ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার : দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার মে. টন কয়লা গায়েবের ঘটনায় সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদসহ ১৯ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে পার্বতীপুর মডেল থানায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বাদী হয়ে এই অভিযোগ দায়ের করেন। পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি হাবিবুল হক প্রধান এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই ঘটনায় প্রাপ্ত প্রতিবেদন পেয়ে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে গতকাল বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরআগে মন্ত্রণালয়ে বসে এ বিষয়ে কথা বলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
অভিযুক্ত আসামীরা হলেন- সাময়িক বরখাস্তকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুর-উজ-জামান চৌধুরী, উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) একেএম খালেদুল ইসলাম, সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ, সদ্য বিদায়ী কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাশেম প্রধানীয়া, ব্যবস্থাপক (এক্সপ্লোরেশন) মোশাররফ হোসেন সরকার, ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার, ব্যবস্থাপক (প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) অশোক কুমার হালদার, ব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) আরিফুর রহমান, ব্যবস্থাপক (ডিজাইন, কন্সট্রাকশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) জাহিদুল ইসলাম, উপ-ব্যবস্থাপক (সেফটি ম্যানেজমেন্ট) একরামুল হক, উপ-ব্যবস্থাপক (কোল হ্যান্ডলিং ম্যানেজমেন্ট) মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপক (মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) মোর্শেদুজ্জামান, উপ-ব্যবস্থাপক (প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) হাবিবুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপক (মাইন ডেভেলপমেন্ট) জাহেদুর রহমান, সহকারী ব্যবস্থাপক (ভেল্টিলেশন ম্যানেজমেন্ট) সত্যেন্দ্রনাথ বর্মন, ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) সৈয়দ ইমাম হাসান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (মাইন প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জোবায়ের আলী, প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী এবং মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহা।
অভিযোগে জানানো হয়, খনি উন্নয়নের সময় (২০০১) থেকে ১৯ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত মোট ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪২ দশমিক ৩৩ মে. টন কয়লা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত কয়লা থেকে পার্শ্ববর্তী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার ২৯ দশমিক ২৯ মে. টন কয়লা সরবরাহ, বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে ডিও’র মাধ্যমে ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ দশমিক ৩৭ মে. টন কয়লা বিক্রি এবং কয়লা খনির বয়লারে ১২ হাজার ৮৮ দশমিক ২৭ মে. টন কয়লা ব্যবহার করা হয়। কয়লার উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার হিসাব করলে ১৯ জুলাই কোল ইয়ার্ডে রেকর্ড ভিত্তিক কয়লার মজুদ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মে. টন। কিন্তু বাস্তবে মজুদ ছিল প্রায় ৩ হাজার মে. টন কয়লা। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মে. টন কয়লা ঘাটতি রয়েছে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি টাকা বলে জানানো হয়। অভিযোগে বলা হয়, এই ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাকি ১৫ জন আসামী অনেক আগে থেকেই তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে সংঘটিত কয়লা চুরির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অনুমিত হয়।
মজুদকৃত কয়লার হিসাবের গড়মিলের বিষয়টি দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) এবং ৪০৯ ধারা অনুযায়ী এজাহারভুক্ত করে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতির প্রতিবেদন নিয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ ব্যক্তিরা। বুধবার বিকেলে খনি দুর্নীতির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। বৈঠকে বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ছাড়াও বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ ও পেট্রোবালা চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফায়জুল্লাহ এনডিসি উপস্থিত ছিলেন। এর আগে কয়লা খনিতে দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটনের পর সোমবার প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও জ্বালানি সচিব এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের ঝটিকা সফর
 কয়লা গায়েবের ঘটনায় গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহসহ বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) বোর্ডের ৬ সদস্য দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ঝটিকা সফর করেন। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত তারা খনিতে অবস্থান করেন। ঝটিকা সফরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের কাছে কোন কথা না বলেই ঢাকায় ফিরে আসেন।
শ্রমিক-জনতার বিক্ষোভ
দেশের একমাত্র কয়লা ভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি’র উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিদ্যুৎ সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের আট জেলায়। এর প্রভাব জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে। বিদ্যুতের লো- ভোল্টেজ ও ঘন ঘন লোডসেডিং দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ ও খনি থেকে কয়লা চুরির ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার বিক্ষোভ করে শ্রমিক-জনতা।
প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং
গতকাল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতির প্রতিবেদন জমা পড়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত  প্রতিবেদনে কয়লা খোয়া যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যখন কেউই কয়লার হিসাব রাখেনি, তখন সবাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখনও প্রতিবেদন পুরোটা পড়তে পারিনি।’ পুরোটা দেখে যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, ২০০৬ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা তুলে কোল ইয়ার্ডে জমা রাখা হচ্ছিল। কিন্তু বিক্রির পর বছরে কতটুকু কয়লা অবশিষ্ট থাকলো, তা কখনও পরিমাপ করা হয়নি। এখন কাগজে-কলমে অবিক্রীত কয়লার পরিমাণ দেখানো হচ্ছে এক লাখ ৪০ হাজার টন । কিন্তু বাস্তবে কয়লা পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টন। অর্থাৎ এক লাখ ৩০ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ