ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দরকষাকষিতে ১০ শতাংশ মূল্য হারাচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প

চট্টগ্রাম ব্যুরো: বাংলাদেশে এখন বিবিএ কিংবা এমবিএ এর মহামারী চলছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষার দিকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এতে করে তৈরি পোশাক খাতে বিশ্বের বড় বড় ক্রেতার কাছে দরকষাকষিতে বাংলাদেশ পোশাকের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ কম পাচ্ছে। যার কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাজারে তুলনায় তৈরি পোশাক খাতে পর্যাপ্ত প্রবৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। চীনের শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় দেশটি তার শিল্পনীতিতে পরিবর্তন এনে অন্য খাতের ওপর জোর দিয়েছে। ফলে পোশাক খাতের এই বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ছে বাংলাদেশসহ অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘ড্রাইভিং ট্রান্সফরমেশন ইন বাংলাদেশ আপেয়ারেল ইন্ডাস্ট্রি' শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিকেএমইএ এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি পোশাক খাতের জন্য পর্যাপ্ত নয়। দেশে এখন অনেক শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। কিন্তু তাদের পোশাক খাতের উপর কোন টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই। অনেকেরই যোগাযোগ দক্ষতা, বোঝানোর ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব দেখা যায়। যার কারণে বিদেশী ক্রেতার সাথে দরকষাকষিতে আমাদের পণ্যের মূল্য অন্তত ১০ শতাংশ কমে যাচ্ছে। যার কারণে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে লোক এনে অনেক বেতন দিয়ে রাখছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন কারিগরি শিক্ষার পিছনে জোর দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাকে গরীবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা হয়। অন্যান্য দেশ যেখানে কারিগরি শিক্ষাকে জোর দিয়ে সেখান থেকে ভিন্ন ভিন্ন খাতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাজে লাগাচ্ছেন। যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপানসহ অন্যান্য দেশের ক্রেতাদের সাথে দরকষাকষিতে তারা অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। সেখানে আমাদের দেশ এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। সেজন্য সরকারকে গতানুগতিক পড়াশুনার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার পিছনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য হুমকি। এতে করে চায়না তাদের শেয়ারের ৩ থেকে ৪ শতাংশ লস করেছে। সেখানে বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। তাছাড়া দেশের তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাসহ অন্যান্য মান নিয়ন্ত্রণের সূচকে বেশ এগিয়েছে। যেটা আমাদের জন্য ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
 তক্তাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারে তৈরি পোশাক খাতে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালক খূবই দুর্বল। তবে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালক বৃদ্ধিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে। দেশে ২০১৩ সালের রানা প্লাজা কিংবা ২০১৪-০৫ সালের দিকে শুল্ক আরোপের বিষয়ে কারণে অনেকেই এই শিল্পের শেষ দেখতে পেরেছিলেন। কিন্তু এত কিছুর পরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতে সংস্কার পদক্ষেপের ফলে ব্যাপকহারে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতে সব বাঁধা কাটিয়ে এই শিল্পের অগ্রগতি অন্যান্য খাত থেকে অনেক গুন বেশি। সরকার কিন্তু পোশাক খাতের বাজার ব্যবসায়ীদের খুঁজে দেয়নি বরং ব্যবসায়ীরাই তাদের বাজার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খুঁজে নিয়েছে। দেশের পোশাক খাত এখন নির্ভর করছে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর। কিন্তু এই বন্দর এখন কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। তাই যদি না হতো তাহলে বিদেশী জাহাজ কেন ৫ থাকে ১০ দিন খালাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ? দেশের অন্যান্য বন্দরের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে সেটা ভালো কথা কিন্তু সেখান থেকে তো চট্টগ্রাম বন্দরের মত সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। শুধু নিজেদের ফ্যাক্টেরির উন্নয়ন করলেই হবে না। সবাই মিলে সবার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে একযোগে কাজ করলে পোশাক শিল্পের আরও উন্নয়ন সম্ভব।’
 চট্টগ্রাম নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কোন শহরে শুধু ফ্লাইওভার বানালেই সেই শহরের উন্নয়ন হয়েছে এমনটা ভাবা আমাদের সবথেকে বড় ভুল। কারণ এই সব ফ্লাইওভার নির্মাণের পর নিচের অংশকে তেমন কোন উন্নয়ন করা হয় না। চট্টগ্রাম বন্দর যেখানে বিশ্বের অন্যতম সেরা বন্দর সেখানে চট্টগ্রাম শহরের অবস্থা কি? যেন বসবাস অযোগ্য এক শহর। এই চট্টগ্রামকে বসবাসযোগ্য করতে হলে প্রশাসনিক ভাবে শুধু নয় ব্যবসায়ীক সমাজকেও কাজ করতে হবে।’
 পিডাব্লিউসি এর পরিচালনা পর্ষদের কর্মকর্তা পল্লব দে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরণের জরিপে দেখেছি যে, বিশ্ববাজারে চায়না শ্রমিকদের ২১ হাজার, ভারত ১৩ হাজার ৫০০, ভিয়েতনাম ৮ হাজার ৯০০ এবং বাংলাদেশ তাদের শ্রমিকদের ৭ হাজার ৪০০ টাকা গড়ে বেতন দিয়ে থাকে। ২০১১ সালে যেখানে ৮৯ শতাংশ বিদেশী ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে কাপড় নিতে আগ্রহী ছিলো সেখানে ২০১৭ সালে সেটা ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তারপরেও বাংলাদেশের কাপড়ের মানের কারণে এখানে তৈরি পোশাক খাতের উন্নতি অনেক দেশের তুলনায় ভালো। তবে বিশ্ব বাজারে এই খাতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে দক্ষ শ্রমিক, ভালো ব্যবসায়ীক চিন্তা, কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহন, শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত সহ নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের।’
এদিকে স্বাগত বক্তব্যে পিডাব্লিউসির ম্যানেজিং পার্টনার মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বিশ্বে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়। ট্রাম্পের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে চায়না শেয়ার কমেছে। যার কারণে বাংলাদেশ এখন জার্মানি, আমেরিকা, জাপানে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। আমাদের এখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। যার কারণে আমাদের দেশের সমস্যা সমাধান করতে হবে। কূটনীতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়ীদের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য একযোগে কাজ করতে হবে।
 এছাড়া সেমিনারে এশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ সালাম, বিজেএমইএের পরিচালক আবু তৈয়ব, পিডাব্লিউবি পরিচালক অরুণ রায়চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। এসময় বিজেএমইএ, বিকেএমইয়ে, চট্টগ্রাম চেম্বারের, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালকরাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ