ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আশঙ্কাজনক হারে কমছে জনশক্তি রফতানি

ইবরাহীম খলিল : নানা কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে জনশক্তি রফতানি। বিশেষ করে যে সব দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি বেশি হারে যান সেইসব দেশে ক্রমশই জনশক্তি রফতানি কমছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতারসহ বেশক’টি দেশ। কোনো কোনো দেশে এই সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যদিও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেছেন, চলতি বছর ১২ লাখ কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রফতানি সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ায় এবং বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী ফেরতের কারণেই মূলতঃ বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কম মনে হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদফতর বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বহির্গমন অনুমতি দিচ্ছে। এ কারণেও বিদেশগামী কর্মীর হার কিছুটা কমছে। তবে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের আলোচিত সিন্ডিকেট ভেঙে সব রিক্রুটিং এজেন্সি কাজ করতে পারলে শ্রমিক যাওয়ার গতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নীত হবে বলে জানান তাঁরা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশ থেকে মোট শ্রমিক গেছেন তিন লাখ ৯২ হাজার ২৫০ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে গেছেন ৮১ হাজার ৮৪৬ জন। তবে জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৯৭৫ জনে। একইভাবে ১২ হাজারেরও বেশি নারী শ্রমিক সৌদি আরব, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গেলেও সেটি এখন এসে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজারে।
পরিসংখ্যানে আরো দেখা যায়, সৌদি আরবে গত বছর সাড়ে পাঁচ লাখ শ্রমিক গিয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত গেছেন মাত্র এক লাখ ৪৪ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে জুনে গেছেন মাত্র ১৩ হাজার ৬৬৮ জন। একইভাবে মালয়েশিয়ায় এই পর্যন্ত জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে মোট ৯১ হাজার শ্রমিকের মধ্যে মে-তে সর্বোচ্চ ২২ হাজার ৮৮০ জন শ্রমিক গেলেও জুনে তা কমে প্রায় ১১ হাজারে এসে ঠেকেছে। একইভাবে ওমান. কাতার, কুয়েত, মরিশাস, ইরাক, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী যাওয়ার পরিমাণও কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ কিছু নির্দিষ্ট দেশে শ্রমিক পাঠাচ্ছে। যে কারণে এই দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা বেশি হওয়ায় এবং কিছু দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়ায় তারা বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের নীতিমালা পরিবর্তন করেছে। যে কারণে এসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়ার পরিমাণ কমছে। গত কিছুদিনে শুধু সৌদি আরব থেকেই প্রায় ১২শ’ নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরে এসেছেন।
ফলে এখন আগের মতো ঢালাওভাবে গৃহকর্মীরা সৌদি আরবে যাচ্ছেন না বা যেতে পারছেন না। কর্মী প্রেরণে অন্য দেশের ক্ষেত্রেও ব্যাপক যাচাই-বাছাই করছে সরকার। এ কারণেও শ্রমিক পাঠানোর গতি কিছুটা কমেছে বলে জানান তাঁরা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হাতেগোনা কয়েকটি শ্রমবাজারের বাইরে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় শ্রম রফতানিতে ধস নামতে পারে।
মালয়েশিয়ায় অভিযান আতংক : মালয়েশিয়ায় অবৈধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে চলমান 'মেগা-থ্রি' অভিযানে সে দেশে শত শত অভিবাসীকে আটক করেছে সে দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশ। যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশী নাগরিক। এই ধরপাকড় অভিযান নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
ওই অভিযানের শেষে ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুকশ্রি সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ৩১ আগষ্টের মধ্যে এখান থেকে সব অবৈধ শ্রমিককে থ্রি-প্লাস ওয়ান পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজ নিজ দেশে ফেরত যেতে হবে। যারা ওই তারিখের মধ্যে দেশে ফিরবেন না, তাদের বিরুদ্ধে 'কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা' নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার সরকার রিহায়ারিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই অবৈধ শ্রমিকদের বৈধ হওয়ার একটা সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু যে তিনটে ভেন্ডর কোম্পানিকে এর দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদের নাম ভাঙিয়ে বেশ কিছু নকল এজেন্ট বা দালাল বাংলাদেশীদের সঙ্গে বিরাট প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ২০১৮ সালের প্রথম তিনমাসে সৌদি আরবের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি কাজ হারিয়েছেন। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসময়ে কাজ হারানো বিদেশির সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার। একই সময়ে বেড়েছে সৌদি নাগরিকদের বেকারত্বের হার। সৌদি পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির জরিপভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিতে বাইরের জনশক্তি নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ