ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা ইমরান খানের

সংগ্রাম ডেস্ক : পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা ইমরান খান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোয় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আধঘণ্টার এক ভাষণে ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ৬৫ বছর বয়সী ইমরান দিল্লী ও ইসলামাবাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে এবং কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ মেটাতে ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
“আমি সত্যিই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করতে চাই, আপনারা যদি এক পা এগিয়ে আসেন, আমরা এগোব দুই পা,” বলেছেন তিনি।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই ইসলামাবাদ থেকে দেওয়া ‘প্রেসিডেন্ট স্টাইলের’ ওই ভাষণে পিটিআই প্রধান ভাবী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এ মন্তব্য করেছেন বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
ভারতীয় গণমাধ্যমে তাকে ‘বলিউডের ভিলেইন, আমি ক্ষমতায় এলেই সব খারাপ হবে’ হিসেবে হাজির করেছে মন্তব্য করে, এতে ‘সামান্য হতাশ’ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন ইমরান।
“ক্রিকেটের কারণে আমি অনেকবারই ভারত সফর করেছি, আমি তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাই।”
ভাষণে কাশ্মীর প্রসঙ্গটি নিয়েও বেশ খানিকক্ষণ কথা বলেছেন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক এ অধিনায়ক।
“আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধ কাশ্মীরকে ঘিরে। এ নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন, আমরা এখনো স্কয়ার ওয়ানেই আটকে আছি। ভারত দেখছে বেলুচিস্তান, আমরা দেখছি কাশ্মীর। এ ধরনের দোষারোপের খেলা বন্ধ হওয়া উচিত।”
“কাশ্মীরের পরিস্থিতি, মানবাধিকার লংঘন, সেখানে সেনা মোতায়েন, কাশ্মীরের জনগণ ভুগছে। নেতৃত্বকে এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় বের করতে হবে,” বলেন ইমরান।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের ফলে ভারত খানিকটা উদ্বিগ্ন বলেও জানিয়েছে এনডিটিভি। তেহরিক-ই-ইনসাফের মতো কট্টরপন্থি একটি দলের বিজয় জম্মু ও কাশ্মীরসহ গোটা ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেই প্রভাব ফেলতে পারে বলেও শঙ্কা দিল্লির।
ইমরান খানের সাফল্যের পেছনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল তাতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে, বলছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা।
ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সাবেক বিশেষ সচিব রানা ব্যানার্জি বলছেন, ইমরানের জয়ের পেছনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
“যদিও ইমরান বেশ ভালভাবেই জিতেছেন, এই জয়টা যে আর্মির সঙ্গে তার চুক্তি মোতাবেকই হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে আমি নিশ্চিত অন্তত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রথম দিকে তিনি আর্মির শেখানো বুলিই বলবেন। হি উইল পার্ট দ্য আর্মি’জ পজিশান। কাজেই পাকিস্তানের ভারত-নীতিতে চট করে কোনও পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করছি না,” বিবিসিকে এমনটাই বলেছেন রানা। কাছাকাছি মন্তব্য করেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সালমান হায়দারও।
“এই যে ইমরান খানকে আর্মির ‘চোজেন ওয়ান’ বলা হচ্ছেÑ তাতে তার কাজকর্মে কতটা স্বাধীনতা থাকবে সেটাই দেখার বিষয়। আমি এত তাড়াতাড়ি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাই না, তবে তারপরেও এটা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই,” বলেছেন তিনি।
রাজনীতিতে নামার পর নানা সময়ে ইমরান যেসব ভারতবিরোধী বিবৃতি দিয়েছেন, কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলাকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন তাতে তাকে নিয়ে ভারতে একটা সন্দেহের বাতাবরণ আছে বলেও মন্তব্য সালমানের।
ইমরান খানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ‘সেই ছবিটা খানিকটা পাল্টে দিতে’ পারে বলেও আশা সাবেক এ কূটনীতিকের। আশাবাদী পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও দিল্লীতে দেশটির রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা রিয়াজ খোকারও।
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “একজন সম্পূর্ণ আনকোরা নতুন নেতা, নতুন ব্যক্তি আর নতুন দল ক্ষমতায় এলÑ যেটা আমার মতে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই সম্পর্কটা শুধরে নেয়ার দারুণ একটা সুযোগ। তার জয়টা প্রশংসনীয় ছিল, ভারতও নিশ্চয় সেটা খেয়াল করবে।”
রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার পর ‘২২ বছরের লড়াই সংগ্রামের’ ধারাবাহিকতায় সাধারণ নির্বাচনে একক বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ইমরান তার ভাষণে পাকিস্তানের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও কথা বলেছেন। জোর দিয়েছেন ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ওপরও।
“যে কোনো সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার প্রথমেই ভারতে সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়টি থাকা উচিত,” বলেছেন তিনি।
ফল গণনায় দেরির মধ্যেই নির্বাচনে পিটিআই নিজেদের জয়ী বলে দাবি করলেও নওয়াজের মুসলিম লীগ ও অন্যরা ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন।
শুক্রবার সকালে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৯৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ আসনের ফল প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন।
 ঘোষিত ফলে ২৭২টি আসনের মধ্যে ইমরানের দল ১১৫টিতে জয়ী হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ পেয়েছে ৬৩টি। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছে ৪৩টি আসন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে যেকোনো দলকে ন্যূনতম ১৩৭টি আসনে বিজয়ী হতে হবে। পিটিআই শেষ পর্যন্ত তা অর্জনে ব্যর্থ হলেও আঞ্চলিক ও ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করতে পারবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আরেক খবরে বলা হয়, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সর্বশেষ পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১১৫টি আসনে জয় পেয়েছে ইমরান খানের দল পিটিআই। পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) পেয়েছে ৬৩টি আসন। আর ৪৩টি আসনে জয় নিশ্চিত করে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান পিপল’স পার্টি (পিপিপি)। এখনও ১৩টি আসনে ফল ঘোষণা বাকি আছে।
এদিকে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনলেও পার্লামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে পিএমএল-এন। পার্লামেন্টে ‘শক্ত বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত’ থাকার কথা জানিয়েছে তারা। গত বৃহস্পতিবার (২৬ জুলাই) দলটির নির্বাহী কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।
পাকিস্তানের ৩৪২ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৭২টি আসনে। বাকিগুলো সংরক্ষিত আসন। এরমধ্যে ৬০টি নারীদের জন্য ও বাকি ১০টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত। বুধবার ২৭২টি আসনে নির্বাচনের কথা থাকলেও দুইটি আসনে ভোট স্থগিত করা হয়।
এদিকে শুরুতে ফল প্রত্যাখ্যান করলেও বৃহস্পতিবার (২৬ জুলাই) পিএমএল-এন’র নির্বাহী কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে। দলের নেতা শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে বৈঠকটি হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পিএমএল-এন ‘শক্ত বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।’ শাহবাজ শরিফ জানান, তারা বিজয়ী প্রার্থীদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠাবেন। আর পরাজিত প্রার্থীদের কাছে পাঠানো হবে উৎসাহমূলক চিঠি। পিএমএল-এন সভাপতি শাহবাজ আরও জানান, ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন তারা। দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে কারচুপির প্রমাণ সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
পাকিস্তানের শীর্ষ ধারার রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ (পিএমএল-এন), ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি) এবং ‘মুত্তাহিদা পাকিস্তান মুভমেন্ট-পাকিস্তান’ (এমকিউএম-পি) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে প্রাথমিক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। দলগুলো একসঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনেছে। তাদের পক্ষ থেকে মূলত পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে থাকতে না দেওয়া ও তাদের হাতে ভোট গণনার পর পাওয়া ফল না দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ