ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আবারও বৃষ্টিতে স্থবির রাজধানী

মাঝখানে দিন কয়েকের তীব্র তাপদাহের পর শ্রাবণের বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই অনেকাংশে অচল ও স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানী মহানগরী। বেসরকারি টিভিগুলোতে তো বটেই, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সকল জাতীয় দৈনিকেরও প্রধান খবর ছিল রাজধানীর এটাই। গতকাল একটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় অনেক বড় করে ছাপানো এক ছবিতে দেখা গেছে, মতিঝিলে একটি যাত্রী বহনকারী বাসের চাকা গর্তে আটকে যাওয়ায় বাসটি বাম দিকে এমনভাবে কাত হয়ে গেছে যে, যাত্রীদের পক্ষে বাস থেকে নেমে পড়াও সম্ভব হয়নি। অন্য এক দৈনিকে ছাপানো এক ছবিতে দেখা গেছে, পানির নিচের গর্তে পা আটকে পড়ে যাওয়া একজন পথচারীকে উঠতে সাহায্য করছেন দু’জন পথচারী। ওই পথচারী প্রায় গলা সমান পানিতে ডুবে গিয়েছিলেন। দু’টি ছবিই রাজধানীর ব্যস্ত মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার।
প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে এবং বাস্তবেও এটাই সত্য যে, শ্রাবণের অঝোর ধারায় বর্ষণ শুরু হওয়ার আগেই, মাত্র দু’দিনের সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার প্রায় সকল এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। মতিঝিলের মতো বড় বড় ব্যস্ত এলাকাগুলো তো বটেই, পানিতে ডুবে গেছে বিভিন্ন এলাকার অলি-গলিও। অবস্থা এমন হয়েছে যে, কোনো এলাকার রাজপথেই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের পাশাপাশি যাত্রীবাহী বাসও যেখানে-সেখানে অচল হয়ে পড়ছে। মানুষের পক্ষে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সব এলাকার পানিই অবিশ্বাস্য রকমের নোংরা ও বিষাক্ত। ফলে যারা যে কাজেই বাইরে বের হচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককে বিপদে পড়তে হচ্ছে। যানবাহনের অভাবে কোথাও কোথাও মানুষ একই জায়গায় দু’-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকছে। আধ ঘণ্টার পথ অনেকে পাড়ি দিচ্ছেন চার-পাঁচ ঘণ্টায়। বহু মানুষ অফিস শেষে গভীর রাতের আগে বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। চলাচল করতে পারছে না অ্যাম্বুলেসও।
অর্থাৎ বৃষ্টির পানিজটে সব মিলিয়েই রাজধানীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ভয়াবহ এই পানিজটের কারণ নিয়ে গবেষণা ও মতামত প্রকাশের পালাও শুরু হয়েছে। ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো উঠেছেই, প্রাধান্যে এসেছে অন্য কিছু কারণও। এসবের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে নির্মিত এবং এখনো নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের কথা বলেছেন সকলেই। এগুলোর কারণে বৃহত্তর মিরপুর থেকে মালিবাগ, মৌচাক ও মগবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার নাগরিকরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু ফ্লাইওভারগুলো কোনোভাবে শেষ করা হলেও মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
মেট্রোরেলের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে অপরিকল্পিত নগরায়নের কথা। শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করে বহুতল ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ, ভবনের আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা না রাখা, পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ার মতো অনেক কারণ নিয়েই সাধারণ মানুষের মধ্যে জোর অলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরাও নতুন পর্যায়ে তাদের অভিমত এবং সরকারের করণীয় সম্পর্কে জানাতে এগিয়ে এসেছেন। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজধানী স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত আশংকাজনক ও ভীতিকর। ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার এই দেশে মাত্র মাত্র দু’চার দিনের বৃষ্টিতেই পুরো রাজধানী নোংরা পানিতে তলিয়ে যাবে, অচল ও স্থবির হয়ে পড়বে এবং মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির শেষ থাকবে না- এমন অবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। গত বছরও রাজধানীর একই অবস্থা হয়েছিল। সে জন্যই পানিজট সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা দরকার। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, খাল ও পুকুর দখলের পাশাপাশি ভরাট করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ একটি প্রধান কারণ। খাল ও পুকুর দখলের এই অভিযানকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে।
এ ব্যাপারে শুধু ব্যক্তি বা বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দায়ী করে লাভ নেই। কারণ, সরকারের পক্ষ থেকেও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ কম নেয়া হয়নি। একটি উদাহরণ হিসেবে পুরনো ঢাকার ধোলাই খালের কথা উল্লেখ করা যায়। শত বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিশে থাকা এ খালটিকে বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে প্রকৃতপক্ষে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পানি প্রবাহিত হওয়ার জন্য কালভার্টের ভেতরে অন্তত ১৫ থেকে ২০ ফুট জায়গা ফাঁকা থাকার কথা থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে ময়লা-আবর্জনা জমতে জমতে তিন-চার ফুট জায়গাও এখন ফাঁকা নেই। ফলে এর ভেতর দিয়ে পানিও যেতে পারে না। অথচ বছর কয়েক আগেও এই ধোলাই খাল দিয়েই বৃষ্টির বেশিরভাগ পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়তো।
রাজধানীর স্যুয়ারেজ বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকেও লক্ষ্য করা দরকার। পলিথিনসহ নানা আবর্জনায় ড্রেনগুলো আটকে যাওয়া একটি বড় কারণ। কিন্তু আবর্জনা সরিয়ে ফেলার জন্য ওয়াসা বা দুই সিটি কর্পোরেশনের কারো পক্ষ থেকেই ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। আমরা মনে করি, পানিজটের বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে দেখা দরকার। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে আর কোনো খাল বা পুকুর দখল ও ভরাট করা না হয়। বাধাহীন পানি প্রবাহের জন্য ধোলাই খালের বক্স কালভার্টের পাশাপাশি রাজধানীর কোনো ড্রেনেই আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না। এগুলোকে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ওয়াসা, তিতাস এবং দুই সিটি কর্পোরেশনসহ রাস্তা খোঁড়াখুড়ির দায়িত্বে নিয়োজিত সকল সংস্থার কাজে সমন্বয় করাটাও খুব দরকার। মেট্রেরেলের নির্মাণকাজও অবিলম্বে শেষ করতে হবে।
সব মিলিয়ে আমরা চাই, রাজধানীতে আর কখনো যাতে বৃষ্টির জন্য দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটতে পারে। বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, সামনে রয়েছে পুরো শ্রাবণ মাস। সুতরাং বৃষ্টি যেমন প্রচুর হতে পারে তেমনি এখনই ব্যবস্থা না নেয়া হলে রাজধানীও বারবার স্থবির হয়ে পড়তে পারে। আমরা আশা করতে চাই, বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আগেই ওয়াসা এবং দুই সিটি কর্পোরেশনসহ সরকার দ্রুত তৎপর হয়ে উঠবে। রাজধানীর পানিবদ্ধতা খুব বড় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীর পানি নিষ্কাশিত হয়ে কোথায় যাবে সেটাও এখন বড় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সুতরাং বড় পদক্ষেপই দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ