ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সোনা হয়ে গেলো সংকর ধাতু অর্থমন্ত্রী বললেন কিছু না

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা সোনার চাকতি হয়ে গেলো মিশ্র বা সংকর ধাতু এ নিয়ে সারা দেশে যখন তোলপাড় তখন অর্থমন্ত্রী বললেন এটি কোন বড় ঘটনা নয়। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয় এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কথা বলা উচিৎ হয়নি। এ ঘটনায় কোনও কমিটির দরকার নেই। অবশ্য এর আগেও সোনালি ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিকেও বলেছিলেন এটি কোন বড় টাকা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কত টাকা (কত বড় দুর্নীতি) বড় টাকা অর্থমন্ত্রীর কাছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর এম বক্তব্যে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হচ্ছেন। আর এ কারণেই একের পর এক দুর্নীতি ঘটনা ঘটছে।
গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শেষে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা গরমিল ইস্যুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা নিয়ে এনবিআরের কোনও কথা বলারই প্রয়োজন ছিল না। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সোনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকই সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে আপনি কোনও কমিটি করবেন কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এজন্য কোনও কমিটির দরকার নেই। যা করার বাংলাদেশ ব্যাংকই করবে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ৯৩৬ কেজি সোনার মধ্যে দূষিত সোনার পরিমাণ মাত্র তিন কেজি। তাও পুরোটা নয়। কাজেই এটি বড় কোনও সমস্যা নয়। জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি এখানে বলবো না। পরে অন্যসময় বলবো।
তিনি বিদেশ থাকা কালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টের সোনা কেলেঙ্কারি মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। এ ঘটনায় অর্থপ্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, মন্ত্রী বিদেশে রয়েছেন। তিনি দেশে এসে ব্যবস্থা নিবেন। প্রয়োজনে তিনি তদন্ত কমিটি করবেন।
কিন্তু তিনি বিদেশ থেকে এসে বলছেন আগে সেই কথাই। এটি কোন বড় ঘটনা নয়। তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ব্যাপার। তারা চাইলে তদন্ত করতে পারেন। এ ব্যাপারে কথা বলায় এনবিআরের ওপর ক্ষিপ্ত মন্ত্রী। অথচ এই সোনার মালিক হলো এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। তারা তাদের রাখা চাইতেই পারে। যারা স্বর্ণ চুরি করলো কিংবা সোনা হেরফের করলো তাদের সমালোচনা না করে উল্টো এনবিআরের সমালোচনা করলেন অর্থমন্ত্রী। এর কারণ কি? তার ক্ষোভ হলো কেন এ ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ পেলো। আর এনবিআর কে এ ব্যাপার নিয়ে কথা বললো।
এর আগে অবশ্য হলমার্কে ৪ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিকে বড় কোন ঘটনা না। এ কথা বলে তিনি তখন দুঃখ প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ঘটনায় তিনি আবারও একই কথা বললেন।
তখন সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদমাধ্যম এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুলাই ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভূতুড়ে কান্ড’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার চাকতি ও আংটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখার পর তা মিশ্র বা সংকর ধাতু হয়ে যায়। এছাড়া, ২২ ক্যারেটের সোনা ১৮ ক্যারেট হয়ে যায় বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
 সম্প্রতি জনতা ব্যাংকে ৫১৩০ কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলো তিনি কোন উত্তর দিতে রাজি হয়নি। কেন তিনি উত্তর দিতে রাজি হলেন না এ প্রশ্ন এখন গণমাধ্যমে। সাংবাদিকরা বলাবলি করছেন অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা কিছুই না। তাই তিনি কোন উত্তর দিতে রাজি হননি।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সোনালি ব্যাংকের চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি কোন বড় ঘটনা না। একই ভাবে ভল্টের তিন কেজি সোনা কোন সোনা না। জনতা ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে তিনি কথা বলতে রাজি নয়। তাহলে কত টাকা বড় টাকা। আর কত টাকার দুর্নীতি হলে তিনি কথা বলবেন। কোন দুর্নীতির বিচার হলেই আরও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। ভল্টের ঘটনা আর জনতা ব্যাংকের ঘটনা তার ই প্রমান বহন করে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে এক ভরি সোনা হেরফের হওয়ায় বড় ঘটনা। কিন্তু আমাদের অর্থমন্ত্রী এটিকে বড় ঘটনা বলতে রাজি নন। ভল্টের কত স্বর্ণের মানে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা কে পরীক্ষা করেছে। তাহলে তিনি কিভাবে বলছেন ৩ কেজিতে সমস্যা কোন বড় ঘটনা নয়। উনি পারলে রির্জাভ এবং ভল্টের সব সোনা পরীক্ষা করে দেখাক। সোনার চাকতি ও আংটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখার পর তা মিশ্র বা সংকর ধাতু হয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ভল্ট হলো সব চেয়ে বড় নিরাপত্তার জায়গা। এখান থেকে এক তোলা সোনা হেরফের হওয়াও বড় ঘটনা। এখান থেকে এক ভরি চুরি হওয়া আর এক টন চুরি হওয়ার ঘটনা সমান অপরাধ। আসলে ভল্ট থেকে কত সোনা হেরফের হয়েছে তা কে বলতে পারবে।
সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে বৗবস্থা না নিয়ে উল্টো ব্যাংকটির মুখপাত্রকে সরিয়ে দিলেন। তার অপরাধ হলো তিনি মিডিয়ার সাথে কথা বলেছেন। অথচ ভল্টের দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা এখনও বহাল তারবিয়তে রয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় সরকার বিষয়টিকে সাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য। তার এই বক্তব্যে দেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি আরও বাড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ