ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পানিবদ্ধতা নিরসনে প্রতিশ্রুতির বাস্তব কোনো প্রতিফলন নেই

স্টাফ রিপোর্টার : পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার আয়োজিত ‘পানিবদ্ধতা নিরসনে কর্তৃপক্ষের দায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, আন্তরিকতা ও কার্যকর উদ্যোগ না থাকার কারণেই রাজধানীতে পানিবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করেছে। তারা বলেন, পানিবদ্ধতা নিরসনে এখনই সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা উচিৎ। এর মধ্যে খালগুলো পুনরুদ্ধার এবং দুই পাড় বাঁধাই করা, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা, সংস্থাসমূহ একে অপরকে দোষারোপ না করে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করা, খাল ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা, প্রতিটি সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সিস্টেমকে একক কর্তৃত্বে নিয়ে আসা, খালে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা রাজউক কর্তৃক অপসারণ করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার উপর বক্তারা জোর দেন।
পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পবা’র সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুস সোবহান। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পবা’র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, নাসফের সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী, পবা’র সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার, বিআইডাব্লিউটিএ-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, সাউথ-ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জেষ্ঠ্য প্রভাষক স্থপতি জোবাইদা গুলশান আরা, বিসিএইচআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক মাহবুল হক, পরিচালক মো. মমতাজুর রহমান মোহন, সবুজ ছাতা হেলথ্ কেয়ার লি.-এর এমডি মো. শরিফুজ্জামান খান, পবা’র সহ-সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী মো. মাসুম, গ্রীণ ফোর্স-এর প্রতিনিধি মো. মাহাদী প্রমুখ।
বর্তমানে নগর-মহানগরের অন্যতম প্রধান সমস্যা পানিবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে পানিবদ্ধতা। নগর-মহানগরের নিচু জায়গা, পুকুর, খাল, জলাধার, নদী ইত্যাদি ভরাট করে গড়ে উঠছে রাস্তা ঘাট, শিল্প কারখানা এবং সুরম্য অট্টালিকা। ফলে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ। যে ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে তা অপর্যাপ্ত ও নিম্নামানের যা গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার ইত্যাদি যথাযথভাবে না করার ফলে পানিবদ্ধতা আজ জনদূর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় স্বীকার না করে সমন্বয়হীনতার কথা বলে একে অপরকে দোষারোপ করছে। সমন্বয়হীনতার কথা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। এখন হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, আন্তরিকতা ও কার্যকর উদ্যোগ না থাকার কারনেই জলাবদ্ধতা আজ চরম আকার ধারণ করেছে।
বক্তারা বলেন, ঢাকা মহানগরীতে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাভূমি, নিম্নাঞ্চল, খাল ও নদী ভরাট ও দখল, খাল ও নালা-নর্দমা আবর্জনায় ভরাট এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করা, সংস্থাগুলোর দায়িত্বে অবহেলা, সমন্বয়হীনতা, জনসচেতনতার অভাব রাজধানীর পানিবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এবছর গ্রীষ্মকালেই ঢাকায় পানিবদ্ধতা দেখা দেয়। আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল হলেও এবছর শ্রাবণের শুরুর দিকে বৃষ্টি হয়নি। টানা খরার পর শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহের শেষে বর্ষার আসল রূপ দিতে শুরু করেছে প্রকৃতি। তবে রাজধানীবাসীর জন্য বর্ষার এমন রূপ চরম দুর্ভোগ বয়ে আনছে। কেননা কর্মচঞ্চল নগরজীবনে বৃষ্টি, পানিবদ্ধতা, যানজট অনেকাংশেই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর পানি। রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। জলমগ্ন রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় গর্ত থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
বক্তারা আরো বলেন, বৃষ্টির কারণে পানিজট-যানজটে ঢাকা মহানগরী অচল হয়ে পড়ে। গত বছর ঠিক এই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, এ বছর পানিবদ্ধতা হবে না। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশনসহ  সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে পানিবদ্ধতা। মেট্রো রেলসহ ওয়াসা, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বেশির ভাগ সড়ক এমনিতেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যেটুকু সড়ক যানবাহন চলাচলের জন্য রয়েছে, তাও খোঁড়াখুঁড়িতে তৈরি হওয়া খানাখন্দে ভরা। পানিবদ্ধ সড়কে খানাখন্দের মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে আটকে পড়ছে বাস, কার, অটোরিক্সা ও রিক্সা। এতে রাজধানীর বেশির ভাগ সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
গতবছরের ২৬ জুলাই পল্লী উন্নয়ন, সমবায় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি প্রমিজ করছি, সামনের বছর থেকে এসব (পানিবদ্ধতা) দেখবেন না। কিছু দিনের মধ্যেই নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বর্তমান পানিবদ্ধতা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিটা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি, কোন জায়গায় আটকা পড়ছি। সে জায়গায় দ্রুত ব্যবস্থা নেব। ভারী বৃষ্টি হলেও যেন তিনঘন্টার মধ্যে পানি নিষ্কাশন হয়, সে ব্যাপারে ওয়াসাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ ঢাকার দুই মেয়র, ওয়াসার এমডি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা একবছর সময় চেয়ে নগরবাসীকে পানিবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মন্ত্রীকে এবং তার মাধ্যমে নগরবাসীকে।
মন্ত্রীর নির্দেশ, মেয়র ও এমডির দেয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তব কোনও প্রতিফলন নগরবাসী দেখছে না। এবছরও সামান্য বৃষ্টিতেই পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত হাঁটুপানি থেকে কোমরপানি জমছে। মেয়রকে হাঁটুপানিতে নেমে প্রতিশ্রুতি দিতেও দেখা গেছে। এতে আশ্বস্তও হয়েছিল নগরবাসী। কিন্তু এবছর এপ্রিলের শেষের দিকের বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক কর্মপরিকল্পনা ছাড়া পানিবদ্ধতা নিরসনের ঘোষণা অর্থহীন। বর্তমান আইনি কাঠামোয় খাল ও স্টর্ম ড্রেন দেখভাল করার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার আর রাস্তার দুই পাশের সারফেস ড্রেন দেখভালের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং জনগণ তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেই পানিবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব।
প্রবন্ধে বলা হয়, উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১২৩০ কি.মি., দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১০০০ কি.মি.,এবং ওয়াসার বক্স কালর্ভাটসহ ৩৭০ কি. মি. ড্রেনেজ লাইন নিয়মিত পরিষ্কারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় রাজধানীর রাস্তাগুলো। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন পথগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকে। শত শত কোটি টাকা খরচ করে এসব আবর্জনা পরিষ্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন করলেও পানিবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর। বর্তমান সময়েও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। এরপরও স্বস্তিতে নেই নগরবাসী। কারণ রাজধানীর অবশিষ্ট খালগুলো নিয়মিত দখল হচ্ছে, ড্রেন ও জলাশয় আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই  তাই পানিবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
প্রতি বছর পানিবদ্ধতায় সেবা সংস্থাগুলো নিজেদের ব্যর্থতার দায় একে-অপরের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্প্রতি বলেন যে, রাজধানীতে মাত্র দুই শতাংশ জলাভূমি রয়েছে, যেখানে থাকার কথা ১২ শতাংশ, নি¤œাঞ্চল ভূমিদস্যুদের দখলে, ৬৫টি খাল ও চারটি নদী ছিল, এখন সেগুলো নেই। এসব কারণে ঢাকার পানিবদ্ধতা নিরসন কিছুটা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তার পরিসংখ্যান নিয়ে মতভেদ থাকলেও জলাভূমি, নি¤œাঞ্চল, খাল ও নদী ভরাট ও দখলের বিষয়টি কম-বেশি প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা যে ২৬টি খাল দেখভাল করার কথা সেগুলো দখলমুক্ত ও পরিষ্কার করে প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ওয়াসার গৃহীত উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলেন নি। খালগুলো দখলমুক্ত ও পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে ওয়াসার উল্লেখযোগ্য কোন উদ্যোগ নগরবাসীর চোখে পড়ছে না। পাশাপাশি বক্স-কালভার্ট ও ড্রেনের ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে না। পানিবদ্ধতা লাঘবে ২৬টি খালের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ওয়াসা এবং ড্রেন  পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নিবে এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা।
১৯৮৯ সালে ওয়াসাকে পানি নিষ্কাশনে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি একাজে যুক্ত হয় সিটি কর্পোরেশনসহ আরও কয়েকটি সংস্থা। ওয়াসা পানি সরবরাহের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পানি নিষ্কাশনে নজর দেওয়ার সময় নেই। আর এর ফলে ভুগছে নগরবাসী। গত বুধবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে মেয়র বলেন পানিজট-যানজট নিরসন তার দায়িত্ব নয়। পানিজটের সমাধান করবে ঢাকা ওয়াসা। যানজটের সমাধান করবে অন্য সংস্থা।
বৃষ্টি পানি ড্রেনের মাধ্যমে স্ট্রম স্যুয়ারেজে যাবে, সেখান থেকে খালে, খাল থেকে নদীতে পড়বে। দীর্ঘ এই পথের প্রতিটি অংশ নির্বিঘœ হতে হবে। কোথাও এটি বাধাপ্রাপ্ত হলেই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। পানিবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো পুনরুদ্ধার করে। সেগুলো নিয়মিত তদারকি, পরিচর্যা ও পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে পানিবদ্ধতা আরো ভয়াবহ রূপ নিবে।
নগরবাসীকে পানিজট-যানজট থেকে মুক্তি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। বাস্তবে ভোগান্তি কমছে না, বরং প্রতি বছর বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় স্বীকার না করে একে অপরকে দোষারোপ করছে। প্রত্যেকটি সংস্থা ও জনগণ নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাব পালন করলে পানিবদ্ধতা, যানজটসহ বিভিন্ন সমস্যা বহুলাংশে কমে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ