ঢাকা, রোববার 29 July 2018, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী ॥ প্রজনন মন্ত্রীপাড়া-ধানমন্ডিতে !

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : টানা বৃষ্টিসহ নানা কারণে রাজধানীতে মশার উপদ্রব আবারও বেড়েছে। বছরজুড়ে রাজধানীবাসী কমবেশি মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠই থাকেন। তার ওপর মশার প্রজনন্ মওসুমে এ ছোট প্রাণীটির উপদ্রব চলতি সময়ে এতটা বেড়েছে যে,নগরবাসীকে তা জ্বালিয়ে মারছে। দিন নেই রাত নেই সারা সময় জুড়েই মশার কামড়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা কোন কাজে আসছে না। মশার অত্যাচার চলছেই। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, তাদের ধানমন্ডি, কলাবাগান, সেগুন বাগিচা ও মন্ত্রী পাড়া এলাকার ৪৫ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। আর পুরো দক্ষিণ সিটিতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বাহিত এডিস মশার লার্ভা রয়েছে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ বাড়িতে।
রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই মশার উপদ্রব বেড়েছে। বাসা-বাড়ি থেকে অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার অত্যাচার চলছে। মশারি, কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট, স্প্রে কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। সুযোগ পেলেই কামড় বসিয়ে দিচ্ছে মশা। দিনে-রাতে সব সময়ই মশার যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বর্তমানে বর্ষা মৌসুম চলায় মশার অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছরই বাজেট বাড়াচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রতি বছরই মশার যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। শুধুমাত্র মশার কামড় নয় এর সাথে নানা রোগব্যাধিতেও আক্র্ন্তা হচ্ছে নগরবাসী। গত বছর ডেঙ্গুর সাথে চিকুনগুনিয়া নামে মারাত্মক একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষকে ভুগতে হয়েছে। অনেকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। এ বছরও আবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। ইতোমধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। এ কারণে নগরবাসীর মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে। তবে জানা যায়, সিটি করপোরেশন ড্রেন ও উড়ে যাওয়া মশা মারতে ওষুধ প্রয়োগ করলেও এডিস নামক যে মশার কারণে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ সৃষ্টি হচ্ছে তার সমাধান দিতে পারছেনা তারা। কারণ নগরবাসীর নিজেদের বাড়িতেই এ মশার উৎপাদন হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মশক কর্মীরা এ মশা মারতে পারেনা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্ম নিয়ে থাকে। আর এ পানি জমে থাকে বাড়ির পানির ড্রাম, ফুলের টব, মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, পরিত্যক্ত কলসি, বালতি, বোতল, কনটেইনার, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা ও পুকুরে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি।
নগরীতে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এক জরিপ চালিয়েছে। গত ২৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত সংস্থাটির পাঁচটি অঞ্চলের ৫৭টি ওয়ার্ডে এ জরিপটি চালানো হয়। জরিপ চালিয়ে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ বাড়িতে এডিশ মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১ নম্বর অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ বাড়িতে এডিশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, জরিপকালে ১৯ হাজার ৫৪২টি বাড়ি থেকে ১ হাজার ৬৭০টি বাড়ির ১ হাজার ৭৫৪টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অঞ্চল-১ এর সাতটি ওয়ার্ডের দুই হাজার ৫৯৯টি বাড়ির মধ্যে ৯৩৮টি বাড়ির ৯৬১টি স্থানে লার্ভা পাওয়া গেছে যা জরিপ পরিচালিত বাড়ির ৩৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। অঞ্চল-২ এর ১২টি ওয়ার্ডের ৪ হাজার ৩৪৪টি বাড়ি পরিদর্শন করে ১৭৮টি বাড়ির ১৭৮টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, যা পরিদর্শিত বাড়ির ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।
অঞ্চল-৩ এর ১২টি ওয়ার্ডের ৪ হাজার ৬৯৩টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৭৫টি বাড়ির ৩২৩টি স্থানে লার্ভা পাওয়া যায়, যা মোট পরিদর্শিত বাড়ির ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
অঞ্চল ৪ এর ১১টি ওয়ার্ডের ৩ হাজার ৪০৬টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৬৯টি বাড়ির ৮২টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। যা পরিদর্শিত বাড়ির ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
অঞ্চল-৫ এর ১৫টি ওয়ার্ডের ৪ হাজার ৫০০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২১০টি বাড়ির ২১০টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। যা পরিদর্শিত বাড়ির ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অভিযানকালে দেখা গেছে লার্ভা প্রাপ্ত বাড়ির পানির ড্রাম, ফুলের টব, ঘরের আশেপাশে পড়ে থাকা মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, পরিত্যক্ত কলসি, বালতি, বোতল, কনটেইনার, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা ও পুকুরে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা রয়েছে।
ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত নানা রোগের প্রকোপ থেকে নাগরিকদের মুক্তি দিতে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সম্প্রতি স্থানীয় কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিনে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শনকালে এসব মশার লার্ভা পায় এবং সেগুলো ধ্বংসে ব্যবস্থা নেয়া হয়। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করতে এক লাখ সাড়ে ২৫ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়।
এদিকে মশার লার্ভা সনাক্তকরণ ও ধ্বংসে গতকাল শনিবার থেকে আবারো নতুন করে অভিযান শুরু করেছে ডিএসসিসি। রাজধানীর বীর উত্তম সিআর দত্ত সড়কের কাঁঠালবাগান ঢালে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন মেয়র সাঈদ খোকন। এ সময় তিনি বলেন, ডিএসসিসির অঞ্চল -১ এর  ধানমন্ডি, কলাবাগান, সেগুন বাগিচা ও মন্ত্রী পাড়া এলাকার ৪৫ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এই এলাকার প্রায় প্রতি ৩  বাড়ির একটিতে আমরা মশার লার্ভা পেয়েছি। যা খুবই উদ্বেগ জনক। এ কারণে আমরা এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসকরণে আবারও কর্মসূচি নিয়েছি। এতে অঞ্চল-১ কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এছাড়া অঞ্চল ২, ৩, ৪, ৫ এলাকার অবস্থা ভালো আছে। হিসেব অনুযায়ী এই এলাকার বাড়িগুলোর অবস্থা অতটা উদ্বেগজনক নয়। এসময় মেয়র তার সংস্থার মতো ঢাকার আশপাশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকেও এক যোগে এই কর্মসূচি পালন করার আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ