ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হ্যামার থেরাপি ও শিক্ষকের অভিজ্ঞান

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষের জীবনাচারণেও পরিবর্তন এসেছে। ডারউইনের বিবর্তনবাদের কথা বাদ দিলেও মানুষ যে ক্রমেই অপেক্ষাকৃত সভ্য ও সুশৃক্সক্ষল হয়ে উঠেছে একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানুুষ ইতর প্রাণী থেকে ক্রমবিবর্তনের ফলে মনুষ্যে রূপান্তিত হয়েছে একথার সাথে দ্বিমত করেও বলতে হয় যে, মানুষ আর প্রস্তর যুগের বৃত্তে আবদ্ধ নেই বরং আঙ্গিক বা অবয়বগত পরিবর্তন না হলেও আচরণগত পরিবর্তন যে হয়েছে একথা স্বীকার করতেই হবে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতিতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। তবে অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোতে কোন পরিবর্তন আসেনি বরং সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই যেমন ছিল তেমনই চলছে এবং চলবে বলেও বিশ্বাস করার মত উপাদান বিদ্যমান আছে। তাই এই সৃষ্টি নিচয়ের আদিতে ধারাবাহিকতার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি।
তবে ব্যত্যয় ও ব্যতিক্রমটা অন্যস্থানে এসে বাসা বেঁধেছে। আমরা নিজেদেরকে সভ্য বলে দাবি করলেও এক্ষেত্রে সংকটটাও ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। তাত্ত্বিকগণ বিষয়টিকে সভ্যতার সংকট বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। কারণ, সভ্যতার ক্রমবিকাশে পশুশক্তির ওপর মনুষত্বের যে প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার কথা তা কিন্তু কাক্সিক্ষত পরিসরে হচ্ছে না।  কারণ, আমাদের ঠাটবাট বেশ কেতাদুরস্ত হলেও বাস্তব অবস্থা ততটা স্বস্তিদায়ক নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে তা রীতিমত আতঙ্কিত হওয়ার মত। সবকিছুতেই ঘষামাজার ফলে দর্শনীয় হলেও মানহীনতার বিষয়টি উপেক্ষা করার মত নয়। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ভাষায়, ‘সোনা নহে রূপা নহে এ ব্যঙ্গা পিত্তল, ঘষিয়া মাজিয়া বাপু কর‌্যাছ উজ্জল’। আর এই স্খলণের গতিটা ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষ করে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে এই অবনমন রীতিমত চোখে পড়ার মত। সুতরাং আমরা এই অধোগতির ধারায় সবকিছু হারিয়ে এখন প্রায় সর্বস্বান্ত হতে বসেছি। কিন্তু বহিরাভরণটা আগের মতই আছে। ক্ষেত্র বিশেষে তার চাকচিক্য ও জৌলুস বেড়েছে। কিন্তু তা একেবারেই অন্তঃসারশূন্য। আর সেটিই আমাদের জন্য রীতিমত আতঙ্কের, হতাশার ও দুর্ভাগ্যের।
মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মনে করা হয়। তাই এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবির যথার্থতা প্রমাণের জন্য মানুষের বৈশিষ্ট্যগুলোও শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ডে উত্তীর্ণ হওয়া দরকার। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের তকমা নিয়ে গোঁফের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বাড়িয়ে নিজেদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে উদাসীন থেকে মনুষত্বের অপমান করার একটা অশুভ প্রবণতা এখন বেশ জোড়ালো। আমাদের এই শ্রেষ্ঠত্ব এখন অনেকটাই পোশাকী ও কেতাবী স্টাইলে হয়ে গেছে। একটা প্রদর্শনেচ্ছা আমাদেরকে রীতিমত পেয়ে বসেছে। আর এই নির্মম বৃত্তেই আটকা পড়েছে আমাদের সবকিছুই। আমরা এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আশার চেষ্টা করছি না বরং ক্রমেই তার অশঙ্কাজনকভাবে বিস্তৃতি ঘটছে। তাই আমাদের কোন কাজই এখন শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারছে না বরং দিন যতই যাচ্ছে ততই তা নি¤œমুখী হচ্ছে। আর এই নিচে নামার পারদটাও রীতিমত আঁৎকে ওঠার মত।
একথা আবারও জোর দিয়েই বলতে হচ্ছে যে, আমরা শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষায় তো উত্তীর্ণ হতে পারছিই না বরং ক্ষেত্র বিশেষে আমরা পশুত্বেরও নি¤œপর্যায়ে নেমে গেছি। যার জ¦লন্ত প্রমাণ হলো সর্বসাম্প্রতিক সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ। অতীতে আমরা যে মানুষের প্রতি মমত্ব ও ভালবাসা লক্ষ্য করতাম তার অনুপস্থিতির ভিত্তিটা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। মানুষই এখন মনুষত্বেরই প্রতিপক্ষ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মানুষের ওপর মানুষের নির্মমতা আমাদেরকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। আবার মানুষই এই নির্মমতার নীরব দর্শক। প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলেও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু প্রতিবাদ করছে কুকুর নামক ইতর প্রাণী। মানুষের মনুষত্ব এখন কোন কোন ক্ষেত্রে কুকুরের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বও এখন রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ। রাজপথে মানুষকে নির্মমভাবে পেটানো ও কুকুরের ব্যর্থ প্রতিবাদের একটি ভিডিও ফুটেজ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যা ইতর প্রাণীর পক্ষে মানুষের প্রতি করুণায় বলতে হবে। মানবতার এরচেয়ে বড় অপমান আর কী-ই বা হতে পারে?
মূলত দেশে আইনের শাসনের সূচক ও ধারণায় আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। আইনের শাসনের পরিবর্তে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করার অভিনব সংস্কৃতি চালু হয়েছে বেশ আগে থেকেই। আর এ ক্ষেত্রে অভিনব ব্রান্ডের আমদানিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে আমরা প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য হ্যামারিংটা ভালভাবেই রস্ত করে ফেলেছি। সকল সমস্যা সমাধানে হ্যামার থেরাপীর যথাযথ প্রয়োগ শুরু হয়েছে। গণতন্ত্রের পরিবর্তে এখন হাতুড়িতন্ত্র, লাঠিতন্ত্র ও পিটুনীতন্ত্র সে স্থান দখল করে নিয়েছে। যা সচেতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। এতে প্রমাণ হয় যে, ক্ষেত্রে বিশেষে আমাদের মানবীয় মূল্যবোধ পশুত্বেরও নি¤œপর্যায়ে নেমে গেছে। তাই তো ‘বড়ই বিচিত্র ও নির্মম আমাদের এই মাতৃভূমি’ এমন খোদোক্তি এখন আত্মসচেতন মানুষের মুখে মুখে। যা আমাদের অধঃপতনের দিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যাদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা তারাই এ বিষয়ে নিলিপ্ত ও উদাসীন। সঙ্গত কারণেই দুর্ভাগ্যটা আমাদের পিছু ছাড়ছে না।
আমাদের দেশ সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী হলেও আমরা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চায় বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে পড়েছি। আর এই অধোগতিটা এতই প্রবল যে এখনই তার লাগাম টেনে ধারা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জাতিস্বত্ত্বায় যে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে তা অন্তত দিব্যি দিয়েই বলা যায়। মূলত এটিই আমাদের জাতীয় জীবনের প্রধান সমস্যা। কারণ, গণতন্ত্রের পরিবর্তে সেখানে স্থান করে নিয়েছে আত্মতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র ও পেশীশক্তি নির্ভর কদাকার রাজনীতি। গণমানুষের কল্যাণে রাজনীতির অভিযাত্রা শুরু হলেও আমাদের দেশের রাজনীতি এখন সে অবস্থায় নেই বরং রাজনীতি এখন একশ্রেণির রাজনীতিকদের উচ্চাভিলাষ ও আত্মবিনোদন চরিতার্থ করার অনুসঙ্গ হয়ে গেছে।
মূলত নেতিবাচক ও আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতিই আমাদের জাতীয় জীবনের মহাসর্বনাশটা করেছে। মানুষের কল্যাণে রাজনীতিতে মানবিক মূল্যবোধ বরাবরই উপেক্ষিত ও অবহেলিত থাকছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এসে অপরাপর জাতিরাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক পরিসরে পরম বিক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে, তখন আমাদের এই আত্মবিমূখতা ও অন্তর্ঘাত ভাবনার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। পরমত সহিষ্ণুতা গণতন্ত্রে অন্যতম উপাদান হলেও এসব শুধু আমাদের কেতাবেই আছে বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। আমাদের দেশের গণতন্ত্র গলাবাজি আর চাপাবাজীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর এই গলাবাজির প্রতিধ্বনিও দ্রুত গতিতে বিস্তৃতি লাভ করছে।
আমাদের দেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা, রাজপথে কর্মসূচি পালন, সভাসমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শের অধিকার স্বীকৃত। সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ ও উপঅনুচ্ছেদে নাগরিকদের এমন মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ বিক্ষুব্ধ হওয়া যেমন প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ঠিক তেমনিভাবে তার প্রতিবিধান চেয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনও অসাংবিধানিক নয়। আর সকল নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যেহেতু সরকার রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে তাই দায়িত্বটা সরকারের বলায় অধিক যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আমরা দেখছি ভিন্ন চিত্র। রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না বা দিচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রই যে জননিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে একথার অনুকূলে প্রমাণাদিও বেশ স্পষ্টই বলতে হবে। রাষ্ট্র একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হলেও এক শ্রেণির অতিউচ্চাভিলাষী রাজনীতিকদের কারণে রাষ্ট্র তার বৈশিষ্ট ও চরিত্র প্রায় হারাতে বসেছে। সমসাময়িক ঘটনা প্রবাহ এই কথাকে আরও জোড়ালো ভিত্তিই দিয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটাবিধি সংস্কারের দাবিতে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা কারো অজানা নয়। তাদের দাবি কতখানি যৌক্তিক সেদিকে না গিয়েও বলা যায় এই আন্দোলন করার অধিকার তাদের আছে। যাহোক সরকার প্রথম দিকে এই দাবি নিয়ে বেশ প্রশংসায় পেয়েছিল। এ বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে বেশ প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছিল। শুরুতেই বিষয়টিতে অপপ্রচার বলে মনে করা হলেও এখন তা বাস্তব বলেই মনে হচ্ছে। বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তাতে সরকার যে ভূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কারণ, জনশ্রুতি আছে যে ভূতের নাকি পেছনে পা। তাই এই দানব প্রজাতি কখনো সামনের দিকে চলতে পারে না। সব সময়ই এদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে দেখা যায়।  কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে সরকার সেই উল্টো রথেই যাত্রা শুরু করেছে। কারণ, তারা ছাত্রদের ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়ে এখন পৃষ্ঠপ্রদর্শনের কসরত করছেই বলেই মনে হচ্ছে। সরকার প্রকারান্তরে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে। এমন কিছু আচরণ করছে যাতে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, সরকার কোটাবিধি সংস্কার বা বাতিল কোনটাতেই আন্তরিক নয় বরং তারা একটা কালক্ষেপনের পথই বেছে নিয়েছে। তারা যেকোন মূল্যে শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবিকে পাশ কাটাতে চাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারি ছত্রছায়ায় হামলা ও মামলার বিষয়টি সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে।
শিক্ষার্থীরা বোধহয় সরকারের এই ভাবটা ভালভাবেই বুঝে ফেলেছিল। তাই তারা দাবি আদায়ে নতুন করে কর্মসূচি গ্রহণের দিকেই অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু সরকার তাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কোন ভাবেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। তাই যা হবার তাই হয়েছে। দেশে যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠত নেই সরকারই সে কথার প্রমাণ দিয়েছে। কারণ, তারা ছাত্রদের নায্য দাবির আন্দোলন দমাতে সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা যখন সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল তখন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন এসব ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে বসে। ঘটনা শুধু ঢাকাতে ঘটেছে এমন নয় বরং সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের হামলা সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা রাজশাহী, জাহাঙ্গীর নগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হাতুড়ি দিতে পেটানো হয়েছে। মানুষের ওপর মানুষের হাতুড়ীর ব্যবহার অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। এমন নির্দয় ও নিন্দনীয় কাজ করার পর তাদেরকে কখনো অনুশোচনা করতে দেখা যায়নি বরং গণমাধ্যমে এই হামলার যথার্থতা প্রমাণের জন্যই আত্মপক্ষ সমর্থন করা হয়েছে।
কোটা আন্দোলন শুরুর পর সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর অন্তত ১৩ বার হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। যারা এসব হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় বা পুলিশ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বরং তারা গর্বের সাথে প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোটা আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এখন প্রায় সকলেই জেলে। তাদেরকে বিরুদ্ধে যেসব মামলা দিয়ে নাজেহাল করা হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোর মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন এখন তাদের বিরুদ্ধেই খড়গ হস্ত। কিন্তু হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও অজ্ঞাত কারণে এসব বিষয় রহস্যজনকভাবে নিরব। তাদের একই কথা এসব ঘটনায় কেউ মামলা দায়ের করেনি। কেউ মামলা না করলেও পুলিশের মামলা করার এখতিয়ার আছে একথা তারা সযতেœ চেপে যাচ্ছে। যা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অপচেষ্টা বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্টমহল।
কোটা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকার যে অবস্থান গ্রহণ করেছে কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে এমনটা কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। সরকার কোটা আন্দোলন দমাতে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এখন ক্যাম্পাসে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কখন আবার কার ওপর কোটা বিরোধী বলে হামলা শুরু হয় এই ভয়ে তারা এখন তটস্থ। কিন্তু সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনভাবেই আশ্বস্ত করতে পারছে না। মূলত তারুণ্যের ক্যাম্পাসে এখন এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ঢাবি প্রশাসন ক্যাম্পাসে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার পরিবর্তে নতুন নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এমনকি খোদ ঢাবি ভিসি কোটা আন্দোলনের কর্মকান্ডকে জঙ্গিবাদী আচরণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রীতিমত লোক হাসিয়েছেন। তার এ বিতর্কিত বক্তব্যে মাধ্যমে তিনি নিজের পদমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি অমর্যাদায় প্রদর্শন করেছেন।
তিনি দাবি করে বসলেন যে, কোটা আন্দোলনকারীদের আচরণ জঙ্গিবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিন্তু তিনি এজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে একথা বললেন না যে, কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর বাঁশের লাঠি, ধারালো ছুড়ি ও হাতুড়ী দিয়ে হামলা চালিয়ে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পা ভেঙ্গে দেয়া কিসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মেধাবী শিক্ষার্থী মরিয়ম মান্নান ফারাহ ছাত্রলীগ কর্তৃক ও পুলিশি হেফাজতে নাজেহাল এবং নির্মমতাকে তিনি কীভাবে দেখেন এ বিষয়েও তার কোন বক্তব্য নেই। হামলার শিকার শিক্ষার্থীদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হলো না অথচ বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি হাতে এ বিষয়ে তার কোন বক্তব্য আমরা লক্ষ্য করলাম না। আর এইসব হামলাকারীরাই বা কারা? ডেইলী স্টারের অনুসন্ধান মত ১১ জন হামলাকারীর মধ্যেই ১০ জনই সরকারি দলের নেতাকর্মী। মাননীয় ভিসি মহোদয় এ বিষয়ে নিরব কেন?
মূলত আমাদের দেশে এখন গণতন্ত্রের পরিবর্তে হাতুড়িতন্ত্র চালু হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা না করে এখন হ্যামার থেরাপীর মাধ্যমে সব কিছুর দফা রফা করা হচ্ছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি তো একজন সম্মানিত শিক্ষক। তিনি তার ছাত্রদের জঙ্গি বানাচ্ছেন কার স্বার্থে? তিনি আসলে কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? এই গরজটা তার পেয়ে বসলো কেন তা আত্মসচেতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। তার বিতর্কিত বক্তব্যের পর তিনি ব্যাপকভাবেই সমালোচিত হয়েছেন। তোপারের মুখে তিনি করেছেন যে, তিনি শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেন নি বরং তাদের কাজকে জঙ্গিবাদের সাথে তুলনা করেছেন। গণমাধ্যম নাকি তার বক্তব্যকে যথাযথভাবে প্রকাশ করেনি। তার এই কথা একশ্রেণির চরিত্রহীন রাজনীতিকদের বক্তব্যের সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ, তারা বেফাঁস মন্তব্য করলে পরে তোপের মুখে গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপিয়ে বসে। ভাবটা হলো যত দোষ সব নন্দ ঘোষের। কিন্তু তিনি সর্বশেষ অবস্থানে যে দাবি করলেন তা কী শিক্ষার্থীদের জঙ্গিপনা থেকে মুক্তি দেয়? জঙ্গি ও জঙ্গিবাদের সাথে সদৃশ্যপূর্ণ কাজকে তিনি কীভাবে আলাদা করছেন? শিক্ষকের অভিজ্ঞান বলে কথা ! আর কত লোক হাসাবেন তিনি!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ