ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমলারা ফাঁসলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রাজনৈতিক হোতারা

 

এইচ এম আকতার: বড়পুকুরিয়া কয়লা কেলেঙ্কারিতে সারা দেশে যখন হৈ-চৈ তখনও নিরাপদে রয়েছে মূল হোতারা। সামান্য বেতনের আমলাদের পাকড়াও করলেও রাজনৈতিক হোতারা এখনও ধরা ছোয়ার বাহিরে। শুধু বড়পুকুরিয়াই নয়, আর্থিক খাতে যত বড় বড় দুর্নীতি হয়েছে সব কয়টিতেই তাদের পেছনে থাকা মূল হোতারা সেফ জোনেই রয়ে গেছেন। এতে করে দুর্নীতি কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। কারণ রাজনৈতিক যোগসাজস ছাড়া এত বড় দুর্নীতি করার সাহস নেই আমলাদের। 

জানা গেছে,এই কয়লা খনি থেকে উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সালে। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে পাঁচ-ছয় বছর ধরে কয়লা টেন্ডারে বিক্রি হতো। সারা দেশের ইটের ভাটাগুলো ছিল প্রধান ক্রেতা। জানা গেছে, ইট পোড়ানোর মওসুমে টেন্ডারের বাইরেও মন্ত্রী এম-পিদের কাছ থেকে ডি-ও (আদেশ) নিয়েও ব্যবসায়ীরা কয়লা কিনতে আসতেন।

এটা একরকম ওপেন সিক্রেট ছিল যে ব্যবসায়ী এবং খনির কিছু কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট কালোবাজারে কয়লা ছেড়ে দেয় ...এটা এখন কাগজে কলমে দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এসব মন্ত্রী-এমপিদের নাম কিন্তু মিডেয়ায় আসছে না। যাদের আদেশে টেন্ডারের বাহিরেও কয়লা বিক্রি হতো তারা কারা। তাদের সাথে আমলাদের কি সর্ম্পক রয়েছে। এ ঘটনায় তারা কতটুকু জড়িত।

জানা গেছে, এর আগেও সোনালী ব্যাংক,জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ সব কয়টি বড় দুর্নীতিতে শুধু মাত্র আমলাদের ফাঁসানো হয়েছে। একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ চুরি, সোনা কেলেঙ্কারিতেই কারো নাম প্রকাশ পায়নি। রহস্য এখনও গোপন রয়েছে। এর পেছনে কারা রয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। এসব আমলাদের সরকার বাচাই করেই নিয়োগ দিতে থাকেন। তাদের বিশ্বস্ত না হলে এসব উচ্চ পথে কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয় না।

এদের নিয়োগের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। যারা তাদের এ পথে নিয়োগ দিয়ে থাকেন তারাই তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের নাম গোপন থাকে আর যখন দুর্নীতিতে ধরা খায় তখনও এ রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের নাম গোপন থাকে। আসরে আমলারাই সব সময় বলির পাঠা হয়।

আর্থিক খাতে যতগুলো দুর্নীতি হয়েছে,সব কয়টিতেই আমলারা দায়ী হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে আমলারা চাইলেই কি এত বড় দুর্নীতি করতে পারে। নাকি তাদের সাথে ক্ষমতাসিনদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে। আমলাদের সাথে সম্পর্ক রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করলেও রাজনৈতিক এসব সিন্ডিকেট গোপনেই থাকেন। আর প্রকাশ্যে হয়রানির শিকার হন দু পয়সার আমলারা। দুর্নীতি হওয়া সব কয়টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডি কিংবা পরিচালকদের নামে মামলা হলেও তাদের যেসব রাজনৈতিক নেতারা ব্যবহার করেছেন তাদের নাম প্রকাশ পায়নি। বাড়ি গাড়ি কিংবা বিদেশের ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা জমা হলেও দুর্নীতির দায় নেই তাদের।

এরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজ নেতাদের যত দিন আইনের আওতায় আনা না যাবে তত দিন দেশের দুর্নীতি কমবে না। এদের মুখোশ খোলা না গেছে দুর্নীতি আরও বাড়বে। দু-পয়সার আমলাদের সাজা দিয়ে কোন লাভ হবে না। অতীতেও হয়নি ভবিষতেও হবে না।

বাংলাদেশের দিনাজপুরে বড় পুকুরিয়া কযলা খনি থেকে কয়লা চুরির কেলেঙ্কারি সপ্তাহ-খানেক আগে ফাঁস হয়ে পড়ার পর সরকারের শীর্ষ মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দোষীদের দ্রত বের করার নির্দেশ দিযেছেন। ১৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চুরি ও দুর্নীতির মামলা হয়েছে। তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খনির চারজন শীর্ষ কর্মকর্তার দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সরকারি এবং স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই কয়লা চুরির ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের প্রথম টনক নড়ে জুন মাসে যখন বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়লা সরবরাহে ঘাটতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে। যন্ত্রপাতি স্থানান্তর করতে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে খনির উৎপাদন কিছুদিনের বন্ধ থাকবে এই খবর পাওয়ার পর বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, খনি কর্তৃপক্ষ তখনও আশ্বাস দিয়েছিল, যথেষ্ট মজুদ তাদের রয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি মত কয়লা সরবরাহ করতে না পারায় জুলাইতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়। পরপরই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত করা হয়। তখনই কর্তৃপক্ষ টের পান কয়লার প্রয়োজনীয় মজুদ আদৌ নেই।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি যখন সেই তদন্ত রিপোর্টটি বের হয়, তখন দেখা যায় ২০০৫ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন এবং সরবরাহের হিসাবের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কাগজে কলমে এই ফারাক ১৪৪,৬৪৪ টন। অর্থাৎ ১৩ বছর ধরে খনি থেকে কয়লা চুরি হয়েছে।

কয়লার অভাবে পরে গত রোববার বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু চীনা একটি কোম্পানিকে কয়লা উত্তোলনের জন্য ফি দিতে হয়, সেজন্য উৎপাদনের হিসাবটি পেট্রোবাংলাকে কড়ায়-গন্ডায় রাখতে হয়। সে কারণেই তদন্তে হিসাবের গরমিল সহজে ফাঁস হয়ে যায়।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ঐ তদন্তের পরে পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে খনির শীর্ষ পর্যায়ের চারজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। দুজনকে ঢাকায় পেট্রোবাংলা সদর দপ্তরে বদলি করে দেওয়া হয়। পেট্রোবাংলা পুরো বিষয়টি এখন বিস্তারিতভাবে তদন্ত করছে।

 

মঙ্গলবার পার্বতীপুর থানায় একটি দুর্নীতির মামলা হয়েছে। খনি কর্তৃপক্ষেরই একজন কর্মকর্তা মামলাটি করেছেন যেখানে ১৯ জন কর্মকর্তাকে আসামী করা হয়েছে।

পার্বতীপুর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন ঐ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে - ২০০৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১৪৪,৬৪৪মেট্রিক টন কয়লা, যার আনুমানিক মূল্য ২৩০ কোটি টাকা, ঘাটতি বা চুরি হয়েছে বলে অনুমিত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, যেহেতু মামলাটি দুদকের তফশীলভূক্ত তাই পুলিশ মামলার নথিপত্র দুদকের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই কেলেঙ্কারি এখন তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন । একজন উপ-পরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। দুদকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই তদন্ত দল দিনাজপুর যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দিনাজপুরের সাংবাদিক আসাদুল্লাহ সরকার বলছেন, কয়লা চুরির এই ঘটনায় তিনি এবং স্থানীয় অনেকেই একবারেই বিস্মিত হননি। আমরা সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে রিপোর্টও করেছি। এখানকার অনেকেই জানেন কীভাবে টেন্ডারে বিক্রির সময় অতিরিক্ত কয়লা খনির ইয়ার্ড থেকে বের হয়ে যায়। এখন আমরা শুধু চুরির একটা সংখ্যা পাচ্ছি।

এই কয়লা খনি থেকে উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সালে। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে পাঁচ-ছয় বছর ধরে কয়লা টেন্ডারে বিক্রি হতো। সারা দেশের ইটের ভাটাগুলো ছিল প্রধান ক্রেতা। জানা গেছে, ইট পোড়ানোর মওসুমে টেন্ডারের বাইরেও মন্ত্রী এম-পিদের কাছ থেকে ডি-ও (আদেশ) নিয়েও ব্যবসায়ীরা কয়লা কিনতে আসতেন। এটা একরকম ওপেন সিক্রেট ছিল যে ব্যবসায়ী এবং খনির কিছু কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট কালোবাজারে কয়লা ছেড়ে দেয় ...এটা এখন কাগজে কলমে দেখা যাচ্ছে।

 পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, খনির নতুন এলাকায় কয়লা উৎপাদন শুরু হবে আগস্ট মাসের শেষ। নাগাদ। তার আগে এই খনি থেকে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা দেওয়া সম্ভব হবে না। সরকার যদি জরুরি ভিত্তিতে ভারত বা অন্য কোথাও থেকে কয়লা না আনতে পারে, তাহলে ততদিন পর্যন্ত কম-বেশি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। খবর বিবিসি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ