ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কয়লা খনির হিসাব নিকাশ

আসাদুজ্জামান আসাদ : আমাদের দেশ খনিজ সম্পদের দেশ। সবুজ সমতল মাটির নীচে প্রচুর খনিজ সম্পদ রয়েছে। এ দেশের উপর দিয়ে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, কর্ণফুলি, করতোয়া সহ অসংখ্য ছোট বড় নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদী মাতৃক দেশকে কবি সাহিত্যিকরা সোনার দেশ হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য্য, মায়া-মমতায় ভরা। দিনাজপুরে পরিবেশ বান্ধব পরিবেশে রয়েছে কয়লার খনি। কয়লা খনি থেকে দেড়শ লাখ মেট্রিক টন  কয়লা উধাও। যার বাজার মূল্য প্রায় ২শ কোটি টাকা।
কয়লা খনি থেকে প্রায় ২শ কোটি টাকার কয়লা উধাও হওয়ায় দেশ ও জাতির বিরাট ক্ষতি হলো। অথচ চোর এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে। কয়লা উধাও এ কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করে পেট্রোবাংলো চেয়ারম্যান দপ্তরে আনা হয়েছে। কয়েক জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কয়লা খনির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তাকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানিতে বদলি করা হয়েছে। সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানে কম বেশী দুর্নীতি রয়েছে। দুর্নীতি এখন একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ থেকে জাতি মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু মুক্তির উপায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ দেশের সরকারি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত টাকা আত্মসাতের কোন প্রকার সুযোগ নেই। আত্মসাত করলে কারো পক্ষেই বাঁচার সুযোগ নেই। তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবেই। প্রয়োজনে অডিট কর্মকর্তা তাকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে গ্রেফতার করবে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লা ইয়ার্ড থেকে ২শ কোটি টাকার কয়লা উধাও হলো। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে গ্রেফতার করা হলো না। হলো না কোন প্রকার শাস্তি। তাদেরকে চুরি অপরাধে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন ২শ কোটি টাকা চুরি করেও যদি বিচার না হয়, তবে কোন ধরনের চুরির বিচার হবে?
গ্রামে একটা প্রবাদ আছে, ‘আমার ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’। কয়লা খনির কয়লা উধাও অথচ বড় বড় কর্মকর্তারা বলেছে হিসাবের গড়মিল রয়েছে। কাগজে কলমে হিসাব নিকাশ করে তারা বলবে যে, উধাও হওয়া সব কয়লা দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। বরখাস্তকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মকর্তারা সচিব, এমপি, মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে ম্যানেজ করে তাদের প্রভাবে দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বের করবে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। অপর দিকে কয়লা চোরদেরকে যদি চুরির অপরাধে গ্রেফতার করে জেলে রাখা হতো তাহলে বিচার করা সহজ হতো। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে আবার তারা স্ব-পদে বহাল থাকত। কি বলব? যে সরিষায় ভূত তাড়াবে সেই সরিষাতেই ভূত। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মকর্তা কর্মচারীরা ওএসডি বা সাময়িক বরখাস্ত হেেয়ছে। তারা তো এখন নাকে ও মুখে তেল দিয়ে বসে থাকবে না। তারা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য সচিব, এমপি, মন্ত্রী এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। তারপর সরকারি রাজ ভান্ডার থেকে সমুদয় বকেয়া ভাতা তুলবেন। অথচ ক্ষতি হলো দেশ ও জাতির।
উল্লেখ্য যে, কয়লা চালিত তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। একটি বন্ধ, আরেকটি অর্ধেক বন্ধ রয়েছে। অপর একটি সংস্কারাধীন থাকায় সেটাতে কয়লা সরবরাহ হচ্ছে না। কয়লা ভিত্তিক ৫২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে লোড শোডিং বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বড়পুকুরিয়ায় ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমাতায় দুটি কেন্দ্র রযেছে। একটি বন্ধ হয়ে গেছে আরেকটি সংস্কারাধীন থাকায় ২৯ আগস্ট উৎপাদনে আসার কথা। কয়লা সংকটের কারণে ২৭৪ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে গত কয়েক দিন ধরে দেড়শ মেগাওয়াটও কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এই কেন্দ্রটি পুরোদমে উৎপাদনে রাখতে হলে প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৪শ টন কয়লা দরকার। গত বৃহস্পতিবার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টন কয়লা মজুদ আছে। কয়লা চালিত ২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ, আরেকটি বন্ধ হতে যাচ্ছে। কোম্পানির এমডি অপসারণ, সচিব বদলি এবং জিএম ও ডিজিএমকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইরিং কোম্পানির অপসারিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, কোল ইয়ার্ডে কাগজে কলমে কয়লা মজুদ দেখানো হয়েছে তা সঠিক নয়। তদন্ত করে দেখা গেছে যে, কয়লা দেড় লাখ টন ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। মোট কয়লা উত্তোলন হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন। তবে খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের পর কয়লাতে জলীয় বাষ্প থাকায় ১ থেকে ২ শতাংশ কয়লা ওজনে কমে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে ২ শতাংশ সিষ্টেম লস ধরা হয়। সে হিসাবে দেড় শতাংশ সিস্টেম লস ধরা হয়েছে। সে হিসাবে এই ঘাটতি সঠিক রয়েছে।
দিনাজপুর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লা চুরির ঘটনাটি একটি বড় ধরনের দুর্নীতি। কারণ হচ্ছে কয়লা ইয়ার্ডে কয়লা নেই। কয়লা উধাও হওয়ার ঘটনাটি অনেকের সামনে ঘটেছে। কেউ হয়তো মুখ খুলে বলতে পারছে না। সরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। অনেকে তার শাস্তি ভোগ করেন। এ দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত তাদেরকে তদন্ত সাপেক্ষে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি উঠেছে। কয়লা চোর যাতে করে নির্দোষ প্রমাণিত না হয় সে দিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। তবে ক্ষতি হয় দেশ ও জাতির।
-লেখক: গ্রন্থকার সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ