ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সুলতানা রাজিয়া ছিলেন এক মহিয়সী নারী

মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীন এর নারী নেত্রী জয়নব আল গাজালী ছিলেন একজন আল্লাহর খাঁটি মুসলিম নারী। কেবলই ইসলাম পালন করা আর মহান আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকা এটাই ছিলো তার অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন “মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর উপর ইমান আনা ছাড়া এদের উপর জালিমদের নির্যাতনের আর কোন কারণ ছিলো না। এ নারীর উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল তার বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছিলেন। সে নারী সম্পর্কে লিখেছিলাম “শতাব্দির শ্রেষ্ঠ নারী জয়নব আল গাজালী আমাদের প্রেরণার উৎস”। লেখাটি ২০০৫ সালে সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় ছাপা হয়। সেখানে বলেছিলাম “অনিয়ন্ত্রিত আবেগের কারণে বলতে ইচ্ছে করে জয়নব আল গাজালী তুমি আমাদের প্রেরণার উৎস, মাগো তুমি কোথায় আসো না তোমায় একটু সালাম করি।” এর পর দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ছবিসহ তার একটি সাক্ষাৎকার ছাপে যেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল “এত নির্যাতন সইলেন কি ভাবে”? উত্তর দিয়েছিলেন সবই সম্ভব চাই কেবল দৃঢ় প্রত্যয়ের ঈমান। আমি একদিন স্বপ্নে দেখি আল্লাহর রাসূল (সা.) হেঁটে এসে হাসান তুরাবিকে বলছেন তুরাবি জয়নব আল গাজালীকে আমার সালাম পৌঁছে দিও। এরপর থেকে জালিমরা আমার উপর যত রকম নির্যাতন করেছে তা আমার গায়ে লাগেনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে সালাম পাঠিয়েছেন আমি আর কি চাই। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়াকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘এত নির্যাতন সহ্য করেন কিভাবে?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘যখন আমি নির্যাতন সইতে না পারি এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন আমার আল্লাহ আমার চোখের সামনে জান্নাত তুলে ধরতেন তখন আমি সব ভুলে যেতাম।” উপর্যুক্ত কথাগুলো তুলে ধরলাম এজন্য যে আমাদের দেশেও আজ নারীরা চরমভাবে অবহেলিত এবং নির্যাতিত হচ্ছে। ইসলামী দাওয়াতী কাজের অপরাধে শত শত নারীকে গ্রেফতার করে থানা ও জেলের গারদে অমানবিকভাবে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। পর্দানশীন নারীদের জন্য এর চাইতে কষ্টের আর কি হতে পারে। এ সকল নারীদের একজন যোগ্য অভিভাবিকা বাংলাদেশ নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেত্রী সাবেক সংসদ সদস্য সুলতানা রাজিয়া। কিছুদিন পূর্বে আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। পত্রিকার পাতায় খবর দেখে নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হলো উপরন্ত তাঁর বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা জান্নাতী ম্যাডাম ফোন করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এতে আরো মর্মাহত হই। ভেবেছিলাম এ মহিয়সী নারী সম্পর্কে কারো একটা লেখা পাবো কিন্তু এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি। জীবিত থাকা অবস্থায়ই তার সম্পর্কে কিছু লিখতে চেয়েছিলাম তা লিখা হয়নি কারণ জীবিত মানুষের গুণাবলী নিয়ে লিখা সঠিক মনে করিনি। একদিক দিয়ে এ নারীর ব্যক্তিত্ব ও চলা ফেরা, শিক্ষা দীক্ষা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ঐ জয়নব আল গাজালীর মতো অন্যদিকে তার সাথে ছিলো মাতৃস্নেহের সম্পর্ক তাই লিখতে চেয়েছিলাম জয়নব আল গাজালীকে দেখিনি দেখেছি তোমাকে। লিখতে পারিনি কারণ এ নারী এতই আল্লাহওয়ালা ছিলেন তার সামনে কারো দোষ বলা এবং তার প্রশংসা করা হলে তিনি এতটাই মনক্ষুণ্ণ হতেন যে আমরা আর লজ্জিত না হয়ে পারতাম না। তিনি ছিলেন সকল মানুষের বড় আপা। আমার, আমার স্ত্রীর এমন কি সন্তানদেরও বড় আপা। এটা হয়েছে এ জন্য যে তিনি দুটি স্কুল পরিচালনা করতেন অর্থাৎ এর মালিকও প্রধান শিক্ষিকা। আর দুটি স্কুলেরই সকল শিক্ষক ছিলেন বা আছে নারী। সকল শিক্ষিকারা হচ্ছেন আপা আর তিনি হচ্ছেন বড় আপা। সে থেকে, ছাত্র-ছাত্রীদের বড় আপা, অভিভাবকদের বড় আপা, সাংগঠনিক নারী পুরুষদের বড় আপা অর্থাৎ সকল মানুষ এমন কি সমাজের মানুষদেরও বড় আপা। আমার সাথে মা আর সন্তানের সম্পর্ক থাকার পরও তিনি ছিলেন আমার একান্ত আপন বড় আপা। তার পারিবারিক জীবন ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা থাকলে সে থেকে আমরা কিছুটা হলেও অনুপ্রেরণা পেতাম। কিন্তু এ মহাজ্ঞানী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দী সম্পর্কে লিখার কোন যোগ্যতাই আমার নেই। কেবল একটু ধারণা দিতে চাই। রাজধানীর শ্যামপুর হাইস্কুলের একা ধারে ২৫ বছর প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনাব মোয়াজ্জেম হোসাইন এ ভদ্রলোক হলেন এ নারীর যোগ্যতম স্বামী। সুলতানা রাজিয়া বলেন “আমি ইসলামী আন্দোলনের কোন কর্মী ছিলাম না। এলাকার এক নারী যিনি জামায়াতে ইসলামী করতেন তিনি প্রায়ই আমার বাসায় এসে আমার বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। বিশেষ করে আমার ছোট ছেলে দুটিকে টয়লেটের কাজ সেরে গোসল নাস্তাসহ সব কিছু করে দিতেন। প্রায়ই আমি ভাবতাম এতবড় শিক্ষিত নারী এবং এলাকার বাড়িওয়ালা ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী সে কেন নিজের ইচ্ছেয় আমার এত উপকার করছে। তার প্রতি দুর্বল হয়ে গেলাম এবং এক পর্যায় জামায়াতে যোগাদান করলাম। এর পর আমিও একটি এমপিওভুক্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলাম। একদিন ঐ স্কুলে ঢোল, তবলা হারমোনিয়াম দেওয়া হলো আমি বললাম এগুলো আমার স্কুলে নিবো না টিও সাহেব বললেন আপনি নিয়ম মানতে বাধ্য অমনি তাকে বললাম আমি আর চাকরি করবো না গান বাজনা আমার স্কুলে চলবে না যেখানে গানবাজনা ছাড়া স্কুল চালানো যায় সে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হবো। এরপর নিজে তৈরি করি শনির আখড়ায় “ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন” এবং রায়ের বাগে ফুলকলি কিন্ডারগার্টেন”। কলামিস্ট এর কন্যা সুমাইয়া ও পুত্র আসাদুল্লাহ খান গালিব ফুলকলি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে এ নারীর সাথে সম্পর্ক শুরু হলেও এরপর হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমাকে কতটা ¯েœহ করতেন তা একটি ঘটনা থেকেই বুঝা যাবে। চার দলীয় জোট সরকার ২০০১-২০০৬ মেয়াদের জন্য এ নারীকে সংরক্ষিত মহিলা আসল জামালপুর থেকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মনোনিত করে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে যোগদান করতে গেলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে প্রথমেই কি বলবেন তা জিজ্ঞেস করলেন আমার নিকট। আমি বললাম তারা জিজ্ঞেস করবে সংসদ সদস্য হয়ে আপনি কি করবেন? আপনি বলবেন নির্যাতিতা অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের মুক্তির জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবো। এ ভদ্র মহিলাকে এ প্রশ্নটাই করা হয়েছে এবং ঠিক এ উত্তরই দিয়েছেন। সংসদে হিজাব পরা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল “আপনি কি সকল নারীকে হিজাব পরাতে চান? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন না কেবল অনুভুতি সৃষ্টি করতে চাই। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য এ নারীর পারিবারিক জীবনও অত্যন্ত সুখের। তিনটি ছেলের মধ্যে একজন বিমানের বড় কর্মকর্তা, একজন ডাক্তার ও একজন ইঞ্জিনিয়ার। দুটি মেয়ের একজন ইংরেজির প্রফেসর ছোটটা আমার মেয়ের নেত্রী ছিলো তার অবস্থা জানি না। রায়ের বাগ এলাকার নারীরা তাঁর ভক্ত ছিলো আরো একটি কারণে তার স্কুলে প্রায়ই নারীদের দ্বীন শিক্ষার আয়োজন করা হতো সেখানে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব বলে এমন সব নারী নেত্রীদের উপস্থিত করাতেন সাধারণ নারীরা যাদের সাক্ষাৎ পাওয়ার আশাই করতে পারে না যেমন বেগম সামসুন্নাহার নিজামী, তামান্না-ই জাহান মুজাহিদ, খোন্দকার আয়শা খাতুন, হাসনা হেনা, ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, হাফেজা আসমা খাতুন এবং শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার পেয়ারীসহ আরো প্রথিতযশা নারী নেত্রী। এমনি ভাবে এ মহিয়সী নারী কেবল একজন নারীই ছিলেন না তিনি ছিলেন জাতির শিক্ষক, আল্লাহর পথের নিবেদিত প্রাণ একজন দায়ী ও সমাজ সেবিকা। নির্যাতিত নিপীড়িত অবহেলিত এবং সন্তানদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহী ব্যক্তিরা চোখে পানি মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছেন আর বলছেন বড় আপা নাই আমাদের কি হবে? কলামিস্ট কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না এর চেয়ে বেশি বলতে পারলাম না যে একজন নারীর চলে যাওয়া নয় একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল।
-খান মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ