ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় বিনামূল্যের ‘প্রি-পেমেন্ট’ মিটারে গুনতে হচ্ছে ভাড়া ॥ গ্রাহক ভোগান্তি চরমে

খুলনা অফিস : খুলনা শহরে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) লাগানো ফ্রি প্রি-পেইড বা স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারে এখন ভাড়া গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। শুরুতে এ মিটার স্থাপনে গ্রাহকদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পুরনো মিটার অপসারণ করে নতুন মিটার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাগিয়ে দেয় ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। তখন মিটার বদল ও স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের কোনও ফি গুনতে হবে না বলা হলেও এখন এই ‘ফ্রি’ মিটারের জন্য প্রতি মাসে ৪০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। থ্রি ফেইজ মিটারে এই ভাড়ার পরিমাণ ২৫০ টাকা। গ্রাহক মানতে নারাজ হলেও এই পরিমাণ টাকা প্রতি মাসে মিটার কার্ড রিচার্জ করার সময়েই কেটে নিচ্ছে ওজোপাডিকো। আর এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বিদ্যুৎ গ্রহীতারা।

নগরীর হাজী মহসিন রোড এলাকার জলিল মিয়া বলেন, ডিজিটাল মিটারটি বিদ্যুৎ বিভাগ খুলে নিয়ে গেছে, আর প্রি পেমেন্ট মিটার লাগিয়ে দিয়েছে। তবে, এখন ভাড়া দিতে হবে কেন বোধগম্য হচ্ছে না। পল্লীমঙ্গল এলাকার শাহ জিয়াউর রহমান বলেন,‘প্রি পেমেন্ট মিটার নিয়ে নানান ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। বাড়তি লোড দেয়া যায় না। পুরনো ডিজিটাল মিটার খুলে প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের সময় কোনও মূল্য নেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এখন প্রতি মাসে রিচার্জের সময় মিটারের ভাড়া কেটে নেয়া হচ্ছে।’ এলাকার সব মানুষের উপার্জন সমান নয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের কাছে এই মিটারের মাসিক ভাড়া এখন বাড়তি বোঝা মনে হচ্ছে।

জানা গেছে, খুলনাতে ২০১৪ সাল থেকে ওজোপাডিকোর তত্ত্বাবধানে এ মিটারিং এর কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ৪২৬.৩৭ কোটি টাকার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। মহানগরীর ৪টি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আওতাধীন ১৪টি ফিডারে প্রকল্পের কাজ চলছে। মহানগরীর টুটপাড়া ফিডারের আওতায় জোড়াকল বাজার, তালতলা হাসপাতাল ও ঘোষের ভিটা, দোলখোলা ফিডারের আওতায় মৌলভীপাড়া, পাইপের মোড় ও বিকে মেইন রোড, হাজী মহসিন ফিডারের আওতায় সাউথ সেন্ট্রাল রোড, ট্যাংক রোড, হাজী মহসিন রোড ও আহসান আহমেদ রোড, বাগমারা ফিডারের আওতায় মিয়াপাড়া ও মিস্ত্রিপাড়া, কৃষি কলেজ ফিডারের আওতায় আড়ংঘাটা, আঞ্জুমান রোড ও দৌলতপুর মহসিন রোড, পাবলা ফিডারের আওতায় মোল্লার মোড় ও সবুজ সংঘ মাঠ, দৌলতপুর বাজার ফিডারের আওতায় দৌলতপুর বাজার রোড ও স্টেশন রোড, এফআইডিসি ফিডারের আওতায় ভিআইপি রোড ও তেলিগাতি, সেন্ট্রাল রোড ফিডারের আওতায় চিত্রালী বাজার ও খালিশপুর হাউজিং, প্রেমকানন ফিডারের আওতায় নেভি চেকপোস্ট, পুরাতন যশোর রোড ও হালদারপাড়া, মহসিন কলেজ ফিডারের আওতায় কোহিনুর মোড় ও খালিশপুর নতুন থানা মোড়, শেরেবাংলা ফিডারের আওতায় ময়লাপোতা, ডালমিল মোড় ও শেখপাড়া এলাকা, পল্লীমঙ্গল ফিডারের আওতায় গোবরচাকা বৌ বাজার, নিরালা ফিডারের আওতায় গল্লামারি মোড়, জিরো পয়েন্ট ও নাজিরঘাট, দরগা ফিডারের আওতায় নিরালা আবাসিক এলাকা, বুড়ো মৌলভীর দরগা, প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা এবং কাশেম নগর-১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর এলাকায় এসব মিটার স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এ সব এলাকায় ৭৩ হাজার প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ঘোষণা পরিবর্তন করে এখন প্রতিমাসে মিটারের ভাড়া আদায় করার বিষয়টি গ্রাহকদের অসন্তুষ্ট করেছে।

গোবরচাকা এলাকার জসিম উদ্দিন বলেন, ব্যাংকে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে রিচার্জ করতে হচ্ছে। ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৮৫২.৩৮ টাকার বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বাকি টাকা থেকে মিটার ভাড়া হিসেবে ৪০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ ৬০ টাকাসহ ৫ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে ৪৭.৬২ টাকা কেটে নেয়া হয়।

নিরালা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল মিটারে অতিরিক্ত বিল এলে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সমাধান পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সমস্যা আরও জটিল। আতঙ্কে থাকতে হয়। আগে প্রতি মাসে ৭শ’ টাকা বিল দিতে হত। এখন প্রি পেমেন্ট পদ্ধতিতে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করে মাসে ১ হাজার ২শ’ টাকা থেকে ১ হাজার ৩শ’’ টাকা বিল দিতে হচ্ছে।

হাজী মহসিন রোড এলাকার ডা. কেপি রায় বলেন, প্রি পেমেন্ট একটি আতঙ্কজনক পদ্ধতি। হঠাৎ টাকা শেষ হয়ে যায়। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এমন পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রায়ই সফ্টওয়্যার সমস্যায় পড়তে হয়। ব্যাংকে বা বুথে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে একটি নম্বর নিয়ে বাড়ি ফিরে মিটারে লোড দিতে হয়।

হাজী মহসিন রোডের এম আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ বাধ্য করেছে প্রি-পেমেন্ট মিটার নিতে। আগের ডিজিটাল মিটার ভালো ছিল। মাসে একবার বিল দিলে সমস্যা সমাধান হত। আর এখন মাসে দু’বার তিনবারও টাকা রিচার্জ করতে হয়।

দৌলতপুর বাজার রোড এলাকার বাসিন্দা শিউলী সুলতানা জানান, এ মিটারের কোনও দাম নেই। তবে, এখন যুক্ত হয়েছে ভাড়া। এ ভাড়া টানতে হবে সারাজীবন। ডিজিটাল বাংলাদেশে সব কাজই দিন দিন সহজ হচ্ছে। সেখানে বিদ্যুৎ বিল দেয়ার বিষয়টি জটিল ও ভোগান্তির সৃষ্টি করছে।

স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. তোফাজ্জেল হোসেইন জানান, ২০২১ সালের মধ্যে পদ্মার এ পাড়ের ২১ জেলা ও ২০টি সদর উপজেলায় শতভাগ প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৩ হাজার মিটার স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি মিটারে মাসিক ৪০ টাকা হারে ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চারটি জোনে ৪৫ হাজার ৫০০ সিঙ্গেল ফেজ প্রি-পেমেন্ট মিটার (প্রতিটির মূল্য ৪ হাজার ৮শ’ টাকা) ও ১ হাজার ৫০০ থ্রি-ফেজ মিটার (প্রতিটির মূল্য ২০ হাজার টাকা) স্থাপন করা হয়েছে।

ওজোপাডিকো খুলনা’র প্রকল্প পরিচালক আবু হোসেন বলেন, গ্রাহকদের প্রি-পেমেন্ট মিটার আমরা ফ্রি দিয়েছি। তবে এখন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে বিদ্যুতের মাসিক বিলের সঙ্গে মিটারের টাকা আদায় করার জন্য। তাই প্রতি মাসে গ্রাহককে মাসিক বিলের সঙ্গে ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ প্রি-পেমেন্ট মিটারের মেয়াদ ১০ বছর। আর ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে নতুন মিটার স্থাপন করে দেয়া হবে। কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি এডভোকেট এনায়েত আলী বলেন, প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের সময় প্রতি মাসে ভাড়া নেয়ার কথা আগে বলা হয়নি। এটা গ্রাহকদের জন্য বাড়তি বোঝা। প্রতি মাসের রিচার্জকৃত টাকা থেকে মিটারের ভাড়া কেটে নেয়া অযৌক্তিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ