ঢাকা, শনিবার 28 July 2018,১৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এখনো খুলনার আলোচিত গৃহপরিচারিকা সোনিয়া হত্যা রহস্য উন্মোচন হয়নি

খুলনা অফিস : ময়নাতদন্ত রিপোর্টেই থেমে আছে সোনিয়া আক্তার (২০) হত্যার রহস্য। ময়নাতদন্তের দোহাই দিয়ে গত ২২ দিনেও ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে মা হারা দুগ্ধজাত শিশু সুমন হাসান (২) খুঁজছে তার মাকে। সে পথ চেয়ে বসে আছে, কখন মা আসবে আর সে মায়ের কোলে উঠবে। মার কাছে যাব, আমি মার কাছে যাব। তার দাদী জবেদা বেগম নাতিকে সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন, ওই তো তোমার মা চকলেট নিয়ে আসছে। কিন্তু সোনিয়া আর ফিরে আসে না। নাতীর চোখের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন সন্তানহারা জবেদা বেগম।
রূপসা উপজেলার আইচগাতীর সেনের বাজার ঘাট সংলগ্ন ভৈরব নদ থেকে উদ্ধার হওয়া খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে সোনিয়া আক্তারের হত্যার রহস্য গত ২২ দিনেও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। সে খালিশপুর উত্তর কাশিপুর পোড়াবাড়ি মসজিদ সংলগ্ন আক্কাস আলীর বাড়ির ভাড়াটিয়া নির্মাণ শ্রমিক মো. মিন্টু সরদারের স্ত্রী। তিনি একজন দর্জি ও গৃহ পরিচারিকা ছিলেন। মিন্টু বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার ভাটখালি গ্রামের বাসিন্দা দেলোয়ার সরদারের ছেলে।
এলাকার মুরব্বি সামসুর রহমান জানান, এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে এ হত্যার রহস্য উন্মোচনে আন্দোলন শুরু করলেও তা মাঝপথে থামিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যে আশ্বাসে আন্দোলন থামিয়ে দেয়া হয় তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ৩০ জুলাই পর্যন্ত তারা নীরব থাকবেন। এরপরও যদি ঘটনার রহস্য উন্মোচন না হয় তবে তারা আবারও আন্দোলনে নামবেন বলে জানান।
দর্জি আব্দুল গফুর জানান, সোনিয়া হত্যার বিষয় নিয়ে সব কিছু যেন ক্রমে থেমে যাচ্ছে। এটা সহকর্মী হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।
আরেক দর্জি খলিলুর রহমান জানান, দর্জি শ্রমিক সোনিয়া হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে এলাকাবাসী সোচ্চার। কিন্তু লাশ উদ্ধার অনেক দিন পার হয়ে গেলেও রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। পুলিশ কমিশনারের আশ্বাসে তারা চলমান আন্দোলন স্থগিত করে এখন হতাশ হয়ে পড়ছে। কারণ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের আস্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে গৃহবধূ সোনিয়া আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় গত ২৭ জুন মহানগর হাকিমের আমলী আদালত গ অঞ্চলে জোবেদা বেগম বাদী হয়ে তার মেয়েকে বাড়িওয়ালার পরিবার যোগসাজসে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগ করেন। যার সি/আর নং-৫৩৯/১৮।
অভিযোগে বাড়িওয়ালার বড় মেয়ে আকলিমা (২৪), আব্দুস সালামের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (৩০), বাড়িওয়ালা আক্কাস আলী শেখ (৫০), আব্দুস সালামের ছোট ছেলে তরিকুল ইসলাম (২৮) ও আক্কাসের ছোট ছেলে মো. ইব্রাহিমকে (১৯) অভিযুক্ত করা হয়। বাদীর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন এডভোকেট মোহাম্মাদ আলী বাবু। তিনি বলেন, আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে আদালত অভিযোগটি তদন্ত সাপেক্ষে খালিশপুর থানার ওসিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই দিন পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
খালিশপুর থানার ওসি (তদন্ত) শেখ আবুল খায়ের বলেন, সোনিয়ার লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। যেহেতু রূপসা থানা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে। সেহেতু ময়নাতদন্ত  রিপোর্ট রূপসা থানা পুলিশ গ্রহণ করে তাদের দিবে। তারপর রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার জন্য তিনি রূপসা থানাকে তাগিদ দিয়েছেন। রূপসা থানা পুলিশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার ব্যাপারে তাগিদ দিতে পারে।
নিহতের মা জবেদা বেগম জানান, সোনিয়ার রেখে যাওয়া দু’বছর বয়সের একটি ছেলে রয়েছে। তার নাম সুমন হাসান। তার চোখ সোনিয়াকে খুঁজছে। থেকে থেকে শিশুটি তার মাকে ডাকছে। এ সময় চোখের পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। দুগ্ধজাত এ শিশুকে সামাল দেওয়া খুবই কষ্টকর। নানা অভিনয়ে শিশুটিকে রাখতে হচ্ছে। মা কখন আসবে, কই আসছে, এমনই হাজার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি নিজেই ক্লান্ত। তিনি বলেন, সম্প্রতি তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য আবেদন করেছেন। তবে আদালত আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছে। এছাড়া সোনিয়ার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়ার রক্তমাখা একটি চটের বস্তা পুলিশ অনেকটা জোর করে তার কাছে রেখে গেছে। এমন কি সোনিয়া যে ঘরে ভাড়া থাকতো সেই ঘর থেকে মালামাল বের করে নেয়ার জন্যও চাপ প্রয়োগ করছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, ২১ জুন বাড়িওয়ালা আক্কাস ও তার পরিবারের লোকজন দর্জি শ্রমিক সোনিয়াকে বেদম প্রহার করে। এরপর থেকে সোনিয়ার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত ২৩ জুন আইচগাতী পুলিশ ফাঁড়িতে একটি মহিলার লাশ নদী থেকে উদ্ধার হওয়ার সংবাদ পেয়ে সোনিয়ার স্বামী মিন্টু সরদারসহ এলাকার লোকজন গিয়ে লাশটি সোনিয়ার বলে শনাক্ত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ