ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আত্মহননের গল্প

মোহাম্মদ অয়েজুল হক : আর্জেন্টেনা হেরে যাওয়াতে গত কিছুদিন  তারিকের মুখে কোন কথা নেই। যে ছেলেটা সারাদিন শুধু কথা বলে তাকে যদি দেখা যায় একেবারে নিরব, নিশ্চুপ, মলিন তাহলে কার না কষ্ট হয়। ছোটবেলা থেকেই কি একটা রোগে আক্রান্ত তারিক। হঠাত হঠত রেগে যায়। ডাক্তার বলেছে ওর ব্রেনের ওপর চাপ না দিতে। এজন্য তের বছর বয়স হলেও বাবা-মা পড়ালেখায় চাপ দেননি। স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাকে বোকা বলা চলেনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেধা শক্তির প্রশংসা করতে হয়। তার রুটিন ওয়ার্ক হলো খাওয়া, সামান্য ঘুমানো আর যতো প্রকার খেলা আছে সেগুলো দেখা। ইংরাজি,বাংলা,হিন্দী তিন ভাষার ক্ষুদে ধারাভাষ্যকার বলা যায় তাকে। ছোটবড় সব খেলায় তারিকের কিছু দল থাকে। তার পছন্দের দলের ব্যাপারে সে যেমন আন্তরিক তেমন সিরিয়াস। সাতসকালে তারিক কে বিবর্ণ চেহারায় প্রাইমারী স্কুলের ওয়ালে বসে থাকতে দেখে কষ্ট হয় হাফিজের। হাফিজ তারিকের খালাতো ভাই। মায়াভরা কন্ঠে বলে, কি রে মন খারাপ কেন?

স্বভাব সুলভ ভাবে তারিক দুই হাত মাথায় ডলতে ডলতে বলে, আর বইলেন না ভাইজান। মাথায় প্রেশার।

- কিসের পেশাব?

- ধুর, কথা বোঝেন না। তারিক হাত ছুড়ে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দেয়। আবার মাথা ডলে। বিশ্বকাপে এভাবে খেললে চলে। ওহ.....  একটা দীর্ঘশ্বাস।

হাফিজ সান্ত¡না দেয়, খেলাধুলা নিয়ে এতো সিরিয়াস হলে চলে? নাম রাস্তা দিয়ে হেটে বেড়াই। তারিক ওয়াল থেকে নামতে নামতে বলে, আপনি ব্যাপার টা বুঝতেছেন না।

- শোন এবার তোর দ্বিতীয় দল হলো ফ্রান্স।

- ওরাই তো আমাদের বিদায় করলো। 

- হ্যা, ওরা চ্যাম্পিয়ন হলে বলতে পারবি আমরা যাদের কাছে হেরেছি তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

তারিক ঘাড় নাড়ে, তা ঠিক কইছেন।

তারিকের কথা শেষ হয় না, মর্নিং ওয়াকে বের হওয়া আনোয়ার মামা হাজির। ব্রাজিলের জার্সি পরিহিত মানুষটা এলাকায় কমন মামা হিসাবে পরিচিত। তিনি সেই সত্তরের দশক থেকে ওয়ার্ল্ড কাপ দেখে আসছেন। বিগত পঞ্চাশ বছরের জয়, পরাজয়, গোল, চ্যাম্পিয়ন সব হিসাব এমনভাবে বলেন যেন মানুষ না, জীবন্ত ইতিহাস গ্রন্থ। তথ্য সরবরাহে ফিফার কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকা সবগুলোকে ছাটাই করে এক আনোয়ার মামা কে বসিয়ে দিলে যথেষ্ট হয়ে আরও কিছু উথলে পড়বে! যৌবনকালে খেলা নিয়ে বহু মাতামাতি, হাতাহাতি করেছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ায় এখন শুধু মুখ নির্ভর।

- বেশিদূর যাইতে পারলা না মিয়া। গোল তো না যেন ডাবের মতো এক একটা মিষ্টি। পেট ভরেছে?

- ইস, তা কি হইছে। এইদিন দিন না, মনে হয় আর বিশ্বকাপ হবে না.... আর আমি এখন ফ্রান্সেন্টিনা। 

- মানে!

- বোঝেনা। তারিক হাসে। ভাইজান কি কব কন? 

হাফিজ বুঝিয়ে বলে, আগে আর্জেন্টিনা ছিল এখন ফ্রান্স।

- এবার বুঝছেন। খেলা শিখাই দেবেনে.....

তারিকের কথা শেষ হয় না। আনোয়ার মামা ধমক দেন, থাম। আমাগো খেলা দেখছস কাপ যাবে কই?

- হ, যাবে কই! কাপের এক টুকরা আপনার বাড়িও চলে আসবে। 

- হারা মুখে বড় কথা।  সেলফিস......  হা হা।

তারিক কিছুক্ষণ ভাবে। কি বললেন, সেলফিস। সেল- বিক্রি, ফিস –মাছ । সেলফিস। মাছবিক্রি। ও আচ্ছা তা কে করে?

- কে করে মানে!

- বললেন না সেলফিস। তা মাছ বিক্রি টা করে কে, নেইমার?

আনোয়ার মামা অন্যপক্ষকে কটাক্ষ করলেও নিজের বেলা বিপরীত। রেগে ওঠেন। রাগের সাথেই বলেন, ধুর বা। 

তারিকও রেগে যায়। লাফ দিয়ে ওঠে, কি বলেন র্দূবল? আমার টিম র্দূবল। সব সময় মুরব্বী দেখার টাইম নাই। ভাইজান গরান কাঠটা নিয়ে আসেন তো। ওনার পাছায় কটা কষে দেই। আর্জেন্টিনা বদলাই ফ্রান্স  হইছি, এখনো দূর্বল!

আনোয়ার সাহেব না দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে যান। তারিক চিৎকার করতে থাকে আমার টিম র্দূবল না সবল একটু দেখে যান।

বিকালের দিকে আনোয়ার মামার সাথে দেখা হতেই সে একই প্রসঙ্গ। দু’দিনের ছেলে আমার সাথে কি ব্যবহারটা করলো দেখেলেই তো। আমি বুড়ো হয়ে গেছি মাগার আমার টিম তো আর বুড়া হয়ে যায়নি। দেখো যদি কপাল ভাল হয় আর আমার টিমের সাথে খেলা পড়ে ঠিকই ব্রজিল এর প্রতিশোধ না নিয়ে থাকতে পারবে না। নেবে। দল পালটিয়ে ফ্রান্স! মনেমনে সব ঠিক আছে। ফ্রান্স, ফ্রান্সের গুষ্টি কিলাই। টিম সহ সবগুলোর পাছায় দুটো করে লাথি মেরে বিদায় করে দেবে। কথার ভাব ও ধরন দেখে মনে হয় গ্রামের এ গন্ড গোল ও আনোয়ার মামার সাথে বেয়াদবির খবর  সরসরি লাইভ সম্প্রচার হয়েছে আর তা বসে বসে দেখেছে ব্রাজিলের সব খেলোয়াড়। বিশ্বকাপ পরে, আগে আনোয়ার মামার বেয়াদবির উপযুক্ত জবাব দেয়াটাই বেশি গুরুত্বর্পূন মনে করছে ব্রাজিল।

হাফিজ বোঝায়, ছোট মানুষ। অসুস্থ।  হঠাত রেগে যায় ওর কথা ধরেন কেন? ছোটদের মাফ করে দিতে হয়।

- কিসের ছোট! কিসের অসুস্থ? পাকা কথা বলার সময় সেগুলো কি সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আর্জেন্টিনা চলে যায়!

হাফিজ কথা বাড়ায় না। সন্ধ্যার একটু পরে মোবাইল টা বেজে ওঠে, হ্যালো। 

ওপাশে হাফিজের খালা করুন কন্ঠে বলেন, তারিক কে কারা যেন মেরেছে। 

চমকে ওঠে হাফিজ। কারা যেন মেরেছে! মিরান্দা, ফ্যাগনার, কৌতিনহো, পওলিনহো,  গ্যাব্রিয়েল, নেইমার? প্রতিশোধ নিল! এদেশে লক্ষ লক্ষ নেইমার, মেসি। থাকুক। তাই বলে সহিংসতা! 

- তারিক কোথায়?

- হসপিটালে।

সবকিছু শুনে হাফিজ দেরী করেনা। হাসপাতালে ছোটে। তারিক পড়ে আছে অচেতন। মাথায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বেশ কয়েকটা সেলাই। এতটুকু মানুষ কে এভাবে মারে! সেটাও ল্যাটিন আমেরিকার এক দেশের খেলা নিয়ে! নিজের অজান্তেই হেসে ওঠে। হাসিতে ব্যথা, হাসিতে কান্না। গড়াগড়ি খায়। বুকে বাজে।

ঘটনার দিন কয়েক পর ব্রাজিলের খেলা। ব্রাজিল সমর্থক গ্রুপ বিরাট পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করেছে। গভীর রাতে খেলা। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ দুটোর খেলা হলে বাংলাদেশে রাত আর রাত থাকেনা। মোড়ে মোড়ে মানুষ। গভীর রাতে আতসবাজির শব্দ। ঘরে স্বামী - স্ত্রী, মহল্লায় বন্ধু বন্ধু তর্ক বিতর্ক। উত্তেজনা।  মারামারি। জমি বিক্রি করে পতাকা ক্রয়। পতাকা টানাতে গিয়ে পড়ে পড়ে মৃত্যু। বাড়ী - গাড়ী আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকায় রাংগানো। প্রিয় বাংলাদেশ কে বিদেশী পতাকায় ছেয়ে ফেলা। হাফিজের কাছে আবেগ অনুভূতির বাড়াবাড়ি মনে হয়।

মধ্যরাত্রি। শতশত মানুষ জড়ো হয়েছে প্রজেক্টরের সামনে। খেলা শুরুর আগে আনোয়ার মামার সাথে দেখা। হাফিজ এড়িয়ে যেতে চায়। পারে না। ষাড়ের মতো ঘ্যা ঘ্যা করে বলে ওঠেন, আজ দেখবে। খেলা কাকে বলে। 

- খেলা দেখতে আসিনি।

- তো?

- আপনাকে দেখতে এসেছি।

আনোয়ার মামা ভড়কে যান। অনেক মেসি ফুঁসে আছে। ব্রাজিল হারলে তারা জ্বলে উঠবে। 

নরম সুরে বলেন, হাফিজ তুমি নেইমার না মেসি?

হাফিজ নরম সুরেই বলে, আমি বাংলাদেশ, আমি লাল সবুজের গালিচা, আমি হাফিজ, আমি মানুষ। 

- মানে!

- মানে বুঝে লাভ নেই। বয়স হয়েছে, খেলা কে স্রেফ বিনোদন হিসাবে নেন।

আনোয়ার মামা চুপকরে ব্রাজিল ভক্তদের ভেতর ঢুকে পড়েন।

খেলা চলছে। চরম উত্তেজনা। সত্তর মিনিট এক এক গোল। আক্রমণ পালটা আক্রমণ। হাফ টাইমের আগেই প্রিয় দল দুখানা গোল খেয়ে বসে। গোল খাবার সময় ওনার মাথা দেখা যায়না। তিনহাত মাটির নিচে ঢুকে যেতে পারলে যেন তিনি বেচে যান এমন ভাব। শেষ দিকে একটা গোল শোধের সময় আনোয়ার মামা তিনহাত লাফিয়ে উঠেছিলেন। বাকি একটা। আনোয়ার মামার অস্থিরতা বেড়ে যায়। খেলা চলে। যতো সময় গড়ায় আনোয়ার মামার অস্থিরতা ততো বাড়তে থাকে। খেলা শেষ হতে মিনিট খানেক বাকি। হঠাৎ খেলা বাদ দিয়ে মানুষের জটলা পাকে। হাফিজ ভীড়ের ভেতর যায়। আনোয়ার মামা হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছেন। নীরব, নিস্তেজ, নিথর। লোকজন টেনেটুনে  দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। 

ফাইনাল খেলার দিন। অনোয়ার মামা নেই, তারিক অসুস্থ। হাফিজের চোখ বেয়ে কেন যেন নিজের অজান্তেই অশ্রু গড়ায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ