ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি কমেছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার

খুলনা অফিস: খুলনা অঞ্চলের মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানি দিন দিন কমেছে। উৎপাদন বেশি হলেও বাড়ছে না মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানি। রফতানি কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। গেল অর্থ বছরের তুলনায় হিমায়িত চিংড়ি, হিমায়িত মাছ (মিঠা পানি), হিমায়িত (সামুদ্রিক), বরফায়িত মাছ (কোল্ড ফিস), জীবন্ত কুইচ্ছা-কাঁকড়া, চিংড়ির খোসা ও অন্যান্য মাছ রফতানি কমেছে ১১৬ দশমিক ২৮১ ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা।
মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তর খুলনা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ক্রমপুঞ্জিত মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানির পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ২১৭ দশমিক ০৬৯ মেট্রিক টন। যার রফতানি মূল্য ছিল ৩৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৬ ডলার। আর বাংলাদেশী টাকায় ২ হাজার ৫৮৮ দশমিক ২৪ কোটি। অপরদিকে, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ক্রমপুঞ্জিত মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ২০০ দশমিক ৭৮৮ মেট্রিক টন। যার মূল্য দাঁড়ায় ৩১ কোটি ১০ লাখ ৮২ হাজার ৮০ ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় ২ হাজার ৪৮৮ দশমিক ৬৬ কোটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গলদা, বাগদা, ক্যাট ফিশ, কার্প, ইলিশ, পারশে, ইল, বাইন, সল্ডটেড মাছ, ভেটকী, দাতিনা, কুইচ্ছা, কাঁকড়া, শুটকী এসব প্রজাতির মৎস্য চাষ হচ্ছে আমাদের দেশে। এসব মৎস্য চাষ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষী, ফড়িয়া ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। আর এসব মৎস্য রফতানি করছে আমাদের দেশের মাছ কোম্পানি মালিকরা। এছাড়া রপ্তানি হচ্ছে ফিস স্কেল, হাঙ্গরের পাখনা ও চিংড়ির খোসা।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু ছাইদ বলেন, খুলনায় বরাবরই মাছের উৎপাদন ভালো। প্রতি বছর চাহিদা অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন হয়। বিশ্ব বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়া, দাম কমে যাওয়া, রফতানি পণ্যেও গুণগতমান ঠিক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণেই রফতানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। এ বিষয়গুলো সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
এ ব্যাপারে মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তর খুলনার সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গেল অর্থ বছরের তুলনায় মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানি আয় কমেছে। মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রফতানি হ্রাসের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভেনামী চিংড়ির দাম অনেক কম হওয়ায়, আমাদের দেশে হিমায়িত চিংড়ির চাহিদা কমেছে। আর এজন্যই আমাদের দেশে বাগদা চিংড়ির রফতানি কমেছে। তিনি আরও বলেন, শুটকি চট্টগ্রাম থেকে, কাঁকড়া (জীবন্ত) ঢাকা থেকে ও কাঁকড়া (নরম) খুলনা থেকে রফতানি হয়।’ সংকটে ৯ প্রজাতির মাছ : খুলনায় ৯ প্রজাতির মাছ অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এসব মাছের বংশ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগে মৎস্য বিভাগ। এজন্য এসব মাছের প্রজনন বাড়াতে নানা উদ্যোগ হাতি নিয়েছে মৎস্য বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে মরা নদীতে পোনা অবমুক্তকরণ, অভয়াশ্রম গড়ে তোলা ও মাছের প্রজনন বৃদ্ধিতে ৯০০ পরিবারকে সচেতন করার কাজ চলছে। খুলনায় সংকটে থাকা ৯ প্রজাতির মাছ হচ্ছে, শৈল, কৈ, শিং, চিতল, পাবদা, উলুসী টেংরা গজাল, সরপুঁটি, মাগুর। অতিরিক্ত দাবদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, বৃষ্টি, লবণাক্ততা ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এ ৯ প্রজাতির মাছের বংশ বিস্তার সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু ছাইদ জানান, বিলুপ্ত প্রায় ৯ প্রজাতির মাছের প্রজনন বাড়াতে ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা নদী, মাড়ুয়ার খাল, মির্জাপুর মরা নদী, দিঘলিয়া উপজেলার হাতিয়ার খাল, তেরখাদা উপজেলার বাশুখালি, সালতিয়া ও আগরখালি খালে সংকটাপন্ন অবস্থায় এসব মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি এসব এলাকায় মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ৯০০ পরিবারকে সচেতন করতে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে তাদের প্রতিবেশীদেরও উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, বটিয়াঘাটা উপজেলার কাজীবাছা, সালতা ও চুনকুড়ি, দাকোপ উপজেলার শিবসা, মংলা বন্দর এলাকার পশুর, কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে চিংড়ি ও পারশের পোনা আহরণ করে থাকে। এর ফলে ভেটকি, টেংরা, পায়রা, দাতনে প্রজাতির মাছের পোনা নিধন হচ্ছে। খুলনা মহানগরীর ফারাজি পাড়া এলাকার সেলিম আহমেদ বলেন, এখন বাহারে গেলে দেশীয় কৈ মাছ পাওয়া কঠিন। হাইব্রিড মাছে বাজার সয়লাব। দেশীয় শিং ও মাগুর মাছও চিনে কেনা অসম্ভব ব্যাপার। হাইব্রিড মাছের আধিক্য অনেক বেড়ে গেছে। তাই তিনি এখন সামুদ্রিক মাছ কেনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মল্লিক জানান, অভায়াশ্রম গড়ে তোলার পর স্থানীয় হাট বাজারে শৈল, কৈ, শিং, চিতল, পাবদা, উলুসী টেংরা মাছের সরবরাহ বেড়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ও পোনা অবমুক্তকরণের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে পারলে সংকটে থাকা এসব মাছ রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন ডিসিপ্লিনারি প্রভাষক সুদীপ দেবনাথ বলেন, অবাধে পোনা ধরা, নদী ভরাট, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়াসহ নানা কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশ বৃদ্ধি কমেছে। কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদী, খাল বিলের পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। যা মাছের বংশ বিস্তারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ছাইদ জানান, রূপসা, শিবসা, পশুর, ভদ্রা ও কপোতাক্ষ বিধৌত খুলনা মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তর জেলা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৫২ হাজার মেট্রিক টন মাছের চাহিদার বিপরীতে এই জেলায় প্রায় ৯৬ হাজার মেট্রিক টন মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় চার দশমিক পাঁচ শতাংশ বেশি। উদ্বৃত্ত প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। এতে অবদান রাখেন প্রায় ৬৩ হাজার মৎস্য চাষি, হ্যাচারি মালিক, মৎস্য ব্যবসায়ী এবং ৪০ হাজার মৎস্যজীবী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৪৬ লাখ মেট্রিক টন লক্ষমাত্রা অর্জনে খুলনা জেলা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। তিনি আরও জানান, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে জেলার বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয় প্রায় ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ২৯ মেট্রিক টন জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে যা থেকে ১৪৮মে: টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন হবে যা এলাকার পাঁচ হাজার সুফলভোগীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ