ঢাকা, শুক্রবার 27 July 2018,১২ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাহমুদুর রহমান প্রশ্নে সিপিজে’র বিবৃতি

অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর গত ২২ জুলাই কুষ্টিয়ায় যে ভয়ংকর হামলা চালানো হয়েছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসÑসিপিজে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নিন্দা ও উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি একই বিবৃতিতে সিপিজে হামলায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে সিপিজে বলেছে, শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনাকারী সাংবাদিকরা তাদের কাজ নিয়ে কিভাবে এবং কোন পরিবেশে লড়াই করছেন মাহমুদুর রহমানের ওপর চালানো হামলার মধ্য দিয়ে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে।

মাহমুদুর রহমান যে তার বিরুদ্ধে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতির দায়ের করা একটি মানহানির মামলায় হাজিরা দেয়ার ও জামিন নেয়ার উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ায় গিয়েছিলেন এবং জ্যেষ্ঠ বিচারিক আদালতের বিচারক যে তাকে জামিন মঞ্জুর করেছিলেন এসব তথ্যেরও উল্লেখ রয়েছে সিপিজের বিবৃতিতে। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিচারকের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেছে। তারা আদালতের সকল গেট বন্ধ করে দিয়েছিল যাতে মাহমুদুর রহমান এবং তার সঙ্গিরা বেরিয়ে যেতে না পারেন। এমন অবস্থায় মাহমুদুর রহমান আদালতের এজলাসেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। সবশেষে পুলিশের দেয়া নিরাপত্তার আশ্বাসে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে ওঠার পরই ছাত্রলীগের শ’খানেক নেতা-কর্মী মাহমুদুর রহমানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সময় তিনি পুলিশের সহায়তা চেয়েছেন কিন্তু পুলিশ সাড়া দিয়েছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। হামলার পর শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকলেও তাকে কোনো প্রাথমিক চিকিৎসা পর্যন্ত দেয়া হয়নি। 

ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কুষ্টিয়ার পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি জানিয়ে সিপিজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনের কারণে বর্তমান সরকারের আমলে মাহমুদুর রহমানকে অনেক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে লড়তে হচ্ছে। তিন বছরের বেশি সময় তাকে কারাগারেও বন্দী থাকতে হয়েছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে রাষ্ট্রদোহের মামলা, ফৌজদারি মানহানি, জোরপূর্বক গুম এবং সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার দেখানো ভয়-ভীতিসহ বহুমাত্রিক হুমকির মোকাবেলা করছেন মাহমুদুর রহমান তার প্রামাণ্য উদাহরণ। গণমাধ্যমের ওপর যথেচ্ছভাবে উচ্চ মাত্রায় সেন্সরশিপও আরোপ করা হচ্ছে। সরকার কিভাবে বিরোধীদলীয় সংবাদমাধ্যমকে টার্গেট করেছে এবং এখনো করে চলেছেÑ এসব বিষয়েও সিপিজে লক্ষ্য রাখছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। 

মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে দেয়া এই বিবৃতির মাধ্যমে সিপিজে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন উপলক্ষে সংস্থাটির জানানো দাবি ও আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেছে। বলা দরকার, সিপিজেরও আগে বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টসÑ বিএফইউজে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং হামলাকারী গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করার ও শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে। একই দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে দেশের বিভিন্নস্থানে। দেশের বাইরে লন্ডন ও নিউইয়র্কসহ অনেক শহরেও হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বাংলাদেশিরা। বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিকরা। গভীর ক্ষোভের সঙ্গে তারা বলেছেন, আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো এই হামলা জাতি হিসেবে আমাদের সামগ্রিক অধঃপতনের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। 

এ ধরনের প্রতিক্রিয়াই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, ৬৫ বছর বয়সী মাহমুদুর রহমান একজন সম্মানিত নাগরিক এবং একটি দৈনিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে শুধু মানহানির মামলাই দায়ের করা হয়েছে, তিনি সত্যি অপরাধী কিনা সেটা প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণিত হলেও শাস্তি দেয়ার এখতিয়ার কেবলই আদালতের তথা মাননীয় বিচারকদের। তাছাড়া সংবিধান অনুযায়ী আদালত এমন একটি এলাকা, যেখানে বড় অপরাধীদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ঘটনায় ছাত্রলীগ আদালতের অবমাননা করেছে যথেচ্ছভাবে। মাহমুদুর রহমান নিজে এসপি ও ওসির সঙ্গে কথা বলে সাহায্য চাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জানা গেছে, বিএনপি মহাসচিবের অনুরোধে ঢাকা থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নাকি এসপিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও মাহমুদুর রহমানকে আক্রান্ত ও রক্তাক্ত হতে হয়েছে।

আমরা মনে করি, কোনো ব্যক্তি নন, কুষ্টিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে আসলে সংবাদপত্রসহ দেশের গণমাধ্যম। চরমভাবে ক্ষুণœ করা হয়েছে মতপ্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতাকে। দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড়ও উঠেছে একই কারণে। সিপিজের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনও সোচ্চার না হয়ে পারেনি। সিপিজে একথাও বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনাকারী সাংবাদিকরা কতটা প্রতিকূল পরিবেশে কাজ নয়, আসলে লড়াই করতে বাধ্য হচ্ছেনÑ মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো বেশি নিন্দিত হওয়ার আগেই উচিত হামলাকারী গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। সরকারকে একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ