ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশের অর্থনীতিতে কালো ছায়া

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, সম্প্রতি ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর জন্য অশনি সংকেত। সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন পরিশোধবিষয়ক কনফারেন্সে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। ফজলে কবির বলেন, সমস্যা কাটিয়ে সুশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সঠিক স্থানে সঠিক লোককে নিয়োগ দিতে হবে। ওভার ইনভয়েসিংয়ের নামে বিদেশে অর্থ পাচার আগের থেকে অনেকটাই কমে আসছে। তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো রেমিট্যান্স। কিন্তু, গত অর্থবছর জুড়েই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল নিম্নমুখী ধারায়। গভর্নর বলেন, বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান উৎস হতে পারে এবং দারিদ্র্য বৈষম্য ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা হ্রাসে ব্যাপক অবদান রাখতে পারে। এ কারণে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ও আপনাদের সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বদা ব্যবসাবান্ধব সরকারি ও আর্থিক নীতি প্রণয়নে বন্ধ পরিকর। তিনি বলেন, সম্পদের সুষম ব্যবহার ও অর্থের অপচয় রোধের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্যেই বুঝা যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির কি অবস্থা। এই সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশী লুটপাট হয়েছে আর্থিক সেক্টরে। দেশের ব্যাংক বীমাগুলো একেবারেই ফোকলা হয়ে গেছে। শেয়ার বাজারের অবস্থা শোচনীয়। ৩৫ লক্ষ বিনিয়োগকারী পথে বসেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকার কারণে আর্থিক সেক্টরে লুটপাট চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘ডিজিটাল’ উন্নয়নের গালগল্প শোনানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতি তার উল্টো। প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতি। মাস পাঁচেক আগে একটি দৈনিক লিখেছে, আগাম ও মওসুমি বন্যা, ঘাটতি মেটানোর জন্য ৫৭ লাখ টন চাল আমদানি এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রবেশসহ বিভিন্ন কারণে জাতীয় অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। প্রাসঙ্গিক পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টটিতে। যেমন বন্যায় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে ২১০০ কোটি টাকার, বোরোর ক্ষতির পরিমাণ ৫৩০০ কোটি টাকা, চাল আমদানিতে লেগেছে ৫১১৮ কোটি টাকা এবং রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে ব্যয় হয়েছে ২০০০ কোটি টাকা। আরো কিছু আশংকাজনক তথ্য-পরিসংখ্যানও রয়েছে ওই রিপোর্টে। সব মিলিয়েই জাতীয় অর্থনীতির চাপের কথা বলা হয়েছে। এটা এখন সবার কাছে সত্য যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বলা চলে, সুচিন্তিতভাবে ব্যাংকিং খাতকে চূড়ান্ত সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এখনো ঠেলে দেয়ার কর্মকা- অব্যাহতই রয়েছে। একই কারণে দেশের অর্থনীতি বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ভুল ও ক্ষতিকর নীতি এবং দলীয় বিবেচনার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত মারাত্মক বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে নীতিতে সংশোধন করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা না নেয়া হলে ব্যাংকিং খাতই শুধু ধ্বংস হয়ে যাবে না, জাতীয় অর্থনীতিও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইসলামী ধারার প্রধান দুটি ব্যাংককে বিপন্ন করার পাশাপাশি সরকারের অন্য কিছু অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের পরিণতিতেও দেশের ব্যাংকিং খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রাধান্যে এসেছে নতুন কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সরকার নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে রাজনৈতিক বিবেচনা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের পরিসর অত্যন্ত সীমিত হওয়ার কারণে এসব ব্যাংক মোটেও সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি। কোনো কোনো ব্যাংক বরং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই লোকসান গোনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সততা ও সদিচ্ছার অভাবই পরিস্থিতিকে এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কারণ, অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীনরা শুধু ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসবেই মেতে থাকেননি, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঢালাওভাবে গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রাখার মতো কিছু পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। এর ফলেই স্থবির হয়ে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতি।
এদিকে গণতন্ত্রহীনতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও বিনিয়োগ খরা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সরকার ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও উল্টো বেকারত্ব বেড়েছে। গ্যাস বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের রফতানি খাত। দেশে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে যাচ্ছে। গতিহীন অর্থনীতি এ বছর পড়বে নির্বাচনী চাপে। অর্থনীতিবিদরা জানান, বাংলাদেশে নির্বাচনের বছর মানে অস্থিরতার বছর। এবার অস্থিরতা না থাকলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। এ অনিশ্চয়তা নির্বাচনের পরও বজায় থাকলে তা অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কারণে নতুন বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের কাজ বাধাগ্রস্ত হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশ থেকে যে পরিমান টাকা পাচার হয় তা যদি বিনিয়োগ করা যেতো তাহলে দেমে কোন বেকার থাকতো না। সরকার তার নির্বাচনী ওয়াদা রক্ষা করতে পারতো। সরকার ঠিকই ঘরে ঘরে চাকরি দিতে পারতো। কিন্তু দুনীতি বেড়ে যাওয়ায় পাচারও বেড়েছে। উল্টো কর্মসংস্থান কমেছে। এজন্য প্রধান দায়ী হলো গণতন্ত্রহীনতা এবং শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা। গণতন্ত্রে বিরোধেী দল না থাকলে ভার সাম্যহীন হয়ে পড়ে সে দেশের অর্থনীতি। যা প্রভাব স্পষ্ট আমাদের অর্থনীতিতে। কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় দেশে দুর্নীতি বাড়ছেই। কথা বলার কেউ। দুনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অর্থপাচার।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে কালো ছায়া পড়তে শুরু করেছে। এটি এখন পরিপূর্ণতা পেয়েছে। দেশে টানা কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে এক ধরনের মন্দা চলছে। বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হলেও সমাধান হয়নি। এ কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবেও সহজে ব্যবসা করার পরিবেশে (ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট) একধাপ পিছিয়ে ১৭৭ অবস্থানে নেমেছে বাংলাদেশ। বিনিয়োগের এ পরিস্থিতিতে দেশের ৪ কোটি বেকারের জন্য নতুন চাপ অনুভব করবে অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৮ সালজুড়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলবে। ফলে অর্থনীতি থাকবে এক ধরনের অতিরিক্ত চাপের মধ্যে। তবে সে ঝুঁকি কমিয়ে আনতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে যদি রাজনীতিবিদরা অর্থনীতির ইস্যুতে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে পারে, তা হলে অর্থনীতি ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাবে। বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী জানান, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আশানুরূপ আসেনি। এর বড় কারণ অবকাঠামো সমস্যা। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে কর্মসংস্থান আশানুরূপ বাড়েনি। এ ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক নীতিমালাও বিনিয়োগে বাধার কারণ। তবে নতুন বছরে বিনিয়োগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা তার। তিনি বলেন, ১০০টি অর্থনৈতিক জোন তৈরির পরিকল্পনা সরকারের। সেটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে বিনিয়োগ বাড়ে এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য থাকে। এজন্য শর্ত হলো কার্যকর বিরোধী দল। আর যদি তা না থাকে তাহলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক দিক বেশি দেখা দেয়। নতুন করে কেউ বিনিয়োগের সাহস পায় না।
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ