ঢাকা, বুধবার 25 July 2018,১০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কক্সবাজার এখন মাদকবাজার

মোহাম্মদ তানভীর হোছাইন : কক্সবাজার একটি শহর, মৎস সম্পদের অন্যতম স্থান, ভ্রমণ কেন্দ্র সর্বোপরি একটি জেলা। এই জেলার অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দক্ষিণে। এই শহর বহুল পরিচিত তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। পাহাড় সাগরের এমন সংমিশ্রণের জুড়িমেলা আসলেই কঠিন। এখানে প্রায় ১২০ কিমি অবিচ্ছেদ্য সমুদ্র তট, রয়েছে বিশাল শুটকি মহল রয়েছে বিনোদনের নানা মাধ্যম যার টানে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসছে অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশের এই অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র এখন মাদকাসক্তদের রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়েছে। সম্প্রতি এই এলাকায় বহুল জনপ্রিয় মাদক ইয়াবার সহজলভ্যতা দেশের বিভিন্ন মাদক সেবীদের আকৃষ্ট করছে। যার কারণে সময় সুযোগ হলেই ছুটে আসছে কক্সবাজার মাদকের নেশায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের বৃহৎ অংশ মাদক চোরাচালানের সাথে ওৎপ্রোত ভাবে জড়িত। শুধু কি তাই, কাচা টাকার লোভে অনেক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য রক্ষক থেকে ভক্ষকে পরিণত হয়েছে।
যদিও বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন হয় না, কিন্তু মায়ানমারের সাথে দক্ষিণ পশ্চিমে দুইশ আশি কিমি সীমান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে তৈরী হয়েছে বিশেষ এক শ্রেণী যাদের অন্যতম উদ্দেশ্য মাদক চোরাচালান। এর প্রভাবে কক্সবাজার সহ বিভিন্ন এলাকা যেমন টেকনাফ, রামু, হ্নীলা, চকরিয়া, মালুমঘাট ইত্যাদি পরিণত হয়েছে মাদক বাজারে। মাদক চোরাচালানের সদর ফটক টেকনাফ দিয়ে প্রবেশ করে প্রায় নব্বই শতাংশ ইয়াবা। মাদক চোরাচালানের সুত্রপাত আগে থেকে শুরু হলেও ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইয়াবা পাচার হয় সর্বাধিক।
২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত জব্দকৃত ইয়াবার পরিমাণ (পিচ) :
২০০৮- ৩৬,৫৪৩, ২০০৯-১,২৯,৬৪৪, ২০১০-৮,১২,৭১৬, ২০১১-১৩,৬০,১৮৬, ২০১২- ১৯,৫১,৩৯২, ২০১৩-২৪,২১,৫২৮, ২০১৪-৬৫,১২,৮৬৯, ২০১৫-২,০২,৬৯,০৪৫।
শুধু তাই নয় অক্টোবর ২০১৭ সাল থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ১৫৮,০৯,৬০,১০০ টাকা মূল্যের ইয়াবাসহ সর্বমোট ১৫৮,৬৩,৬০,৬০০ টাকা মূল্যের বিভিন্ন মাদক জব্দ করা হয়। জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ এত হলে মাদক চোরাচালানের পরিমাণ কত হতে পারে ভাববার বিষয়। কারা এই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে জানা যায় কক্সবাজারে টেকনাফে মৌলভিপাড়া ও জালিয়াপাড়া নামে দুইটি এলাকা আছে। সাত আট বছর আগেও এই সব এলাকায় কোন অভিজাত দালানকোঠা ছিল না। দিনমজুরি ছিল এসব এলাকার মানুষদের অন্যতম পেশা। এখন এইসব এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, অনুমোদনহীন গাড়ি আরো নানা বিদেশী পণ্য দেখতে পাওয়া যায়। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, উচ্চ শ্রেনীর অনেকে এই ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। হ্নীলা টেকনাফসহ কিছু স্থানে মাদক চোরাচালানকে অবৈধ মনে করে না। তারা এই ব্যবসাকে তাদের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম ভাবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ১৮ তম অনুচ্ছেদ বলছে, প্রয়োজন ব্যতীত মদ ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্য হানীকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের লক্ষ্যে রাষ্ট্র কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার মাদক বিরোধী অভিযান করে চলেছেন। সরকার বিভিন্ন সময়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় মাদক বিরোধী অভিযানে এই পর্যন্ত গ্রেফতার করেছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্তৃক চট্টগ্রাম জোনে রুজুকৃত মামলার পরিমাণ মোট মামলার ৩৭.০৬ শতাংশ। এছাড়াও বিগত বছর বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ১,৩২,৮৩৩ জন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ১,০৬,৬৩৬ টি মামলা দায়ের করেন এবং চলতি বছরে মার্চ পর্যন্ত আরো ২৭ হাজার ৩৪০টি মামলায় ৩৫ হাজার ৩২১ জন আসামীকে গ্রেফতার করেছে। অভিযান চলাকালে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১২৮৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেয়া হয়। পরিতাপের বিষয় এত প্রচেষ্টার পরও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় নি। কারণ এর মূলে রয়েছে অর্থলোভী দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু অসাধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। যাদের কারণে সমূলে নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছেনা মাদক চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্তদের। ২০১২-২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭২১ টি মামলা করা হয় বিভিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে ৪৪ জন সদস্য চাকুরি হারায় এবং ৩৪৫ সদস্যের চাকুরী স্থগিত রাখার আদেশ দেয়া হয়।
মাদক দেশের জন্য অভিশাপ। এটি সমগ্র দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যারা মাদক সেবন করে তার মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি মানুষের সংখ্যাই বেশি। এই পথে ধাবিত হওয়ার অন্যতম কারণ উপযুক্ত শিক্ষার অভাব। এক জরিপে দেখা গিয়েছে শিক্ষিত ব্যক্তিরা তুলনামূলক কম মাদক সেবন করে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদক নির্মুল অভিযান পরিচালনার তাগাদা দিয়ে চলেছেন কিন্তু সচেতন হতে হবে আমাদের অর্থাৎ সাধারণ জনগণের তা না হলে সর্বনাশের অতল গহবরে তলিয়ে যাবে দেশের যুব সমাজ।
 সূত্র : 1. wikipedia.
2| Annual drugs reports of Bangladesh 2015.
3| website of Bangladesh border guard.
4| online portal dhaka tribune.
5| lawyersclubbangladesh.com.

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ