ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সীমান্তহত্যা বন্ধ অবৈধ ব্যবসা ও গরু পাচার বন্ধ ও তার প্রতিকার

মোঃ জাহিদ : বাংলাদেশ ও ভারত- দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে সীমান্ত হত্যা, মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, গরু বাণিজ্য ও পাচারের মতো অনেক সমস্যা বিরাজমান। এসব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশে জাতীয় ঐকমত্য এবং সব মহল ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য, অভিবাসনসহ অন্য যে সব বিরোধপূর্ণ ইস্যু দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর অব্যাহত ছায়াপত করে চলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেক ইতিবাচক উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়। আজ থেকে অনেক বছর আগে সই হওয়া সীমান্ত চুক্তিও সম্প্রতি বাস্তবায়িত হয়েছে। তবুও বিতর্ক শুধু বেড়ে চলেছে । বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মধ্যে ভারতের অনেক দাবি নীরবে মেনে নেয়ার একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ‘চাহিবামাত্র দাবি পূরণ’ মানসিকতার কারণে কোনো ভারসাম্যপূর্ণ বা ইতিবাচক ফলাফল আশা করা যায় না।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সীমান্ত হত্যা। “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র হিসাবে গত এক দশকে ভারতীয় বাহিনী প্রায় এক হাজার বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। এর মানে হলো প্রতি চার দিনে গড়ে একটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। দুই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সীমান্তে যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই জার্মানির সীমান্তেও হয়নি।
দুঃখজনক হলো কিছু ভারতীয় কর্মকর্তা অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাতে এসব হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইছেন। সাধারণ মানুষ, না অপরাধী এসবের কিছু তোয়াক্কা তারা করছেন না। বিএসএফ’র এই ‘দেখামাত্র গুলি’ নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের হত্যাকা-কে খাটো করে দেখাতে চাইলেও বিএসএফ’র নৃশংসতার বিরুদ্ধে জনমত তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের  সৌহার্দ্য- দু’য়ের ওপরই এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকার, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ও ডেইলি স্টার পত্রিকা ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, আন্তঃসীমান্ত হত্যাকা- শুধু বেড়েই চলেছে। এতে বলা হয় যে, ২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০০৬ বাংলাদেশীকে হত্যা করে ভারতের বিএসএফ। এক জরিপে দেখা যায় আটমাসে ২১ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার খবরে বলা হয়: “১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হতে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। তখন থেকে গত মাস পর্যন্ত প্রতিবেশি দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ও সে  দেশের নাগরিকদের হাতে ১,৩৯১ বেসামরিক বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিজিবি (সাবেক বাংলাদেশ রাইফেলস- বিডিআর) সদস্য নিহত হয়। বিজিবি’সহ বিভিন্ন সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, একই সময়ে বাংলাদেশের ১,২০৬ বেসামরিক নাগরিক ও ২২ বিজিবি সদস্য বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে আহত হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ক নির্দেশিত হয় মূলত অর্থনীতির দ্বারা। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ, এরপর বাংলাদেশের জন্ম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অর্থনৈতিক  বৈষম্য একটি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। এই বৈষম্যের প্রতিকার হলো শক্তিশালী জাতীয়তাবোধ। তিনি দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক রাজস্বকে একটি ‘ব্লাকহোল’র মত। তিনি বলেন, এরজন্য জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী করতে হবে, মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে।
একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সীমান্তে ফুলেফেঁপে ওঠা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এমন জোন ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সুবিধা দিতে পারতো। কিন্তু ভারত ও ভারতের এসব রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
সীমান্তের দু’পাশেই গরু ব্যবসা লাভজনক বিধায় বিচক্ষণতার সঙ্গে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং এর স্বীকৃতি দিতে হবে।
আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্চ মোকাবেলায় অধিকতর আত্মনিষ্ঠ হওয়া উচিত। ভারত তার স্বার্থ  দেখছে। আমরা দেখছি না। আমরা ভারতকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছি। ভারত আমাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দিক দিয়ে, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজন। ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ভারত সম্পর্ক ছাড়াও রোহিঙ্গাদের কারণে মিয়ানমার সীমান্তের সমস্যা মানবিক সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে সমস্যা নিরসনে রাজনৈতিক আলোচনা করা প্রয়োজন। সামরিক জান্তা বিদায় নিয়ে অং সাং সুচি’র গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সমস্যার ইতি ঘটবে। কিন্তু তা না হয়ে বরং আরো অবনতি হয়েছে।
আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের জন্য আসলে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘সমান স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চান। ভারতও কি একই মানসিকতা পোষণ করে? সমস্যার মূল এখানেই। এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সমস্যা থেকেই যাবে।’
বর্তমান সরকার দেশকে ক্রীতদাসে পরিণত করছে। ক্রীতদাসের আবার কি অধিকার?
নেপাল ও ভুটানের মতো দেশও এখন ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। অথচ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশ অকাতরে সব কিছু ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে।
ভারত একটি বড় ও শক্তিশালী প্রতিবেশি, বাংলাদেশকে চারপাশ থেকে ঘিরে আছে। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র নীতিতেই দুর্বলতা রয়েছে। ‘আমাদের কলকাতা বা দিল্লী মিশনের লোকজন কি সীমান্ত এলাকায় কখনো গেছেন ফেনসিডিলের কারখানাগুলো দেখার জন্য? এসব কারখানায় তৈরি মাদক বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসছে। মিয়ানমার থেকে আসা মাদক ইয়াবা একটি আন্তঃসীমান্ত সমস্যা। এর প্রতিও নজর দেওয়া উচিত।
আমরা সব দিয়েছি ঠিকই। এরপরও যা অবশিষ্ট আছে তা নিয়েই এখন আমাদের রুখে দাঁড়ানো উচিত। সমস্যার অন্ত নেই। গরুর গোশতের জন্য হত্যা করা হচ্ছে, ভারত আমাদের জামদানির অধিকার নিয়ে টানা  হেঁচড়া করছে, সীমান্তে হত্যাকা- ঘটাচ্ছে। আমাদের চুপ থাকাচলবেনা। সীমান্তে ভারতীয়দের হত্যাকা- একটি মানবাধিকার ইস্যু। এর সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবতা জড়িত। বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র নেতার ফেলানি হত্যাকা-কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অভিহিত করেন। যা বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনক।
-লেখক : সভাপতি, সুশীল ফোরাম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ