ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবি আল মাহমুদকে যেমন দেখেছি

মুহাম্মদ মতিউর রহমান : আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করি, তখন থেকে আল মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। তবে সে পরিচয় সাক্ষাতে নয়, তাঁর কবিতা ও গল্প পাঠের মাধ্যমে আমি তাঁকে জানার সুযোগ পাই। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয় আরো অনেক পরে। একজন কবি বা লেখকের লেখার মাধ্যমেই তাঁর আসল পরিচয় ফুটে ওঠে। কেননা কোন প্রকৃত কবি বা লেখক তাঁর সৃষ্টির মধ্যে নিজের জীবন ও পরিবেশকেই ফুটিয়ে তোলেন। জীবন-বিমুখ বা বাস্তবতা-বর্জিত কোন সৃষ্টিকর্ম মানুষের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না। 

আল মাহমুদ আর আমার মধ্যে বয়সের ব্যবধান মাত্র দেড় বছর। তাঁর জন্ম ১৯৩৬  সনের ১১ জুলাই। অতি অল্প বয়সেই তিনি কবি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সে খ্যাতিই তাঁর প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে। তিনি তখন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক সবচেয়ে উজ্জ্বল কবিদের একজন। পত্রিকা খুললেই তাঁর লেখা চোখে পড়ে। যদিও প্রধানত তিনি কবি এবং কবি হিসাবেই তাঁর খ্যাতি সমধিক, তবু তিনি কবিতার সাথে সাথে  ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেও  যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা জাতীয় লেখা ও গ্রš’ প্রকাশিত হয়েছে। তাই তাঁর প্রতিভা বহুমাত্রিক ও বিচিত্রগামী বলা যায়। তাঁর সমকালে কবি হিসাবে তিনি ঈর্ষণীয় খ্যাতি অর্জন করেছেন, এটা তাঁর অমিত প্রতিভার পরিচয় বহন করে।  কেননা খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা এমন একটি বিষয়, যা কখনও জোর করে কেউ আদায় করতে পারে না। নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার পরিচয় দিয়েই তা অর্জন করতে হয়। 

অনেকেই কবিতা লেখেন, কিš‘ কালের কষ্টিপাথরে তাঁদের অনেকেই ঝরে পড়েন এবং মাত্র অল্পসংখ্যক কবি অমরতা লাভে সক্ষম হন। আল মাহমুদ সে বিরল কবিদেরই একজন। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিদের সারিতে ভবিষ্যতে যাঁদের নাম অক্ষয় অমর হয়ে থাকবে, আমি মনে করি, আল মাহমুদ নিঃসন্দেহে তাঁদের কাতারে ¯’ান করে  নেবেন। কালের একটি পক্ষপাতহীন নির্দয় কষ্টিপাথর আছে, মহাকাল সে কষ্টিপাথরে কঠোর যাচাই-বাছাই করে অতি অল্পসংখ্যক ব্যক্তিকে তার কোলে ঠাঁই দেয়, আল মাহমুদ আশা করি সে বিচারে উত্তীর্ণ হবার মত অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। 

অবশ্য তার অর্থ এ নয় যে, আল মাহমুদের সবকিছুই আমার কাছে নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য। চাঁদের স্নিগ্ধ  অঙ্গে যেমন কলঙ্ক-রেখা বিদ্যমান, তেমনি সৃষ্টিশীল প্রতিভাধরদেরও সবকিছুই নিষ্ককলঙ্ক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আল মাহমুদকে যখন তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করি, তখন আমার মনে বেশ কিছুটা দ্বিধা ও সংশয়বোধ কাজ করে। কারণ তাঁর প্রতিভার ছটা যেমন তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে বিধৃত, তেমনি তাঁর শব্দচয়ন ও বর্ণনার মধ্যে অশ্লীলতার সোঁদাগন্ধ ভরপুর। সেগুলো একা একা পড়া যায়, উপভোগ করা যায়, কিš‘ প্রকাশ্যে তা পড়তে বা আবৃত্তি করতে মার্জিত র“চিতে বাঁধে। তখন আল মাহমুদের ভরা যৌবন। যৌবনের আবেগ-উত্তেজনা ও দুর্মর বাসনা-কল্পনা তাঁর কলমের আগায় অসংকোচে বেরিয়ে এসেছে। প্রকাশের দুঃসহ বেদনা ও দুর্বিনীত আকাক্সক্ষা তাঁকে হয়তো সংযমী হওয়ার সুযোগ দেয় নি। কিন্ত‘ পরবর্তীতে সেই আল মাহমুদ আশ্চর্যজনকভাবে অনেকটা ¯ি’তধী ও সংযমী হয়ে উঠেছেন। নদী যেমন বাঁকে বাঁকে মোড় নেয়, সৃজনশীল প্রতিভাও তেমনি তাঁদের সৃষ্টিকর্মে মাঝে মাঝে মোড় ফেরার তাগিদ অনুভব করেন। 

একাত্তরে স্বাধীনতা আন্দোলনে যখন বাংলাদেশ উত্তাল, বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যখন নাঙ্গা পায়ে কাঁধে সঙ্গীন তুলে নিয়ে দুর্বৃত্ত হানাদার বাহিনী হটাবার প্রাণপণ সংগ্রামে লিপ্ত, আল মাহমুদ তখন তাঁর ঘরের মায়া ত্যাগ করে সীমান্ত পেরিয়ে স্বাধীনতাকামী কোটি মানুষের কাতারে শামিল হন। প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের চাকুরি গ্রহণ  করেন। বিভিন্নভাবে তিনি  স্বদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কলকাতা ছেড়ে তাঁর চিরচেনা ঢাকায় ফিরে আসেন। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রীটে ‘দৈনিক সংগ্রামে’র অফিস ও মেশিনপত্র দখল করে তখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কতিপয় তর“ণ প্রবক্তা ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ পত্রিকা প্রকাশ করে। আল মাহমুদ পত্রিকার সম্পাদক পদে বরিত হন। স্বাধীনতার পর দেশে যে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, আধিপত্যবাদী ভারতের শোষণ ও অস্ত্র লুণ্ঠনের মহোৎসব চলে, গণকণ্ঠ তার বির“দ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। তৎকালিন সরকার তাতে বিব্রতবোধ করে। ফলে পত্রিকার সম্পাদক আল মাহমুদকে কারাগারে যেতে হয়। কারাগারে বসে শুনেছি, আল মাহমুদের নতুন বোধোদয় ঘটে। তাঁর চিন্তা ও মনন জগতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। কারাগারে বসে তিনি মহাগ্রš’ আল-কুরআন পড়েন  ও তার অর্থ অনুধাবনে মনোযোগী হন। ঐ সময় থেকেই তাঁর জীবনের অবিস্মরণীয় মোড় ফেরা। পরবর্তী জীবনে তাঁর মধ্যে যে বিস্ময়কর নতুনত্ব ও পরিবর্তন ঘটে, আল মাহমুদের পরবর্তী সৃষ্টিকর্মে তার যর্থাথ প্রতিফলন অনিবার্যভাবেই পরিলক্ষিত হয়। তাই কারাগারে যাওয়া যদিও দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু আল মাহমুদের জন্য সেটা ছিল এক সৌভাগ্যের দুরন্ত হাতছানি। তখনও পর্যন্ত আল মাহমুদের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয়নি, তবে বন্ধুদের কাছ থেকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে  আমি তখন থেকেই উৎসাহের সাথে খোঁজখবর রাখা শুরু করি। 

আল মাহমুদের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় যখন ঘটে, তখন আমি দুবাইতে প্রবাস-জীবনযাপন করছিলাম। প্রতি বছর একমাসের ছুটিতে আমি ঢাকায় আসতাম। ঐ ছুটির সময় আমি বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক ও সাহিত্য সভা-সংগঠনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। বিশেষত মগবাজারে বাংলা সাহিত্য পরিষদে তখন প্রতিমাসের দশ তারিখে সাহিত্য সভা ও পঁচিশ তারিখে সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হতো। আমি অন্তত বছরের একটি মাসে সে দু’টি অনুষ্ঠানে যোগদান করার চেষ্টা করতাম। ঐ সময় ও দু’টি অনুষ্ঠান হতো অতি জমজমাট। যাঁরা প্রায়ই নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন Ñ মরহুম দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মরহুম শাহেদ আলী, মরহুম ডক্টর আসকার ইবনে শাইখ,  ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, কবি আল মাহমুদ, কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সাংবাদিক আবুল আসাদ, আব্দুল মান্নান তালিব প্রমুখ। আমি প্রধানত তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা নিয়েই সেসব অনুষ্ঠানে যোগদান করতাম।

দুবাই বসবাসকালে আমি প্রবাসী বাংলাদেশী ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখার উদ্দেশ্যে ১৯৮১ সনে স্থানীয় সরকারের অনুমোদনক্রমে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’ নামে একটি শিক্ষায়তন গড়ে তুলি। এ স্কুলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান উদ্যাপনের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া, এখানে মাসিক সাহিত্য সভার আয়োজন করি, তাতে প্রবাসী বাংলাদেশী কবি-সাহিত্যিকগণ অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসে বসবাস করা সত্ত্বেও তারা যাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারেন ও সৃজনশীল ব্যক্তিরা সাহিত্য চর্চার সুযোগ পান, সেজন্যই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। মাসিক সাহিত্য সভা যখন বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে, তখন প্রতি বছর সেখানে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ও বাংলা পুস্তক প্রদর্শনীর  ব্যবস্থা করার চিন্তা আমাকে বৃহত্তর কর্মসূচী গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করে। এ চিন্তা থেকেই ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ অর্থ্যাৎ আমার প্রবাস-জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত আমি সেখানে উক্ত স্কুলের পক্ষ থেকে এ সম্মেলন ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছি। সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে কবি আল মাহমুদ, জাতীয়  অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক শাহেদ আলী ও শাহাবুদ্দীন আহমদকে সম্মেলনে প্রধান অতিথি করে দুবাই নিয়ে যাই এবং তাঁদেরকে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’ এর পক্ষ থেকে সাহিত্য পুরষ্কার প্রদান করি। এছাড়া, আব্দুল মান্নান তালিব ও মাসুম আহমদ চৌধুরীকেও স্কুলের পক্ষ থেকে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। 

প্রথম বছর অর্থাৎ ১৯৯০ সনে কবি আল মাহমুদকে প্রধান অতিথি করে দুবাই নিয়ে যাই। তিনি দুবাইতে আমার ইউসুফ বাকের রোডের বাসায় দু’সপ্তাহ  আতিথ্য গ্রহণ করেন। এ সময় অষ্টপ্রহর আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছি। শুধুমাত্র ঘুমানোর সময় বাদে দিন-রাত্রির প্রতিটি মুহূর্ত আমরা নানা গল্প-গুজব, খাওয়া-দাওয়া ও ঘুরে বেড়ানোর কাজে ব্যস্ত থেকেছি। দুবাইতে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ছাড়াও আমি তাঁর উপলক্ষে আয়োজিত আবু-ধাবী, শারজাহ্ ও অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছি। স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেছি। তাঁকে দেখার ও তাঁর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে প্রবাসের অনেকেই আমার বাসায় এসেছেন এবং দীর্ঘ সময় নানা আলাপ-আলোচনায় সময় কাটিয়েছেন। কবির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে তারা অনেকেই তাঁর জন্য নানা উপহারসামগ্রি নিয়ে এসেছেন। এরদ্বারা প্রবাসেও তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা উপলব্ধি করা যায়।

দুবাইতে আমি তখন একটি ছয়তলা বিল্ডিং-এর চারতলায় থাকতাম। ঐ সময় আমার বসবাসরত বিল্ডিংয়ের চারপাশে অত উঁচু বিল্ডিং আর ছিল না। তাই আমার ফ্ল্যাটের চারপাশটাই ছিল খোলা। বিশেষত দক্ষিণ ও উত্তর পাশের খোলা জানালা দিয়ে দূরের আকাশ  ও মনোরোম দৃশ্যরাজি চোখে পড়ত। উত্তর পাশে খানিকটা দূরে আরব উপসাগর। সাগরের ঢেউ-এর শব্দ কখনো কখনো ভেসে আসতো, সাগরের শীতল হাওয়া প্রবাহিত হলে আমার ঘরের জানালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে তা অনুভব করতাম। জানালার পাশে নানা জাতের পাখি এসে কিচির মিচির শব্দ করে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিত। মধ্যাহ্নের অলস মুহূর্তে অনেক সময় বিছানায় শুয়ে ঘুঘুর ডাক ও চড়–ই পাখির আনাগোনার শব্দে ঘুম ভেঙে যেতো। আল মাহমুদ কবি মানুষ। প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য তাঁর কাছে অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি  করে। তিনি প্রায়ই উদাস হয়ে পড়তেন। বলতেন, ‘মরুভূমির দেশে এমন শীতল হাওয়া আর পাখির কিচির-মিচির শব্দ শোনা যাবে, সে সম্পর্কে আগে আমার কোন ধারণাই ছিল না।’ প্রত্যূষে কাক-ডাকা ভোরে  যখন প্রকৃতি নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে পড়তো, সমুদ্রের শীতল হাওয়া জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতো আর তার সাথে পাখির কুজ্বন ভেসে আসতো, তখন তিনি প্রায়ই মুগ্ধ-বিহ্বল হয়ে পড়তেন। তাঁর ভাবালুতার কথা ও সৌন্দর্যমুগ্ধতার বিষয় তিনি অকপটে আমার নিকট প্রকাশ করতেন। দুবাইতে বাংলাদেশী খানা, প্রবাসী বাংলাদেশীদের আনাগোনা আর তার সাথে বিদেশী নানা জাতের ফল ও     আন্তরিক আপ্যায়নে তাঁর অভিভুত হওয়ার বিষয় তিনি প্রায়ই সানন্দে ব্যক্ত করতেন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ