ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সৈয়দপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার

নীলফামারীর সৈয়দপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় নির্মিতব্য ঘরের জন্য পিলার তৈরি করা হচ্ছে

মোঃ জাকির হোসেন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা : নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রকল্পে নি¤œ মানের উপকরন ব্যবহার এবং এসব তৈরিতে প্রকল্পের নীতিমালা, শিডিউল মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। 

এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর সৈয়দপুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ও সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বজলুর রশীদ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে এসব অনিয়ম করছেন বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির অন্য সদস্যরা।

ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন চেয়ারম্যান জানান, কাজের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। অথচ এখনো ৩০০ ঘরের মধ্যে একটিরও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। বর্তমানে শুধু আরসিসি পিলার ও কাঠের দরজা-জানাজা তৈরির কাজ চলছে। অন্যান্য উপজেলায় ঘর নির্মাণ শেষ হলেও আমার ইউনিয়নে ঘর নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় লোকজন বার বার ধর্ণা দিচ্ছে। আমরাতো ইউএনও স্যারের উপড় দিয়ে কথা বলতে পারিনা। 

আশ্রয়ন প্রকল্প নীতিমালায় পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কাজটি করার কথা। কিন্তু পিআইসির সভাপতি একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের লোককে সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ঘরের পিলার ও কাঠের দরজা-জানাজা তৈরি কাজ করাচ্ছেন। দরজা-জানাজা তৈরিতে শাল, গর্জন, জামরুল, কড়ই, শিশু, আকাশমণি প্রভৃতি গাছের কাঠ ব্যবহারের কথা থাকলেও অল্প বয়সী ও অসার ইউক্যালিপটাস কাঠ দিয়ে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। ফলে ঘরের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে সুবিধাভোগীসহ পিআইসি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। পিআইও অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের অধীন সৈয়দপুর উপজেলায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ৩০০ ঘরের প্রতিটির জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ। পাঁচটি ইউনিয়নে ৬০টি করে ঘর নির্মাণ হবে। পাঁচ সদস্যের পিআইসির অন্য সদস্যরা হলেন পিআইও (সদস্যসচিব), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা।

শিডিউলে ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি টিনের ঘরে ১২টি, বারান্দায় পাঁচটি ও ল্যাট্রিনে চারটি পিলার দেয়ার নিয়ম রয়েছে। ঘরের জন্য চার বর্গফুটের পিলারের উচ্চতা ১২ ফুট, বারান্দা ও ল্যাট্রিনের পিলারের উচ্চতা ১০ ফুট। পিলার হবে মেশিনে তৈরি। পিলারে থাকবে ছয় এমএম গ্রেড রড (চারটি)। কিন্তু গ্রেড রডের বদলে কম পরিমাপের নন-গ্রেড রড ব্যবহার করা হচ্ছে। পিলালের রড বাঁধাইয়ে রিং (চুড়ি) হিসেবে রডের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে ৮ নম্বর জিআই তার। সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদ কার্যালয় চত্বরে পিলারের রড বাঁধাইয়ের পর সেসব ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাতে দেখা যায়, পিলারের জন্য বাঁধা রড ট্রাক-ট্রাক্টর থেকে নামাতে গিয়ে সেসব আঁকাবাঁকা হওয়াসহ রিং খুলে ও হেলে পড়েছে। কিন্তু পরে সেসব রড ও রিং আর সোজা না করে স্টিলের ফর্মায় ফেলে ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছে। প্রথম শ্রেণির বদলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া (ডাস্টসহ) দিয়ে পিলার বানানো হচ্ছে। পিলার ঢালাই শেষে মাটিতে ফেলে ওপরে পুরনো চটের মাধ্যমে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত পানি দেয়ার (কিউরিং) কথা। কিন্তু কিউরিংয়ে চটের বস্তা ব্যবহার করা হচ্ছে না, পর্যাপ্ত পানিও দেয়া হচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা শেষ হওয়ায় দায়সারাভাবে পিলার তৈরির কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।

উপজেলার কামারপুকুর, কাশিরাম বেলপুকুর, বোতলাগাড়ী, বাঙ্গালীপুর ও খাতামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের পিলার, দরজা-জানাজা তৈরি করা চলছে। কিন্তু কাজ দেখার জন্য কারিগরি কোনো লোক নেই। রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিরা যেনতেনভাবে কাজ করছেন। পিলার তৈরির পর মাটিতে শুয়ে রেখে যথাযথভাবে কিউরিং না করায় পিলার গাড়িতে তুলতে গিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। বাঙ্গালীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে এমন কিছু ভাঙা পিলার পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০০টি ঘরের নির্মাণকাজ চুক্তিতে দেয়া হয়েছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাককে। তিনি আবার কাজ ইউনিয়নওয়ারি রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিদের সাব চুক্তিতে দিয়েছেন। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতিটি ঘর তৈরিতে মজুরি বাবদ ১৭ হাজার টাকা ইউএনও স্যারের সঙ্গে আমার মৌখিক চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী আমি শ্রমিক লাগিয়ে কাজ করছি। ঘর তৈরিতে সব মাল ইউএনও স্যার সরবরাহ করছেন।’

বাঙ্গালীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্রী প্রণোবেশ চন্দ্র বাগচী বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হলেও সার্বিক বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কাজের নীতিমালা ও শিডিউল আমাকে দেয়া হয়নি।’ সৈয়দপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোখছেদুল মোমিন বলেন, আমি স্থানীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর কাজের বিষয়ে জানতে পারি। এ নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদার ক্ষিপ্ত আছেন। প্রকল্পের ঘর নির্মাণকাজে নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সৈয়দপুরের ইউএনও মো. বজলুর রশীদ বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে শিডিউল, নকশা মোতাবেক কাজ করা হচ্ছে। এতে অনিয়মের সুযোগ নেই। বাইরের লোককে নিয়ে সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগ সত্য নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ