ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বস্ত্র বালিকাদের গল্প

রহিমা আক্তার মৌ : ঘড়িতে তখন রাত ৮টা ১৪ মিনিট, ঢাকা আরিচা মহাসড়কের সাভার থানা বাস স্ট্যান্ডের  কাছাকাছি। ব্যক্তিগত  গাড়িতে ঢাকার তেজগাঁও থেকে রওয়ানা দিয়েছি সন্ধে ৭টা ১৫ মিনিটে। এখানে আসতে পুরো ঘন্টা খানেক। আমাদের যাবার গন্তব্য জাহাঙ্গীরনগর হাউজিং সোসাইটি মায়ের বাসায়।
সামনে একটু জ্যাম মনে হলো। ভেবেছি হয়তো অনেকক্ষণের জন্যেই আটকা পড়লাম। কিন্তু তা নয়, ৮/১০/৬ মিনিট করে তিনবার গাড়ী থেমে থেকেই আবার চলতে শুরু করে। প্রথমে খেয়াল করিনি, পরে দেখি রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ভাবে হেঁটে যাচ্ছে আমাদের পোশাক শ্রমিকরা। যারা সকাল থেকে রাত অবধি মাথার ঘাম ঝরিয়ে হাজার হাজার মেশিন চালিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে যাচ্ছে। গার্মেন্টসগুলো ছুটি হয়েছে, দল বেঁধে পোশাক শ্রমিকরা বের হয়েছে, ওদের রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে পার করে দেবার জন্যেই রাস্তার গাড়ী বন্ধ করে শ্রমিকদের পার করে দিচ্ছে। দেখে খুব ভালো লাগলো।
ওরা এখন হেটে হেটে বাসায় যাবে। যাদের বাসা দূরে তারা হয়তো একটু সামনে গিয়ে লোকাল বাসে চড়বে। সে বাস থেমে থেমে যাবে অনেক পরে, হয়তো কারো কারো পৌছাতে রাত ১০ টাও বাজতে পারে। রাত হলেও গাড়ি থেকে নামার কিছু সুযোগ ছিলো, তাই গাড়িকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নেমে যাই। কিছুক্ষন ওদের দেখি। কারো একহাত খালি,কারো দুইহাতই খালি। কার কাঁধে ব্যাগ, কারো হাতে খাবারের বক্স। আবার কারো হাতে ৩/৪ বক্সের টিফিনকারি। একটু কথা বলার সুযোগ খুঁজছিলাম,  আবার ভাবছি এত রাতে ওরা কি কথা বলবে। সবার বাসায় ফেরার তাড়া, আমার মতো রাস্তার পাশে তো ওদের জন্যে গাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। চেষ্টা করি কয়েকজনের সাথে কথা বলতে...
॥ ১ ॥
সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ২০/২২ বছরের ছেলেটি। মনে হচ্ছে কারো জন্যে অপেক্ষা করছে। একটু কথা বলা যাবে, জ্বী। কারো জন্যে অপেক্ষা করছো। হ্যাঁ, বোনের জন্যে। সাথে সাথে বোন আসে। ওর নাম বিপ্লব, বোনের নাম নাবিলা। দুজন দুই গার্মেন্টস এ কাজ করে। বিপ্লব গত পাঁচ বছর যাবত আছে সাভারে। গ্রামে মা আর ছোট বোন ছিলো, দুই বছর আগে বোনের জন্যে একটা কাজের ব্যবস্থা করে। সেই থেকে মা আর বোন সাভারের আরাপাড়ায় থাকে। নাবিলা বলে,,,,
“আগে অনেক কষ্ট হতো হেঁটে হেঁটে আসতাম দুই ভাই বোন। চার মাস আগে এই আধা পুরানো সাইকেলটা কিনি দুই ভাইবোন মিলে। এখন একসাথে সাইকেলে চড়ে আসি, আবার সাইকেলে চড়ে যাই বাসায়। এখন পাশাপাশি গার্মেন্টস এ কাজ করলেও দুমাস পর একই গার্মেন্টস এ কাজ করবো।” দুই ভাইবোনের রোজগার থেকে জমা করতে পারে কিনা জিজ্ঞেস করায় বিপ্লব বলে,,, “সামান্য কিছু রাখি, বোনটাকে বিয়ে দিতে হবে যে।” নাবিলা বলে,, “আমাদের মা ও বাসার পাশে এক টেইলর এর দোকানে সামান্য কাজ করে।”
॥ ২ ॥
বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে বিলকিস, সামনে গিয়ে কথা বলতে চাইলে হেসে উঠে বলে,,, “আমার সাথে আবার কিসের কথা।” বিলকিসের হাতে চার বাটির একটা টিফিনকারির সেট। প্রশ্ন টা এটা নিয়েই। এতবড় টিফিন কারিতে করে কি নিয়ে আসো? বিলকিস পাশের গার্মেন্টস এ কাজ নেয় দেড় বছর আগে, একই ঘরে বিধবা বোন সহ থাকে। বোনের বাচ্চা আছে বলে কাজ করতে পারে না। তবে বিলকিসের সাথে কাজ করে এমন তিনজনের জন্যে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে বিলকিস বাসা থেকে। বিধবা বোন রান্না করে দেয়। মাস শেষে অফিসের সেই তিন শ্রমিক হিসাব করে কিছু টাকা দিয়ে দেয়। সেই টাকা পায় বিলকিসের বিধবা বোন। বিলকিসের বাসা রেডিও কলোনি থেকে ভিতরের দিকে। রেডিও কলোনি বাস স্ট্যান্ড থেকে অনেক টুকু হেটে যেতে হয়। তাই এইটুকু বাসে গেলে কষ্ট কম হয়। সকালে ওদিক থেকে গার্মেন্টস এর বাস আসে, সেই বাসেই চলে আসে।  আসার সময় নিজের আর বাকি তিনজনের খাবার নিয়ে আসে।
॥ ৩ ॥
মাথায় কাপড় দিয়ে অনেকটাই ঘোমটা দেয়া নাহিদার। কথা বলতে চাইলে প্রথমে একটু নিষেধ করে। অন্যরা কথা বলেছে,এমনটা বলার পর একটু দাঁড়ায়। মাত্র তিন মাস হয়েছে নাহিদা ঢাকায় এসেছে। অবশ্য দুই বছর আগে সে ঢাকার আজিমপুরে গৃহশ্রমিক হিসাবে তিন বছর থাকে। ভালো লাগেনা বলে গ্রামে যায়। গ্রামে অভাব লেগেই আছে। মা ভাই আর ভাইয়ের বউদের কথা শুনতে হয় প্রতিমুহূর্তে। তাই বাধ্য হয়ে পাশের বাড়ির এক মহিলার সাথে চলে আসে সাভারে। সে মহিলা একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করে। নাহিদাকে এই গার্মেন্টস এ কাজ নিয়ে দেয়। পাশের গার্মেন্টস আর ওর গার্মেন্টস এর ৬ টা মেয়ে মিলে ওরা একটা রুমে থাকে। সকালে ভাত খেয়ে আসে,দুপুরের জন্যে একটু নিয়ে আসে। এখন বাসায় ফিরে রান্না করবে। একদিন একেক জনের রান্নার কাজ করতে হয়। ওরা যে বাড়িতে থাকে, সে বাড়িতে এমন ৫টা রুম, সব রুমে ওদের মতো মেয়েরাই থাকে। যারা টাকা বেশি দিতে পারে তাদের রুমে ৩/৪ জন করে থাকে। চুলা দুইটা।
বাড়িতে যত রুম তত ঘর হিসাবে রান্না করে। মোট ২২/২৩ জন হবে ওরা। সবাই বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। সবার মাঝে নাহিদাই নতুন। দ্রুত বাসায় না গেলে অন্যরা চিন্তা করবে বলে চলে যায়।
॥ ৪ ॥
প্রায় ২৩/২৪ বছরের এক পোশাক শ্রমিককে দেখছি একটু খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটতে। ওর দিকে তাকিয়েই বুকের ভেতরটা কেমন যেনো করে উঠে। ও কি তাহলে,,,,,,
 আরেকটা মেয়ে হাত ধরে ধরে হাটছে। ওর বয়স হবে ১৫/১৬। কাছে গিয়ে কথা বলার অনুমতি চাই। তেমন বাঁধা দেয়নি। ওর নাম আকাশী, হাত ধরে যে আছে,তার নাম শেফালী।  ওরা দুই বোন। থাকে সাভার ব্যাংক কলোনি। আকাশী আর ওর স্বামী হালিম আগে রানা প্লাজায় একটা ফ্যাক্টরিতে চাকরী করতো। সেই দুর্ঘটনায় আকাশী একটা পায়ে আঘাত পায়। স্বামীর কি হয়েছে জানেনা। আকাশীর পরিবার ভেবে ছিলো আকাশী মারা গেছে। কিন্তু অনেকদিন চিকিৎসা করার পর বেঁচে উঠে। একটা মেয়ে আছে ওর। ঘরে এখন মা আছে। মেয়েটা মায়ের কাছেই থাকে। দুই বোন এখন এখানকার একটা পোশাক কারখানায় কাজ করে। কথা গুলো শুনে কেমন চেনা মনে হলো।
ওরা কি তখন ব্যংক কলোনি মাদ্রাসা মসজিদের উত্তর পাশে ছিলো কিনা বলাতে বলল,,,  হ্যাঁ ছিলাম। বয়স্ক একটা মহিলার বর্ণনা দিলাম। মিলে গেলো। তার মানে ওরা আমার কিছুটা পরিচিত।  পরিচিত বললে ভুল ও হতে পারে। রানা প্লাজা ভেংগে পড়ার প্রায় ৮/১০ দিন পর আমি সাভারে যাই। মা আর আমি বাসা থেকে কিছু দূরে যাচ্ছিলাম। এক বয়স্ক মহিলা ছোট একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দ্রুত যাচ্ছে। মা জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাচ্ছেন। বলল,, মেয়ের খোজ পেয়েছি, ও নাকি হাসপাতালে আছে। মা বাচ্চাটার হাতে কিছু টাকা দেয়, আর মহিলাকে রিকসায় তুলে ভাড়াটা দিয়ে বলে,,,
উনাকে এনাম হাসপাতালে নিয়ে যান। সব হিসাব মিলে যায়। এই আকাশীই সেই বয়স্ক মহিলার মেয়ে। যার খোঁজ পেয়ে সেদিন তিনি দ্রুত যাচ্ছিলেন।
আকাশী আর শেফালীকে রিকসায় যেতে বললাম, বলল,,, লাগবেনা, আস্তে আস্তে হেঁটেই যাব। সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। এখন হেঁটে যাওয়া ভালো। হাঁটার দরকার আছে। এই বলে ওরা চলে গেলো।
আমরা গাড়িতে উঠি। গাড়ি চলতে শুরু করলো সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ডের দিকে। রানা প্লাজার খালি জায়গাটার সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছি, মনে হচ্ছে সেই চিৎকার কানে ভেসে আসে। আস্তে আস্তে পুরানো মার্কেট পার করে সামনে যাই। কি ছিলো এই সাভার,আর আজ কি হলো।
রাস্তার দুই পাশে বহুতল ভবনের শপিংমল গড়ে উঠেছে। এগুলোকে সাজিয়ে রেখেছে হরেক রকমের সাজসজ্জা দিয়ে। কখনো কখনো এগুলোর পাশে গাড়ি রেখেছি,কিছু কেনাকাটা ও করেছি। কিন্তু আজ আর তা ইচ্ছে করে না। আকাশী, শেফালী, নাহিদা,বিলকিস, নাবিলা ও বিপ্লব এর কথা খুব মনে পড়ছে। ক্লান্ত শরীরে ওরা ছোট্ট ঘরে ফিরবে আপন জনের কাছে। রাতের খাবার হিসাবে বরাদ্দ খাবারটুকু খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে আবার সেই কাক ডাকা ভোরে উঠবে বলে।
ওরা কাজ করে,  কাজের মূল্য হিসাবে মজুরিটা চায়, কখনো পায় কখনো আবার তার উপর ভাগ বসায় অন্য কেউ। দেশ কি পাচ্ছে ওদের কাছে, কি দিচ্ছে ওদের এত হিসাব ওরা বুঝে না। ওদের মতো হাজার হাজার শ্রমিকের শ্রমেই আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, তার খবর ও ওরা রাখে না। আমরা ওদের শ্রমিক বলি,রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে তাকিয়ে থাকি, হয়তো কেউ ভাবি কেউ ভাবিনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ