ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করা জরুরী

আর্থিক শৃঙ্খলা ইংরেজি Financial Discipline. আর্থিক শৃঙ্খলা বলতে বুঝায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আইন ও উপযুক্ত শাসন ব্যবস্থা অর্থাৎ Law and proper government অর্থাৎ The financial condition brought about by strong government. গত চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রেণী ও সামাজিক শক্তির অনেক রকম পরিবর্তন এবং ভাংচুর হয়েছে। উদ্ভব হয়েছে বিশাল সম্পত্তিশালী একটি শ্রেণী, ‘কালো টাকার’ মালিকানা যাদের অন্যতম পরিচয়। এদেশে অর্থনীতির সর্বাঙ্গে ক্ষত দেখা দিয়েছে। ১৯৬৯ সাল থেকে বাংলাদেশের জনগণ তৎকালীন শাসকচক্রের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধে তারা পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীকে পরাভূত করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতার পর বহুদিন আইনের শাসন বলবৎ না থাকায় যুদ্ধোত্তর কালে আইন শৃঙ্খলার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ কাজ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আগেকার সামাজিক আদর্শ ও নীতিগুলো যেন আজ মৃত প্রায়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার সাহসী সেনা মেজর আব্দুল জলিলের লিখা, ‘কৈফিয়ত ও কিছুকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন, “........ কিন্তু স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই মিত্র বাহিনী কর্তৃক দেশের সম্পদ লুন্ঠন এবং শাসক আওয়ামী লীগের সীমাহীন উদাসীনতা, ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ প্রত্যক্ষ করে এ সত্যটি অনুধাবন করতে আমার মোটেও বেগ পেতে হয়নি যে, দেশ ও জাতি এক শোষকের হাত থেকে মুক্ত হলেও অপর একটি নতুন শোষক গোষ্ঠীর অধীনস্থ হয়ে পড়েছে,..........।” ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা ও শাসনতন্ত্রে বহুবার পরিবর্তন ঘটেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী মহাজোট সরকার। যদিও সেই নির্বাচন ছিল তৎকালীন সেনা সমর্থিত মঈন-ফখরুদ্দিনের সাথে আঁতাতের ফল। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী একটি ভোটার বিহীন প্রহসনের এক দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে এ সরকার ডিজিটাল লুটে লিপ্ত রয়েছে। ‘সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে’ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে।
সামগ্রিকভাবে আইনের শাসনে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। সূত্র প্রথম আলো-৮মার্চ ২০১৮। খেলাপি ঋণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ‘নম্বর ওয়ান’। ক্ষমতাবানদের যোগসাজশে দেদার অর্থ আত্মসাৎ চলছেই। নয় বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ। সূত্র বনিক বার্তা ১৯ মার্চ ২০১৮। এ সরকারের জন্ম মেয়াদে ৮০ হাজার কোটি টাকা শেয়ার কেলেঙ্কারির পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, ‘এসব কিছুই নয়’ অর্থাৎ এটা হতেই পারে। অর্থাৎ কেলেঙ্কারির ঘটনা ক্ষমতায় থাকাকালীন হয়েই থাকে। “বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া কোনো ঘটনাই নয়। এরা ছেঁচড়া চোর। পুরো টাকা ২৮ বিলিয়ন হলে বুঝতাম আর্থিক খাতে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।” বলেছিলেন এফসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ। এবার বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা সোনার চাকতি হয়ে গেলো মিশ্র বা সংকর ধাতু। এ নিয়ে সারা দেশে যখন তোলপাড় তখন অর্থমন্ত্রী বলেন, “এটি কোনো বড় ঘটনা নয়।” গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির রিপোর্ট বলছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা! অর্থাৎ এটা আমাদের জাতীয় বাজেটেরও প্রায় দ্বিগুণ! অর্থমন্ত্রণালয়ের সূত্রই বলছে, ব্যাংকিং খাতের “অব্যবস্থাপনা” কাটিয়ে উঠতে গত নয় বছরে তাদের প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। সূত্র বনিক বার্তা, খেলাপি ঋণের হারঃ উন্নয়নশীল দেশে শীর্ষে বাংলাদেশ, ১৯ মার্চ ২০১৮। বিসমিল্লাহ গ্রুপ বা হলমার্ক, ফারমাস ব্যাংক ইত্যাদির তো লুটপাটে মেসাকার। পুরো আর্থিক ব্যবস্থা আজ অরক্ষিত।
নৈতিকতা বোধ জাগ্রত করে দেশকে হেফাজত করা এখন সময়ের দাবি। মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম- এর লিখা, ‘বাংলাদেশে আদর্শের লড়াই’ বইয়ের ১৮ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “.........আমাদের জন্য রাজনীতি ও অর্থনীতি দুটোই এক সাথে দরকার। কোনোটাকেই বাদ দিয়ে চলা যায় না। দুটোর সম্পর্ক খুব গভীর।.......” উক্ত বইয়ের ১৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “........... বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আযাদীর কোনোটাই নেই। এখানে গণতন্ত্রও নেই, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও নেই। এটাই আসল সমস্যা। আমেরিকা ও ইংলান্ডের মতো পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অথবা রাশিয়া ও চীনের মতো ডিক্টেটরি সমাজতন্ত্র আমাদেরকে সুখী করতে পারে না। একমাত্র ইসলামই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আযাদী দিতে পারে। আল্লাহর আইন ছাড়া সবদিক দিয়ে সুন্দর ব্যবস্থা আর কোথাও পাওয়া যেতে পারে না।..........” মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সাঃ) গ্রন্থের ৪৮৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত রয়েছে, “.......... ইসলামী সরকারের বেসামরিক বিভাগ (সিভিল সার্ভিস) ইসলামের দাওয়াত বিস্তারে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাছাড়া এইসব দাওয়াতদাতা আপন দায়িত্ব পালনের সময় প্রচলিত অর্থে শুধু অফিসার ছিলেন না। আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভীক হওয়া, জাঁকজমক,জুলুম ও বাড়াবাড়ি, জনগণ থেকে দূরে থাকা, মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিস সম্পর্কে উদাসীনতা, রাস্তায় বেরুলে অন্য সবাইকে হাঁকিয়ে দূরে তাড়িয়ে দেয়া, দারোয়ান ও পাইক পেয়াদার মাত্রাতিরিক্ত ভীড় জমানো, বড় প্রাসাদ নির্মাণ, লুটপাট, ঘুষ খাওয়া, চাটুকার পরিবেষ্ঠিত থাকা, সরকারি অর্থের অপচয় করে ইচ্ছেমতো পুরষ্কার দেয়া, মদের আড্ডা জমানো, নৃত্যগীতের জলসা বসানো এ সব কিছু থেকে তারা থাকতো যোজন যোজন দূরে...........।” জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলতে যেয়ে উক্ত বইয়ের ৪৮২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “............ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান শুধু আইনের জোরেই করা হয়নি। নৈতিক উপায়েও তার সুরাহার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রসূল (সাঃ) মদিনার কেন্দ্রীয় সমাজে সামাজিক সাম্যের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সৌভ্রাতৃত্বের (Economic Brotherhood) অত্যন্ত সাফল্যজনক অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
সমগ্র আরববাসী দেখতে পাচ্ছিল যে, আপন ঘরবাড়ী থেকে বিতাড়িত লোকজন, সর্বহারা ক্রীতদাস, ক্ষুধা জর্জরিত বেদুঈন এবং আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা যুবকদের একটি গোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণ করার পর রাতারাতি বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটে যাচ্ছে। এক দিকে বড় বড় অভিজাত সমাজপতিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং অকল্পনীয় দুঃসাহসিকতার সাথে চরম দাম্ভিক ও অহঙ্কারী প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। অপর দিকে তাদের সমস্ত দুঃখ কষ্ট ও অভাব অভিযোগ দূর হয়ে যাচ্ছে। তারা আশ্রয় পাচ্ছে, কাজ পাচ্ছে,.................।”
-আবু মুনীর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ