ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাকিবের বন্ধু কাক

শামীম খান যুবরাজ : শাকিবদের ব্যালকনিটার পাশেই শজনে গাছটি তার ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে। শজনে গাছটির আরো দু’জন সঙ্গী আছে দু’পাশে। একটি পেঁপে আর অন্যটি কাঁঠাল গাছ। শাকিবের বয়স মাত্র তিন বছর। স্কুলে যেতে হয় না তাকে। সারাদিন বসার রুম, বেডরুম আর ব্যালকনিতে খেলাধুলা করে। ব্যালকনিটা শাকিবের খুব প্রিয় জায়গা। সকালে আব্বু যখন অফিসে চলে যান তখন ব্যালকনিটা তার সাথি হয়। সাথি হয় শজনে, পেঁপে আর কাঁঠাল গাছ। শজনের ডালে হরেক রকম পাখির ওড়াউড়ি সব সময় লেগেই থাকে। টুনটুনি, চড়–ই, বুলবুলি, দোয়েল, শালিকসহ আরো নাম না জানা পাখিরা কিচির মিচির সুরে গান শুনিয়ে যায় শাকিবকে। শজনের যে ডালটি এক্কেবারে নিচে ডোবার পানি ছুঁই ছুঁই করছে, সে ডালটিতে মাঝে মাঝে মাছরাঙারা ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ঘাপটি মারা মাছরাঙাদের দেখলে শাকিবও চুপচাপ বসে তাদের মাছ ধরা দেখে। মাছ ধরার পর খুশিতে লেজ উঁচিয়ে টুইট টুইট ডাক দিলে শাকিব আনন্দে হাততালি দেয়। শাকিবের হাততালির শব্দে মাছরাঙা পালিয়ে যায়। তখন মাছরাঙাটির জন্য মন খারাপ করে সে। নিজের বোকামির জন্য মনে মনে নিজেকে বকা দেয়। বর্ষাকালে রিনিঝিনি শব্দে ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো শজনে ডাল ছুঁয়ে ব্যালকনিতে এসে পড়ে। শাকিব ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ঝরে পড়া দেখে। বৃষ্টি পেয়ে শজনে গাছটি যখন আনন্দে ডালপালা নাড়ায় শাকিবের মন খুশিতে ভরে ওঠে তখন।

একদিন সকালে আব্বুকে বিদায় দিয়ে ব্যালকনির দিকে আসতেই কা কা শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ায় সে। কাঁঠাল গাছটির ঘন পাতার আড়াল থেকে একটি কাক কাতর কন্ঠে অবিরাম ডেকে যা”েছ। শাকিব ভাল করে দেখল কাকটির একটি পা নেই। শাকিবকে দেখে অসহায় মায়াবী চাহনিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এক পায়ের কাকটির অসহায়ত্ব দেখে কষ্ট হয় শাকিবের। দুপুরের পর ঘুম থেকে জেগে শাকিব দেখল কাকটি এখনও যায় নি। ঝিম ধরে বসে আছে কাঁঠাল পাতার আড়ালে।

পরদিন সকালে কাকটির কা কা রবে ঘুম ভাঙল শাকিবের। ব্যালকনিতে এসে দেখল কাকটি তার দিকে তাকিয়ে একটানা ডেকে যা”েছ। শাকিব বুঝতে পারে কাকটি ক্ষুধার্ত। কিš‘ কীভাবে খাবার দেবে? আম্মুকে ডেকে নিয়ে আসে ব্যালকনিতে। আম্মুও আফসোস করলেন অসহায় কাকটির জন্য। সেদিন ছিল আব্বুর অফিস ছুটির দিন। শাকিব আব্বুকে কাকটির কথা জানালে তিনি ব্যালকনিতে গিয়ে কাকটিকে দেখলেন। তার ছোট্ট ছেলেটির পাখির প্রতি ভালোবাসা দেখে খুব খুশি হলেন। শাকিবকে কাছে ডেকে বললেন, পাখির প্রতি তোমার ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ। আমাদের প্রিয় নবী (স) পাখিদের খুব ভালোবাসতেন। তোমার এই কাক বন্ধুটিকে খাবারের ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করব।

তারপর বাবা ব্যালকনির পাশে পেঁপে গাছটির ছড়ানো পাতায় কিছু খাবার ছিটিয়ে দিলেন। ক্ষুধার্ত কাকটি শজনে ডালে বসে সেগুলো পেট পুরে খেল। তার মায়াবী চাহনি আর কা কা শব্দে কৃতজ্ঞতা জানাল শাকিবদের। এরপর প্রতিদিন রুটিন করে পেঁপের পাতায় কাকটিকে খাবার দেন শাকিবের আম্মু। শাকিব ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাকের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাবারের দৃশ্য দেখে। খাবার দিয়ে কাকটিকে ‘বন্ধু কাক’ বলে ডাক দিলেই শজনে ডালে এসে খাবার খেয়ে যায়। বন্ধু কাকের সাথে বেশ ভালোই কাটছিল শাকিবের দিনগুলি।

একদিন ঘুম থেকে জেগে ঘরের মধ্যে ফকফকা আলো দেখে অবাক হয়ে যায় শাকিব। ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে তার প্রিয় শজনে গাছটি নেই। কাঁঠাল আর পেঁপে গাছ দু’টিও রেহাই পায় নি নিষ্ঠুর কুঠারের হাত থেকে। গাছগুলো কেটে ডোবা ভরাট করে এপার্টমেন্ট করার কাজ শুরু করে দেয় ডেভলপাররা। সকাল থেকেই ইট ভাঙা আর রড কাটার মেশিনের আওয়াজে কান ঝালাপালা।

এখন আর পাখির গানে ঘুম ভাঙে না শাকিবের। তার প্রিয় শজনে গাছটিও নেই। অভিমানী বন্ধু কাকও চলে গেছে তাকে ছেড়ে। এক পা নিয়ে বেচারা কোথায় আছে, কী খা”েছ কে জানে! ভাবতে ভাবতে চোখের কোণ ভরে যায় শাকিবের।

শাকিবের আব্বু ছেলের মনের অব¯’া বুঝতে পেরে বাসা বদল করে নিলেন। আরো বড় ব্যালকনি এখন নতুন বাসাটার। তবুও শাকিবের মনে আনন্দ নেই। 

কিছুদিন পর পাশের বাসার রাহাতের সাথে পরিচয় হয় তার। রাহাত খুব ভালো ছেলে। সমবয়সী খেলার সাথি পেয়ে শাকিব এখন খুশি। ছাদে বসে রাহাতকে তার বন্ধু কাকের গল্প শোনায়। সে অবাক হয়ে শোনে সেসব কথা। শাকিবের পিঠে হাত রেখে শান্তনা দেয় রাহাত, তোর বন্ধু কাকের জন্য আমারও খুব কষ্ট হ”েছ রে, মন খারাপ করিস না সে নিশ্চয়ই ভালো আছে।

দুই বন্ধুর কথা শুনে কাছে এসে বসলেন শাকিবের আব্বু, জানো কাকরা আমাদের পরম আপনজন, প্রকৃতির বন্ধু। আমাদের প্রতিদিনের ফেলে দেয়া উ”িছষ্ট খাবারগুলো খেয়ে ওরা পরিবেশ রক্ষা করছে। পরিষ্কার রাখছে আমাদের আশপাশ।

আব্বুর কথায় শাকিব খুশি হয়ে বলে, তাহলে তো সব কাকেরাই আমার বন্ধু। আকাশের দিকে দু’হাত ছড়িয়ে দেয় শাকিব। চোখ দু’টো বন্ধ করে নেয়। সে দেখতে পায় আকাশে উড়ে বেড়ানো শত শত কাকের মাঝে তার এক পা ওয়ালা বন্ধু কাকটিও উড়ছে আর কা কা শব্দে শাকিবকে ডাকছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ