ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাহিত্যিক প্রবাদে সমাজ : আরো প্রদীপ জ্বলবে

ড. সুলতান মুহম্মদ রাজ্জাক : মানব সভ্যতা বিকাশের অন্যতম নিয়ামক তথা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশ ভাষা। ভাষা মানুষের মনোগত ভাব প্রকাশের দৈহিক ও শাব্দিক কৌশল। আজকাল ভাষার রূপ অনেক বদলে গেছে। নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ভাষাকে কোন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে তা অনুমান করাও দুরহ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষা ও সংস্কৃতি শব্দ দুটি একত্রে উচ্চারিত হয়। সংস্কৃতি বলতে এক কথায় জীবন-যাপনের নিত্য-নৈমিত্তিক পরিবর্তনশীল আচারণকে বুঝায়।  আমরা একুশ শতকে এসে পরিবর্তনের মহাসড়কে চলছি। শুধু আমরা নই পৃথিবীর প্রায় সকল নৃ-গোষ্ঠী  আজ পরিবর্তনের মহাসড়কে।

এমন একটি পরিবর্তনের মহাক্ষণে এসে আমরা ‘‘বাংলা সাহিত্যিক প্রবাদে সমাজ’’ বিষয়ক আলোচনায় অবতীর্ণ। সম্প্রতি প্রিয় অনুজ ড. আশরাফ পিন্টরু ‘‘সাহিত্যিক প্রবাদে সমাজ’’ শিরোনামে একটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটি তাঁর পি-এইচ.ডি অভিসন্দর্ভের বর্ধিত সংস্করণ। বইটি আমার কাছে বেশ সুলিখিত মনে হয়েছে, আমি আদ্য-প্রান্ত বইটি পড়েছি। মোট ছয়টি অধ্যায়ে বইটি বিভাজিত। তথ্য-উপাত্তে সমৃদ্ধ। প্রবাদ ভাষার কথন-ভঙির একটি সরস উপাদান। আমরা নিত্য-নৈমিত্তিক কথায় প্রায়ই প্রবাদ ব্যবহার করে থাকিÑযা ভাষাকে গতিশীল ও আলংকরিত করে। 

প্রবাদ-প্রবচন, বাণী এগুলোর ব্যবহার স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে। বাণী সম্পর্কে আমরা সবাই জানি কোনো বিজ্ঞ মানুষ, সমাজবেত্তা, ধর্মবেত্তা, রাজিৈনতকবেত্তা যা বলে গেছেন এবং যার ভেতরে শিক্ষণীয় দিক থাকে। বাণীগুলোকে সাধারণত আমরা বাণীদাতার নাম উল্লেখ করে বলে থাকি। কিন্তু প্রবাদ-প্রবচনের ক্ষেত্রে সে ভাবে আমরা উপস্থাপন করতে পারি না। প্রবাদ ও প্রবচন লোকজ উৎস থেকে আমরা ব্যবহার করি। এগুলো লোকসাহিত্যের অন্তর্গত।

ড.আশরাফ পিন্টুর বইটির বিশেষত্ব হলো বাংলা সাহিত্যে প্রবাদগুলোর ব্যবহার। এটাই এই বইয়ের বিশেষত্ব ও অভিনবত্ব প্রকাশ করেছে। বইটির প্রথম অধ্যায়ে প্রবাদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ নিয়ে অনেক মণীষীর উপাত্ত সহযোগে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর রচনায় পরিশ্রমের অনুভব করা যায়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্যে প্রবাদের ব্যবহার সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রাচীনকাল থেকে অর্থাৎ ঋগে¦দ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাব্যসাহিত্যে প্রবাদের ব্যবহার সংক্ষিপ্ত কিন্তু চৌম্বক বিষয়গুলো আছে যা মানবজীবনের নানা অভিজ্ঞতার বিষয়কে নির্দেশ করে। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে আধুনিক কাব্য সাহিত্যে ব্যবহৃত প্রবাদ। এ পর্যায়ে সাহিত্যিক গবেষক ড.আশরাফ পিন্টু ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল মধূসূদন দত্ত, বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখ বিখ্যাত কবির কবিতায় প্রবাদের ব্যবহার আলোচনা করেছেন। এ পর্যায়ে আধুনিক ছড়ায় প্রবাদের ব্যবহার বাদ পড়ে নি।

চতুর্থ অধ্যায়ে  গবেষক প্রবন্ধ সাহিত্যে প্রবাদের ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন। প্রবন্ধ সাহিত্য স্বভাবত আটপৌড় ভাষায় রচিত হয় না। সাহিত্যে এ অধ্যায়ে থাকে আলোচনা, সমালোচনা ও গবেষণা। সঙ্গত কারণেই এর ভাষা হয় গুরু-গম্ভীর। এখানে প্রবাদের ব্যবহার অনেকটাই পরিমার্জিত থাকে। গবেষক এখানে বাংলা গদ্যের প্রারম্ভ পর্যায় থেকে অর্থাৎ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার থেকে শুরু করেছেন এবং শেষ করেছেন হুমায়ূন আজাদ পর্যন্ত। পঞ্চম অধায় সজ্জিত হয়েছে বাংলা কথাসাহিত্যে ব্যবহৃত প্রবাদ নিয়ে। এ অধ্যায়কে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। উপন্যাস ও ছোটগল্প। প্যারীচাঁদ মিত্র থেকে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত। বাংলা কথাসাহিত্যে সবচেয়ে আবেদন সৃষ্টিকারী ঔপন্যাসিক ও গল্পকারদের সৃষ্টিকর্মে প্রবাদের ব্যবহার এখানে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে পরিষ্ফুটিত।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে বাংলা নাটক। নাটক সংলাপ নির্ভর সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ, প্রাক-আধুনিক ও আধুনিক এবং বর্তমান যুগের আধুনিকোত্তর যুগেও বর্ণনাধর্মিতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সংলাপ ও নাটকের উপাদান সর্বত্র। এ পর্যায়ে গবেষক মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ নাট্যকারের নাটকে ব্যবহৃত প্রবাদগুলো সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। 

আমাদের জীবন-জীবিকা সংস্কৃতি একটি বহমান নদীর মতো। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে বয়ে চলেছি। গবেষণা সব সময়ই স্থান-কাল-পাত্র এই তিন প্যারামিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই আজকের গবেষণা আগামীর গবেষণার পাথেয়। ড.আশরাফ পিন্টুর এই গবেষণা এই সময়ের একটি প্রার্থিত গবেষণা। প্রবাদ-প্রবচন নিয়ে গবেষণার আকাল বাংলা সাহিত্যে এখনো রয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে এ গবেষণা একটি নতুন সোপান যোগ করেছে, করেছে বাংলা সাহিত্যে গবেষণাকে ঋদ্ধ। বইটির মূল্য : ২৮০ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ