ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চৌগ্রাম জমিদার বাড়ির শতবর্ষী ১৫টি গাছ কর্তনের ঘটনায় তোলপাড়

সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা: ঠিকাদারের যোগসাজসে নাটোরের সিংড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চৌগ্রাম জমিদার বাড়ির লক্ষাধিক টাকা মূল্যের শতবর্ষী ১৫টি গাছ কেটে নেয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র । রবিবার সন্ধ্যায় প্রাচীন বৃক্ষগুলো অবাধে কাটার ঘটনায় সর্বত্র বইছে নিন্দা ঝড়। নাটোরের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার ৩’শ বছরের পুরনো চৌগ্রাম জমিদার বাড়ির ইতিহাস, ঐতিহ্য রক্ষা এবং সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে স্থানীয় স্কুল কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ দাবী জানিয়ে আসছিল। এলাকাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে প্রতœতত্ব বিভাগ সম্প্রতি রাজবাড়িটির সংস্কার কাজ সম্পূর্ণ করে দৃষ্টিনন্দন করা হয় । ঠিক এ সময় গাছকাটার ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী ।
রোববার সন্ধ্যায় বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী চৌগ্রাম জমিদারবাড়ীর গাছগুলো কেটে পাচারের সময় ঠিকাদারের লোকজনের কাছ থেকে গাছগুলো আটক করে । পরে আটককৃত গাছগুলো স্থানীয় চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে জব্দ করে রাখা হয়। মীম কনস্ট্রাকসন নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরদ্ধে গাছগুলি চুরি করে কেটে নেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের।
চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম ভোলা জানান, চৌগ্রামে ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন স্থাপনের জায়গা থেকে সরকারিভাবে বিক্রয়ের জন্য কিছু গাছ কেটে রাখা হয়। কিন্তু সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রবিবার সন্ধ্যায় ওই কর্তনকৃত গাছের সাথে গোপনে আরো বেশ কয়েকটি নিম, মেহগনি ও শিশু গাছ কেটে বিক্রয় করে ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন নির্মাণাধীন নাটোরের বড়াইগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীম কনস্ট্রাকসনেরমানেজার নয়ন মিয়া। পরে রাতের অন্ধকারে গাছগুলো ভ্যানে করে স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ময়েন উদ্দিনের মিলে নিয়ে যাওয়ার সময় গাছসহ ৪টি ভ্যান আটক করে স্থানীয় এলাকাবাসী ও গ্রাম পুলিশ। পরে আটককৃত গাছগুলো ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে জব্দ করে রাখা হয়।
ম্যানেজার নয়ন মিয়া এলাকাবাসীকে জানান, মীম কনস্টাকসন এর স্বত্ত্বাধিকারী ঠিকাদার ফজলুর রহমান তারেকের নির্দেশে এই গাছগুলো কাটা হয়েছে । মালিকের হকুম ছাড়া আমার গাছকাটা বা বিক্রির ক্ষমতা নেই ।
এলাকাবাসী জানান, এর আগেই মীম কনস্ট্রাকসনের মালিক তারেকের বিরুদ্দে বেশ কিছু গাছ গোপনে বিক্রয় করার অভিযোগ রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির গাছ বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ শাস্তি দাবি করেন।
চৌগ্রাম ইউনিয়ন সহকারী ভুমি কর্মকর্তা জানান, কর্তনকৃত কিছু গাছ জব্দ করা হয়েছে। আর গাছ কাটার বিষয়টি তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাকে অবহিত করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল কুমার জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। আর এবিষয়ে ইউনিয়ন ভূমিকে একটি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিবেদন পাওয়া মাত্র দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ।
ইতিহাস ও প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৭২০ সালে জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে চলনবিলের উত্তর পূর্ব কোণে প্রায় ৪৮ একর জমির উপর ৯টি পুকুরসহ রাজা রামজীবনের দান করা এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠাতা করেন জমিদার রসিক রায়। নাটোর রাজার অধীনে চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি ছিল একটি মাত্র পরগণা। এর পিছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। নাটোর রাজস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামজীবনের একমাত্র পুত্র রাজ কুমার কালিকা প্রসাদ অকালে মারা যায়। তার কোন সন্তানাদি না থাকায় রামজীবন একটি পুত্র সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্বান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু চৌগ্রামের রসিক রায়ের ছিল দুই পুত্র কৃষ্ণকান্ত ও রামকান্ত। রাজা রামজীবন এদের মধ্যে রামকান্তকে দত্তক নেন। পরে রামজীবন কৃতজ্ঞতা স্বরুপ নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম এবং রংপুরের ইসলামাবাদ পরগণা রসিক রায়কে দান করেন। জমিদার বাড়ির প্রবেশ পথেই রয়েছে মূল ফটক। উত্তর কোণে জমিদার ভবনের পাশেই বৈঠক খানা ও তহশীল ভবন। রাজবাড়ি জুড়ে দুই শতাধিক প্রাচীন বৃক্ষ রয়েছে ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ