ভবন নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। ঠিকাদার নির্মাণ কাজ না করায় ২০১৭ সালে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিজন কৃষ্ণ মন্ডল নিজের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ শেষ করেন।
অপরাপর সূত্রগুলো জানান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিজন কৃষ্ণ ম-ল ২০১৭ সালে সমিতির বাজেট সভায় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের খাসির গোশত, ১৩ হাজার ৬শ’ টাকা মূল্যের দেড়শ’ কেজি চালের যথাযথ কসাই ও দোকানের ভাউচার দেখাতে পারেননি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকে জিপি বিজন কৃষ্ণ ম-ল ও তার স্ত্রী ডলি বাছাড়ের নামে ১ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র কেনা রয়েছে। তিনি আয়কর দেন না।
২০১৭ সালের কমিটিতে সরদার আনিসুর রহমান পপলু সভাপতি ও বিজন কৃষ্ণ ম-ল সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ সম্পাদক গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি)’র দায়িত্ব পালন করেন। গেল বছরের ২৭ নবেম্বর জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে বহিরাগতদের চাপ ও অস্ত্র প্রদর্শনের মুখে সভাপতি পদের ফলাফল পরিবর্তন হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ