ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 July 2018,১১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্রিকেটে মেয়েরা জিতছে আর ছেলেরা হারছে

অরণ্য আলভী তন্ময় : কখনো কখনো যেন সেরা দলই শিরোপা জেতেনা। ভাল দলও পরাজয়ের বন্দরে ঘুরপাক খায়। ঠিক যেমন বাংলাদেশ দল, এই দলটিও এখন ভাল খেলতে পারছেনা। মেয়েরা যেখানে ভাল খেলছে সেখানে ছেলেরা ভাল খেলতে পারছেনা। হঠাৎই যেন বাকবদল হয়ে গেল মেয়েদের ক্রিকেটের।  আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিয়মিত খেলতে না পারা, সাফল্যের জন্য হাপিত্যেশ করা যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছিল। সে কারণেই অবহেলার পাত্রী হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল সালমা খাতুন, আয়েশা, ফারজানাদের। এখন আর সেই সুযোগ নেই। টানা তিনটি টুর্ণামেন্টে শিরোপা জিতে এখন যেন নতুন দিনের সূচনা হয়েছে মেয়েদের ক্রিকেটের। শুরুটা হয়েছিল এশিয়া কাপের শিরোপা জেতার মধ্যদিয়ে। প্রথমবারের মতো এশিয়া সেরা হওয়ার পর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়। সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেন সবার চোঁখ কপালে তুলে দিয়েছে সালমা খাতুনের দল। অন্যদিকে ছেলেদেরা ক্রিকেট যেন বাজে সময় পিছু ছাড়ছেনা। ভারতের দেরাদুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টোয়েন্টি-২০ সিরিজে হোয়াইট ওয়াশের পর থেকেই পথহারা সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমরা। যার ধারা অব্যাহত ছিল ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেষ্ট সিরিজেও। এখানেও ধবলধোলাই হয়েছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। চলমান ওয়ানডে সিরিজে যদিও ঘুড়ে দাড়ানোর প্রত্যাশা বাংলাদেশের। এর মাঝেই হঠাৎ বোমা ফাটান বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।
টেষ্ট  অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, রুবেল হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমানের মতো বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় নাকি টেষ্ট খেলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন! বাজে সময়ের মধ্যদিয়ে যাওয়া দলের জন্য এটা হতাশার খবর ছাড়া অন্যকিছু নয়। সবকিছু মিলিয়ে এখন বলতেই হয়, ছেলে আর মেয়েদের ক্রিকেট এখন দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এমনিতে কখনোই এশিয়া কাপে বলার মতো কোন পারফরম্যান্স ছিলনা নারীদের। এবার সেই আসর থেকেই দারুণ গতিতে ছুটছে দলের সাফল্যের রথ। এশিয়া কাপে শক্তিশালী ভারতকে গ্রুপ পর্বে ও ফাইনালে হারিয়ে শিরোপা বাংলাদেশ। এরপর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ সিরিজ জিতে ফেভারিট হিসেবেই বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব খেলতে যায় বাংলাদেশ। আসরের ফাইনালে উঠে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করে শামিমা সুলতানা-নিগার সুলতানারা। দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে চলা সালমা খাতুন বাহিনীর কাছে পাত্তা পায়নি আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল। ফাইনালে আয়ারল্যান্ডকে ২৫ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন বাংলাদেশের মেয়েরা। গেল বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ফাইনালে আয়ারল্যান্ডের কাছেই হেরে রানার্সআপ হয়েছিল টিম টাইগ্রেস। এবার সেটির শোধ তুলেছে সালমা খাতুন বাহিনী। শিরোপা জিতল আইরিশদের হারিয়েই। ফাইনালে পান্না ঘোষের ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ১২৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা আইরিশ মেয়েদের ইনিংস থামে ৯৭ রানে। এ ডানহাতি পেসার চার ওভারে ১৬ রান দিয়ে তুলে নেন ৫ উইকেট। মেয়েদের ক্রিকেটে বাংলাদেশের এটিই সেরা বোলিং ফিগার।
আগেরটি ছিল জাহানারা আলমের। গেল মাসে ২৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন এ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেই। বিশ্ব্কাপ ফুটবলের উত্তেজনায় যখন পুরো দুনিয়াই বুদ হয়ে ছিল তখনি মেয়েরা ইতিহাস সৃষ্টি করে। যদিও ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ এখনও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের মেয়েরা সাফল্যের সোনারোঁদে নিজেদের ভাসিয়ে রেখেছে। শেষ ১৩টি টোয়েন্টি-২০ ম্যাচের ১১টিতে জয়ই এরপক্ষে কথা বলতে যথেষ্ট। নেদারল্যান্ডসে টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে সালমা খাতুনরা তাদের সাফল্যের মুকুটে যোগ করেছেন সবচেয়ে উজ্জ্বল পালক। বদলে যাওয়া মানসিকতাই সাফল্যের কারণ বলে জানিয়েছেন দলটির অধিনায়ক সালমা খাতুন। খুলনার এই ক্রিকেটারের কথায়, ‘ক্রিকেট একটি মনস্তাত্বিক খেলা। এখানে মানসিকতার পরিবর্তন হওয়ায় আমরা সাফল্য পাচ্ছি। দলটা যে নতুন তা নয়। আগেও আমরা এই দল নিয়ে খেলেছি। এতদিন আমাদের মূল সমস্যা ছিল ব্যাটিংয়ে। এই জায়গায় উন্নতি করায় ফল পাচ্ছি। আর এই উন্নতির পেছনে বর্তমান কোচিং স্টাফের বড় অবদান রয়েছে। আমাদের সঙ্গে বিসিবির ভালোমানের একজন কোচ রয়েছেন। তিনি ফাহিম স্যার (নাজমুল আবেদিন ফাহিম)। নতুন কোচরাও আমাদের অনেক কিছু শেখাচ্ছেন। যা খুব কাজে দিচ্ছে’। কয়েক মাস আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ব্যর্থতার পর মেয়েদের কোচিং স্টাফ ঢেলে সাজানো হয়েছে। ভারতের অঞ্জু জৈনকে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেবিকা পালশিখর রয়েছেন তার সহকারী হিসেবে। এছাড়া দলের ফিজিও ভারতের। বলা যায় এই কোচিং ষ্টাফই মূলত বদলে যাওয়ার মুল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কোচিং ষ্টাফের সবাই খেলোয়াড়দের নিজের মতো খেলতে খেলতে দিয়েছেন। এতেই প্রত্যেক খেলোয়াড় তার সেরাটা খেলে দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরেছেন।
বদলে যাবার অন্যতম কারিগর বিসিবির গেম ডেভলপমেন্ট ম্যানেজার নাজমুল আবেদিন ফাহিম বলেন, ‘আমরা খেলোয়াড়দের মানসিকতা বদলে দেবার চেষ্টা করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে পেস বোলারদের খেলে মেয়েদের দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটাই তারা প্রয়োগ করে সফল হচ্ছে।’ নেদারল্যান্ডসে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। গ্রুপপর্বে পাপুয়া নিউগিনি, স্বাগতিক নেদারল্যান্ডস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারানোর পর সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ড ও ফাইনালে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন সালমারা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরই মূলত নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে মেয়েদেরকে নিয়ে। সেটা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। আগামী নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠেয় টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ নারী ক্রি‌কেট দলের অনুশীলন ক্যাম্প। এবার প্রথম সপ্তাহে শুরু হওয়া ২০ দিনের এই ক্যাম্পে অবশ্য কোন স্কিল ট্রে‌নিং থাকছে না। শুধুই ফিটনেস ও ফিল্ডিং নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবেন সালমা খাতুন ও তার দল। জানা গেছে সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাটিং, বোলিং স্কিল অনুশীলন শুরু করবে এশিয়ার উঠতি পরাশক্তি এই দলটি। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বসে থাকলেই চলবে না। মূল লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে মোক্ষম জবাব দিতে এখনই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। চলতি মাসের শুরুতে নেদারল্যান্ডসে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়নের মুকুট জিতে দেশে ফিরেছে কোচ আনজু জায়েনের শিষ্যরা। এর ফলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে অংশ নিচ্ছে লাল-সবুজের দুর্দান্ত নারী দল।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল প্রথমবার টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ২০১৬ সালে ভারতে। আর প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার স্বাদ পেয়েছিলো ২০১৪ সালে। সেটা অবশ্য আয়োজক দেশ হওয়ায়। আর এবার খেলার সুযোগ পেয়েছে নিজ যোগ্যতাবলে। সালমা খাতুন আগেও জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ ছিলেন। তবে এবার তিনি দেখলেন নতুন এক দিন। বদলে যাবার কিংবা বদলে দেবার নায়ক তাকেও বলা যেতে পারে। কোচিং ষ্টাফরা মাঠের বাইরে যেভাবে পরিকল্পনা সাজিয়েছে মাঠে তার সঠিক প্রয়োগ করেছেন সালমা। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলকে নিয়ে এতটা আশা কিছুদিন আগেও ছিল না। চলতি বছরের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা মহিলা দলের সঙ্গে বাজে ভাবে হেরে দেশে ফিরে দল। এরপর যায় এশিয়া কাপ খেলতে। সেদিকে করো নজরও ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় দৃশ্যপট। টোয়েন্টি-২০ এশিয়া কাপের ফাইনালে গিয়ে চমকে দেয় দেশবাসীকে। সেখানেই শেষ নয় এশিয়ার নারী দলের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দেশে ফিরে ট্রফি হাতে। আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের মতো কঠিন কন্ডিশনকে জয় করে সাফল্যের মুখ দেখে বাংলাদেশ নারী দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপে কন্ডিশন নিয়ে ভাবনা থাকলেও ভয় পাচ্ছেন না সালমা। এবার সেটা নিয়েই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি দলের কোচিং ষ্টাফরা যেভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবেই খেলতে। আমাদের জন্য আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডের কন্ডিশন কঠিন ছিল। কিন্তু যথেষ্ট চেষ্টা করেছি নিজেদের মানিয়ে নিতে। সফলও হয়েছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কন্ডিশনও কঠিন হবে। তবে এ নিয়ে ভাবনা থাকলে আমাদের পরিকল্পনা সহজ হবে। তবে ভয় পাচ্ছি না।
চেষ্টা থাকবে যত দ্রুত সম্ভব মানিয়ে নেয়া। বিসিবিও আমাদের টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েকদিন আগে সেখানে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাহলে আমাদের জন্য প্রস্তুতিতে আরো সুবিধা হবে।’ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দলের অন্যতম সফল খেলোয়াড় পান্না ঘোষ। ২০০৮ সালে যখন আনসারের চাকরিতে যোগ দেন তিনি, তখন বাংলাদেশে মেয়েদের ক্রিকেটের সবে শুরু। খেলার সুযোগও তেমন ছিল না। আনসারের হয়ে পান্না ঘোষ তাই ভলিবলই খেলে বেড়াতেন। এই খেলায় তাঁর ভূমিকাটা সব সময়ই ‘স্ম্যাশার’-এর। ভলিবলের সেই ‘স্ম্যাশ’ ইদানীং ক্রিকেটেও করছেন এই পেসার। নেদারল্যান্ডসে টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ফাইনালে তাঁর ১৬ রানে ৫ উইকেট নেওয়ার সাফল্যই তো আয়ারল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিয়ে শিরোপা তুলে দিয়েছে সালমা খাতুনের হাতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ