ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিএসসিসির ৩৮০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা আজ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নিজস্ব আয়ের ঘাটতি থাকায় অনুদান নির্ভর হতে হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে (ডিএসসিসি)। নানা টানাপোড়েনের কারণে সেই অনুদানও  মেলে না যথা সময়ে। ফলে ঘাটতি থেকে যায় সব কিছুতেই। এভাবেই বছরের পর বছর ঘাটতি নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখে নগর ভবন। স্বপ্ন আর সাধের মিলন ঘটাতে প্রতি অর্থ বছরেই নগরবাসীকে নানান স্বপ্ন দেখান দক্ষিণের নগর পিতা। কিন্তু সে স্বপ্ন বছর শেষে উবে যায় অর্থাভাবে। দৌড়ঝাপ করে কিছু অনুদান নিয়ে নগরবাসীর স্বপ্নকে জোড়াতালি দিয়ে চলা ডিএসসিসির এবারও বাড়ছে বাজেটের আকার। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করেছে ডিএসসিসি। গতবছর এ বাজেটের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৩৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। তবে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৫ শতাংশের কম। এবারের বাজেটে সরকারি অনুদানকে আয়ের বড় উৎস ধরা হয়েছে। সামাজিক কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে সড়ক-নর্দমা অবকাঠামোতেই বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করবে ডিএসসিসি। আজ বুধবার ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এবারের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ১২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সরকারি ও বৈদেশিক খাত থেকে আয়ের জন্য ধরা হয়েছিল। এরমধ্য মাত্র ৫৮ শতাংশ পেয়েছে ডিএসসিসি। এবার এই খাত থেকে প্রায় ২৪০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া আয়ের অন্যান্য খাত প্রায় একই রকম রয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা খাদেমুল করিম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, বাজেটের বিষয়টি অতি গোপনীয়। এটি প্রতি মুহূতেই পরিবর্তন হচ্ছে। তবে গতবারের তুলনায় এবার বাজেট বড় হবে। বাজেটে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ ও সড়ক নর্দমা খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গতবছর সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিলো। এছাড়া ভৌত কাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ৩৭৪ কোটি ৮০ লাখ, বিনোদনমূলক উন্নয়নে ১৭৫ কোটি ৫০ লাখ, পরিবেশে ১৯২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এবার এই খাতে প্রায় ২৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে। এর পরিমান আরও বাড়তে পারে।
গত অর্থবছরে ডিএসসিসি মোট বাজেটে ৬৫ শতাংশের কম বাস্তবায়ন করতে পারলেও বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ৪৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারার অন্যতম কারণ হোল্ডিং ট্যাক্স, বাজার সেলামি, কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া ও বিজ্ঞাপন খাতে আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তার বড় অংশই অনাদায়ী থেকে গেছে। ফলে কাঙ্খিত রাজস্ব আয় সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হোল্ডিং ট্যাক্স। হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে করপোরেশন। গত অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫১৫ কোটি টাকা ধরা হলেও হোল্ডিং ট্যাক্স পুনঃমূল্যায়নের উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়ায় সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি ডিএসসিসি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পরিকল্পনার চেয়ে রিকশা লাইসেন্স ফি আদায় হয়েছে বেশি। গত অর্থবছরে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর আদায় হয়েছে ৪ কোটি টাকা। একই অবস্থা বিজ্ঞাপন করেও। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬০ লাখ টাকা বেশি আদায় করেছে ডিএসসিসি। গত অর্থবছরে বিজ্ঞাপন কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ কোটি। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রমোদ কর আদায় করতে পারেনি সংস্থাটি। গত অর্থবছরে প্রমোদ কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ লাখ। আর আদায় হয়েছে ৩৭ লাখ টাকা। বাস/ট্রাক টার্মিনাল থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২ কোটি টাকা। পশুর হাট ইজারা থেকে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ১ লাখ টাকা। আর ইজারা বাবদ আয় হয়েছে ৭ কোটি ৮৬ হাজার টাকা।
টয়লেট, ঘাট, কাঁচাবাজার ইত্যাদি ইজারা থেকে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আদায় হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া জবাইখানা বাবদ আয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৪ লাখ টাকা। রাস্তা খনন ফি বাবদ আয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা কিন্তু আদায় হয়েছে ১১ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ আদায় হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শিশু পার্ক থেকে আয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৪ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ লাখ টাকা বেশি আদায় হয়েছে বিভিন্ন ফরম বিক্রি বাবদ টাকা। কমিউনিটি সেন্টারে লক্ষমাত্রার চেয়ে ৫০ লাখ টাকা বেশি আদায় হয়েছে। কবরস্থান/শ্বশান ঘাট থেকে ৭০ লাখ টাকা আয় ধরা হলেও আদায় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। সম্পত্তি হস্তান্তর বাবদ ৬৫ কোটি টাকা আয় ধরা হলেও আদায় হয়েছে ৭৩ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়,এবারও বিশাল ঘাটতি নিয়েই বাজেট ঘোষণা করছে ডিএসসিসি। অনুদান নির্ভর বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প। বরাবরের মতোই অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএসসিসি। তবে এবারের বাজেটে বিভিন্ন সামাজিক সেবা মূলক খাত অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।
জানা যায়, গত ২০১৭ -১৮ অর্থ বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেট ছিল তিন হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এ বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি ডিএসসিসি। এর আগের অর্থ বছরেও তিন হাজার ১৮৩ কোটি টাকার বাজেট দিলেও মাত্র এক হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮-১৯ সালের আসন্ন বাজেটে আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে সরকার ও বিদেশী অনুদানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্প খাতে এ টাকা বরাদ্ধ দিবে এডিবিসহ বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা। এছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে একটি বড় অংকের অর্থ আয় করে থাকে ডিএসসিসি। কিন্তু এ খাতে গত অর্থ বছরে আয় বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল তা সরকারি নিষেধাজ্ঞায় আপাতত আর বাড়াতে পারছে না ডিএসসিসি।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি খরচের পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএসসিসি। এর মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নেই বেশি ব্যয় হবে বলে জানা গেছে। ডিএসসিসির বিভিন্ন বেহাল কমিউনিটি সেন্টারগুলো ভেঙ্গে নতুন করে আধূনিকভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া ল্যান্ডফিল উন্নয়নে দীর্ঘদিন থেকে যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল তা এবার বাজেটে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ৮১ একর নিয়ে গড়ে তোলার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ৩১ একর জমির উপর স্থাপনা গড়ে তোলা হবে।
সূত্রমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ১২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সরকারি ও বৈদেশিক খাত থেকে আয়ের জন্য ধরা হয়েছিল। এরমধ্য মাত্র ৫৮ শতাংশ পেয়েছে ডিএসসিসি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ