ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়াকে আটকিয়ে রাখতে উচ্চতর আদালত সরকারকে সহযোগিতা করছে

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পথসভায় হাত বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা সরকারের ‘ব্লেইম গেম’ বলে পাল্টা অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যের জবাবে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আমরা নাকী জনগণের কাছে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে এখন ব্লেইম গেম করছি। একটা অডিও বেরিয়েছে আমাদের দুই নেতার মধ্যে কথোপকথনের এবং যেটার ওপর ভিত্তি করে তারা (পুলিশ) আমাদের রাজশাহী জেলার সেক্রেটারি মন্টু সাহেবকে গ্রেফতার করেছে। আমরা যেকোনো সভা করার আগে খুব ভয় পাই। কেন ভয় পাই জানেন, ওই যে ব্লেইম গেম। ওরাই পটকা মারবে, পটকা মেরে-টেরে বলবে যে আমরা পটকা মেরেছি। সরকার এইসব খেলা খুব ভালো জানে, তারাই এই খেলা খেলতে অভ্যস্ত। আমরা খুব পরিস্কার করে বলতে চাই, এই ব্লেইম গেমটা করছেন আপনারা আমাদেরকে ব্লেইম করার জন্য। সিটি নির্বাচনে নিজেদের অপপ্রচার ঢাকতেই বিএনপির নামে খেলার অপপ্রচার চালাচ্ছে সরকার।
এ সময় বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলন, বিচার বিভাগের ওপরে কীভাবে আস্থা রাখবেন। হাইকোট জামিন দেয়ার পর যেটা উচ্চতর আদালত স্থগিত করে দেয়ার নজির নেই। আমরা স্পষ্ট দেখতে পারছি, সব মানুষ দেখতে পারছে যে, আজকে বেগম খালেদা জিয়াকে আটকিয়ে রাখার ব্যাপারে উচ্চতর আদালতও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। সরকারের আশা-আকাংখা প্রতিফলন আমরা তাদের এই আদেশগুলোর মধ্যে দেখতে পারছি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) উদ্যোগে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তি এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এই আলোচনা সভা হয়।
সংগঠনের সভাপতি ফরিদুজ্জামান ফরহাদের সভাপতিত্বে ও প্রেসিডিয়াম সদস্য অহিদুর রহমানে পরিচালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির নিতাই রায় চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) আহসান হাবিব লিংকন, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, ডিএলের সাইফুদ্দিন মনি, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, লেবার পার্টির একাংশের হামদুল্লাহ আল মেহেদি, এনপিপির মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, কেন্দ্রীয় নেতা বেলাল আহমেদ, নজরুল ইসলাম,হারুন-অর রশীদ, মো. ফরিদউদ্দিন প্রমুখ বক্তব রাখেন।
সোমবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, নানা রকম খেলাও শুরু হবে। এতে কোনো সন্দেহ নাই। তারা যখন নির্বাচনে জনগণের কাছে যেয়ে সাড়া পাচ্ছে না, তখন এই ব্লেইম গেম খেলা শুরু এবং হাতে নাতে ধরা পড়েছে।
রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টুকে একদিন আগে গ্রেফতারের পর পুলিশ জানিয়েছে, তিনি দলের প্রার্থী বুলবুলের পথসভায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফায়দা তুলতে চেয়েছিলেন। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর সঙ্গে মন্টুর কথিত ফোনালাপের একটি অডিও পাওয়ার কথাও পুলিশ জানায়।
রাজশাহীর দলের দুই নেতা কথিত অডিওকে ‘সাজানো’ উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকাল প্রযুক্তির যুগটা আমরা এতো ভালো করে বুঝি, মানুষ এতো ভালো বুঝে যে, আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলাপও তৈরি করে দেয়া যাবে। কোনো কঠিন কাজ না, সো সিম্পল। আপনারা নিজেরা ভালো করে জানেন-ফেইসসবুক দেখছেন, না দেখছেন না। কার কত রকমের কী সমস্ত বেরুচ্ছে কাটুনে, এর গলা ওর কাছে, এর গলা ওখানে। এটাই তো করেছেন আপনারা। আপনারা করেন না এরকম কাজ তো নেই।
একটা সোজা হিসাব আমরা নির্বাচন করছি তার একটা মিটিংয়ের মধ্যে আমার দলের লোক বোমা মারবেÑএটা কেউ বিশ্বাস করবে? কেউ বিশ্বাস করবে না। আপনারা আমাদের মন্টু সাহেবকে ধরবেন, অন্যান্যকে ধরবেন এজন্য বোমা মেরেছেন। মেরে গিয়ে ধরেছেন। ২০১৩ সালে নয়া পল্টনে দলের সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ, পুলিশের গুলীবর্ষণ এবং রাতে দলীয় কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান চালিয়ে নিজেসহ ১৫৪ জন নেতা-কর্মী গ্রেফতারের ঘটনা সরকারের ‘সাজানো খেলা’ ছিলো বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
তিনি বলেন, ব্লেইম গেম। তাহলে ওইদিন কী আমার মিটিং ভাঙার জন্য আমি পটকা ফাটিয়েছিলাম? আজকে এই কথাগুলো বলছেন কেনো? জনগনকে বিভ্রান্ত করতে। এতো ভয় পেয়েছেন কেনো, এতো ভীত হয়েছেন কেনো ? এখন মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জনগনকে সম্পূর্ণভাবে বোকা বানিয়ে আপনারা মনে করেন যে, আপনারা পার পেয়ে যাবেন। মানুষ এতো বোকা না। সব বুঝে মানুষ। প্রত্যেকটা মানুষ বুঝে আপনার কী করছেন? তাদের মনের মধ্যে ঠিকই ঠিকই আগুন জ্বলছে কখন আপনারা যাবেন, কখন পরিবর্তনটা হবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে জনগনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবানও জানান ফখরুল।
বিচার বিভাগ দলীয়করণের কঠোর সমালোচনাও করেন বিএনপি মহাসচিব। খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকিয়ে রাখা হয়েছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রীকে জামিন দিচ্ছে না যেটা তার প্রাপ্য, আইনগত প্রাপ্য। তিনি যখন জামিন পেলেন হাইকোর্টে। পরে অ্যাপিলেট ডিভিশন তা আটকিয়ে দিলো? কার ওপর আস্থা রাখবেন। বিচার বিভাগের ওপরে কীভাবে আস্থা রাখবেন। হাইকোট জামিন দেয়ার পর যেটা উচ্চতর আদালত স্থগিত করে দেয়ার নজির নেই। আমরা স্পষ্ট দেখতে পারছি, সব মানুষ দেখতে পারছে যে, আজকে বেগম খালেদা জিয়াকে আটকিয়ে রাখার ব্যাপারে উচ্চতর আদালতও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। সরকারের আশা-আকাংখা প্রতিফলন আমরা তাদের এই আদেশগুলোর মধ্যে দেখতে পারছি।
গণমাধ্যমের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ প্রবল উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা অনলাইন পত্রিকা সবচাইতে জনপ্রিয় অনলাইন। একটা বাক্য লেখার জন্য সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। আমি ওই অনলাইনের নাম বলতে চাই না। একটা টেলিভিশন চ্যানেল কিছু সত্য কথা বলার কারণে তার মালিকের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়া হলো। কোথায় যাবেন? এরকম একটা পরিস্থিতি চলছে।
কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের দমননীতির সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কোটা আন্দোলন বন্ধ করার নামে এখন প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্যরা বলতে শুরু করেছেন যে, আসলে তারা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। ওই একটা আছে টোটকা। ওইটা দিয়ে আর কাজ হবে না। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও ওইসব টোটকা ওষুধ বিক্রি হবে না, বেশির জনগণ খাবে না। এদেশের ৭ কোটি মানুষের বেশিরভাগ স্বাধীনতার মানুষ যুদ্ধ করেছেন। তখনও একরকম আপনারা ওইসব কথা বলেছিলেন।
নির্বাচনের প্রসঙ্গ মির্জা ফখরুল বলেন, গত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রমাণ হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ থাকলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সুতরাং দিস গর্ভমেন্ট মাস্ট গো বিফোর ইলেকশন। আমরা সেই সময়ে একটা নিরপেক্ষ সরকার চাই, যে সরকার কোনো দলের পক্ষে না হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করবে। কী করছেন এখন আপনারা? প্রত্যেকটা নির্বাচনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। কখনো ৭/৮ আগে মিথ্যা মামলা দিয়ে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছেন। সোমবার সিলেটে দুইকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রার্থীসহ নেতা-কর্মীরা সিএমপি অফিসের সামনে অবস্থান ধমর্ঘট করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাঁধা দেয়ার মামলা হয়েছে। রাজশাহীতে একই ঘটনা ঘটছে। বরিশালে জামায়াত যতক্ষন প্রার্থী ছিলেন ততক্ষণ কিছু করেনি। যখনই জামায়াত প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে তখনই তার সেক্রেটারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশের মানুষ বলছে এই অবস্থা চলতে যাবে না। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিতে এতো ভয় কিসের? কিসে এতো ভীতু? এতোই যদি উন্নয়ন করে থাকেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে থাকেন তাহলে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিন। জনপ্রিয়তা দেখা যাবে? মনে রাখবেন, বিএনপির আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা দলকে ক্ষমতায় বসাতে নয়। বরং বিএনপি আন্দোলন করছে দেশের জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফখরুল বলেন, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনা কোন কিছু দিয়ে দেবে না, শক্তিমত্তা দিয়ে নিয়ে নিতে হবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া গণসংবর্ধনার সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা প্রায়ই বক্তব্যে বলি ঘরে বসে আর বক্তব্য দিতে চাই না, তারপরও দিতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঘরটাও আমাদের দিতে চাচ্ছে না। গণতন্ত্রের জন্য গণতন্ত্রকামীদের কোথাও দাঁড়াবার জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ উনারা (ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ) গণসংবর্ধনা নিবেন, সম্মেলন করবেন, তাদের শরিকরা সম্মেলন সভা করবেন। কিন্তু বিএনপিকে অনুমতি দেওয়া হবে না, তা চলতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ