ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

১১ মাসে এলসির পরিমাণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা

# চালে এলসি বেড়েছে ২১.১০ শতাংশ
# জ্বালানি তেলে বেড়েছে ৪৯ শতাংশ
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ। গত অর্থবছরের ১১ মাসে এলসি খোলার পরিমাণ চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দেশের বাজেটের পরিমাণকেও অতিক্রম করেছে। এলসি খোলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি রফতানির আড়ালে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। অসৎ ব্যবসায়ীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে অর্থ পাচার করছেন। এলসি খোলার পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অর্থপাচারের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৫৪০ কোটি ৪৬ লাখ (৬৪.৪০ বিলিয়ন) ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হারে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা; যা চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বেশি।
২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস হতে চললো, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সব শেষ প্রকাশ করেছে মে মাসের হালনাগাদ তথ্য। এ সময়ে এলসি খোলার এই পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে পণ্য আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে এমন উল্লম্ফন আগে কখনো দেখা যায়নি। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৪ হাজার ৪১১ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল; প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশের মত।
চলতি বছরের ১১ মাসের তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চাল আমদানির জন্য। ২০১৭ সালে বন্যায় ফসলহানির কারণে চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে আনা হয়েছিল। আর এই সময়ে চাল আমদানির এলসি বেড়েছে ২১.১০ শতাংশ। এছাড়া গমের এলসি ৩৫ শতাংশ, পেঁয়াজে ৯০ শতাংশ, জ্বালানি তেলে ৪৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমাদানির এলসির পরিমাণ ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের আমদানি বাড়ায় এলসি খোলার পরিমাণ বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ যে ‘অস্বাভাবিক’ হারে বেড়েছে তাতে ভোটের বছরে বিদেশে অর্থ পাচারের সন্দেহও জোরালো হয়ে উঠেছে।
তারা বলেন, বিরাট একটা অংশ বিদেশে পাচার হচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো কারণে অনিশ্চয়তা বাড়লে অর্থ পাচারের প্রবণতাও বাড়ে। রাজনৈতিক দলের নেতারা যেমন পাচার করেন, তেমনি ব্যবসায়ী বা আমলারাও অর্থ বাইরে নিয়ে যান। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ কারণে এটা আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সজাগ দৃষ্টি দরকার। আর এক শ্রেণির লোক পারিবারিকভাবেই বিদেশে অবস্থানের জন্য অর্থ পাচার করে। এ কারণ আমরা বিদেশে ‘ বেগম পাড়া’ গড়ে ওঠার খবর পাই। আবার পণ্য রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হয়। যে পণ্যের দাম ১০০ ডলার, ক্রেতার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তা ৭০ ডলার দেখিয়ে রফতানি করেন ব্যবসায়ী। বাকি ৩০ ডলার তিনি বেদেশে সেই ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ে তা বিদেশেই রেখে দেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পের জন্য সরঞ্জাম আমদানি সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির উল্লম্ফনে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানিও ‘অস্বাভাবিক হারে’ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমদানি বাড়াকে অর্থনীতিতে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়া মানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু অনেক সময়ই আমরা শুনি যে, এক পণ্য আমদানির নামে অন্য পণ্য আমদানি হচ্ছে। অনেক সময় শূন্য কন্টেইনারও আসছে। আবার ওভার ইনভয়েসের (আমদানি করা পণ্যের বেশি মূল্য দেখিয়ে) মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন অনেকে। সে কারণে আমদানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে খানিকটা উদ্বেগেরও কারণ। আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারের একটি পথ হচ্ছে ওভার ইনভয়েস দেখানো। অর্থাৎ যে দামে পণ্য কেনা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে বাড়তি অর্থ বিদেশে পাচার হয়। আবার যে পণ্য আমদানি হওয়ার কথা, তার বদলে কম দামি পণ্য বা অন্য পণ্য আনা হয় কখনও কখনও।
বাংলাদেশ ব্যাংকে গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মত বিদেশী মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশকে দুই মাস পরপর পরিশোধ করতে হয় আকুর বিল।
আহসান মনসুর বলেন, আমদানি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও রেমিটেন্স ও রফতানি আয় বাড়ছে ধীর গতিতে। রফতানি আয় ও রেমিটেন্স যদি একই হারে বাড়ত তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু তা না হওয়ায় কিছুটা সঙ্কার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।
এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে। তবে অর্থপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইউ) তৎপর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ট্রেড সার্ভিসের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকটি দেশে ট্রেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে আলাদা রেগুলেশন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরাও নতুন গাইডলাইন করতে যাচ্ছি। এলসি খোলার ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের সব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চারটি কৌশলে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হচ্ছে। কৌশলগুলো হচ্ছে, আমদানি-রফতানিতে পণ্য ও সেবার ওপর ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং করা। শিপমেন্টের ওপর আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং করা। আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং করা এবং রফতানি পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা দেওয়া।
যে সব পণ্য আমদানিতে কম শুল্ক দিতে হয়, বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রপাতি, সেগুলোর আমদানি মূল্য বেশি দেখিয়ে অর্থপাচার করা হয়। আবার সরকারি প্রণোদনা পেতে রফতানি পণ্যে বেশি মূল্য দেখানো হয়। একইসঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্যের প্রমাণ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনার মঈনুল খান বলেন, অর্থপাচারের ৮০ শতাংশই ট্রেডের মাধ্যমে হচ্ছে। বর্তমানে এটা প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অর্থপাচার বন্ধে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আরও যাচাই-বাছাই করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থপাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলোকে অর্থপাচারের কৌশল তদারক করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, এটি খুবই আশঙ্কার বিষয় যে, ৮০ শতাংশ অর্থপাচারই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। শুধু অর্থপাচারের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মহাসমস্যায় আছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
এইচএসবিসি ব্যাংকের কান্ট্রি হেড অব গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভ্যাবলস ফিন্যান্স মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, অর্থপাচার রোধে প্রথমে ব্যাংককেই ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করলেই অর্থপাচার কমে আসবে।
পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, এলসি গ্যারান্টি ও ফি কমানোর জন্য বাংলাদেশকে ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হওয়া দরকার। কারণ আমাদের বেশিরভাগ রফতানি হয় ইউরোপ ও আমেরিকাতে। ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হলে এসব ফি কমবে এবং এলসির গ্যারান্টি নিশ্চিত হবে। কারণ, বিশ্বের ৮৯টি দেশ ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ