ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অনিয়ন্ত্রিত মশা এবং ডেঙ্গুর বিস্তার

মাত্র চার-পাঁচ দিনের বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা যে ‘অথৈ সাগরে’ পরিণত হয়েছে এবং ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহর ও নগরীর পথে যে নৌকা, বিশেষ করে ডিঙ্গি চলাচল করতে শুরু করেছে সে খবর এরই মধ্যে পুরনো হয়ে গেছে। রাজপথ এবং প্রধান সড়কগুলোর যেখানে-সেখানে পথচারী সাধারণ মানুষ তো গর্তে পড়ে গলা পর্যন্ত নোংরা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছেই, সিএনজি ও প্রাইভেট কার থেকে শুরু করে যাত্রী বহনকারী বাস ও বড় বড় যানবাহন পর্যন্ত কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ-তামাশা যথেষ্টই করা হচ্ছে। সংসদ ভবনের চারদিকের সড়কে হাঁটু পানির ও প্রায় ডুবে যাওয়া গাড়ির ছবি দিয়ে রসিকজনেরা লিখেছেন, সরকারের কথিত উন্নয়নের জোয়ারে নাকি জাতীয় সংসদও ভেসে যেতে পারে! ওদিকে ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের কাছাকাছি অবস্থিত ২৭ নম্বর সড়ক ডুবে যাওয়ার ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘নদীর নাম ধানমন্ডি ২৭ নম্বর’!
শুনতে ব্যঙ্গাত্মক এবং আপত্তিকর মনে হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এভাবেই সরকারের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। সঙ্গে থাকছে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কিত নানা বর্ণনাও। এই ভোগান্তি শুধু বৃষ্টি ও জমে যাওয়া পানির জন্য হচ্ছে না, একই সঙ্গে বেড়ে চলেছে রোগবালাইও। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় দ্রুত বেড়ে চলা মশার উপদ্রব মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। রাতে তো বটেই, দিনের বেলায়ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হচ্ছে রাজধানীবাসী। বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানাসহ প্রতিটি স্থানে মশার দাপটে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা এবং একটু শান্তিতে সময় কাটানো অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নিধনের জন্য কোটি কোটি টাকার অংকে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তার সুফল ভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে না মানুষ। মশারি টানানোর পাশাপাশি নিজেদের অর্থে বাহারী নামের বিভিন্ন মশার কয়েল জ্বালিয়ে এবং ইলেকট্রিক ব্যাট ও মশানাশক ওষুধ স্প্রে করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।
রাজধানীর এমন কোনো এলাকার কথা বলা যাবে নাÑ যেখানে মশার অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ না হচ্ছে। রাজধানীবাসীর ট্যাক্সের অর্থে বেতন দিয়ে লোকজন রাখা এবং স্প্রে করার জন্য ওষুধ কেনা হলেও তারা কোনো উপকার পাচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে বরং জানা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ডে স্প্রে করার কাজে ছয়জন করে কর্মী থাকলেও মাসের পর মাস তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, শুধু এমন কিছু স্থানেই মশার ওষুধ স্প্রে করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ মশা নিধনের ক্ষেত্রেও দলীয় রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে। চলছে কাউন্সিলর ও কর্তাব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতা।
এসব কারণেই রাজধানীতে মশার উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া ও ফাইলেরিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ-বালাই। গত মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এবারের বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণের কারণে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুসহ সব ধরনের রোগে মানুষ ব্যাপক হারে আক্রান্ত হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে ক্রমবর্ধমান রোগীর সংখ্যা সে আশংকাকেই সত্য প্রমাণিত করছে। ওদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর রাজধানীর ১৯টি এলাকাকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বিস্তারের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, চিহ্নিত ১৯টি এলাকায় চিকুনগুনিয়া বাহক মশার ঘনত্ব অনেক বেশি। তাছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বাসাবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা খুঁজে পেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লোকজন। এমন অবস্থায় ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থাৎ সব মিলিয়েই রাজধানীর অধিবাসীরা ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় নামকাওয়াস্তে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও ওষুধগুলোর আসলে কার্যকারিতা নেই। এর কারণ, কেনার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এমন সব কীটনাশকই কেনা হচ্ছে যেগুলো মশা নিধনে মোটেও সক্ষম নয়। একই কথা সত্য বাজারের বিভিন্ন ওষুধ ও কয়েল সম্পর্কেও। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে যেসব মশার কয়েল বিক্রি হয় সেগুলোর বেশির ভাগের মধ্যেই মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। ফলে মশা তাড়াতে গিয়েও মানুষ কেবল ক্ষতিরই শিকার হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে উঠেছে বলেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মশা নিধনের চেষ্টার সঙ্গে মশার উৎপত্তিস্থলগুলোর ব্যাপারেই এখন বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। প্রসঙ্গক্রমে তারা পুকুর এবং খাল ও নালা-ডোবার মতো বিভিন্ন স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন, যেসব স্থানে মশার জন্ম অনেক বেশি হয়ে থাকে। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা এলাকার পুকুর এবং নালা ও ডোবাতে ফেলার কারণেও এসব স্থান মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এজন্যই রাজধানীতে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। একই কারণে মশার উৎপত্তিস্থলগুলোর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, মশার উপদ্রবে রাজধানীবাসীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। তারা কেবল মশার কামড়েই অতিষ্ঠ হচ্ছে না, একই সঙ্গে রোগ-বালাইয়ের শিকারও হচ্ছে। সেজন্যই মশার বিরুদ্ধে অভিযান দ্রুত জোরদার করা দরকার। এজন্য বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে। পুকুর এবং খাল ও নালা-ডোবার মতো উৎপত্তিস্থলগুলোকে পরিষ্কার রাখা গেলে মশার জন্ম ও বিস্তার যেমন কমে আসবে তেমনি কমে যাবে মশার উপদ্রবও। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে মশার উপদ্রব বাড়তেই থাকবে। সেই সাথে বাড়বে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগবালাইও।
আমরা মনে করি, সরকার এবং দুই সিটি করপোরেশনের উচিত প্রথমে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া এবং মশা নিধনের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া। এ উদ্দেশ্যে এমন কীটনাশকই কেনা এবং ছেটানো দরকার, যেগুলো মশার জন্ম ও বিস্তার রোধ করতে পারে। সরকারকে একই সঙ্গে মশার কয়েল ও স্প্রেসহ সকল ওষুধ বিক্রির ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানে  তৈরি কোনো ওষুধ বা কয়েল খোলা বাজারে বিক্রি না হতে পারে। এভাবে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে রাজধানী মহানগরী থেকে মশার উপদ্রব কমে যায় এবং অতিষ্ঠ ও রোগাক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে মানুষ যাতে নির্বিঘেœ ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ