ঢাকা, রোববার 29 July 2018, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রবাসে বাংলাদেশীদের সামাজিক অবস্থা

আখতার হামিদ খান : [দুই]
এ ধরনের আরো একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ সম্প্রতি সংবাদপত্রের পাতায় গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে। উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্নে প্রলুব্ধ করে পাঁচ বছর আগে ঢাকার নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের শেফালী আক্তার নামের এক যুবতীকে লস এঞ্জেলসে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে নূর আলামিন নামের আরেক প্রবাসী। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে শেফালীকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় সৌদি আরবে। সেখানে কিছু দিন থাকার পর জনৈক সৌদি ব্যবসায়ীর পরিচারিকা হিসেবে তাকে নিউইয়র্কে আনা হয়। নিউইয়র্ক প্রবাসী নূর আলামিনের বাসগৃহে শেফালী পরিচারিকা হিসেবে কাজ শুরু করে। গৃহপরিচারিকার কাজ হলেও তার ওপর চালানো হতো নিয়মিত যৌন নিপীড়ন। এক পর্যায়ে শেফালী অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিউইয়র্ক থেকে তাকে লস এঞ্জেলসে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানেও তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হতো। গৃহস্বামী নূর আলামিন তার ওপর যৌন পীড়ন অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বন্ধু-বান্ধবদের জন্য শেফালীকে যৌনদাসী হিসেবে নানানভাবে মনোরঞ্জনে বাধ্য করে। এভাবে চলতে থাকে একটানা চার বছর। দীর্ঘ চার বছরে তাকে কোনো পারিশ্রমিক দেয়া হয়নি। এমন কি দেশে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শেফালী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বছরখানেক আগে সে শারীরিক ও মানসিক পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় আত্মহত্যার জন্য উন্মুক্ত রাস্তার দিকে ছুটতে থাকলে এক পথচারী দৃশ্যটি দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিচর্যার পর সুস্থ হয়ে উঠলে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও নারীবাদী সংগঠন সাহায্যের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে। প্যাসিফিক আমেরিকান লিগ্যাল সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান শেফালীকে আইনগত সহায়তার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাতার ব্যবস্থা করে। লস এঞ্জেলসের একটি ফৌজদারী আদালত শেফালীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন ও ন্যূনতম পারিশ্রমিক না প্রদান করার দায়ে নূর আলামিনকে ১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। একই অপরাধে গৃহকর্ত্রী রাবেয়া আক্তার দোষী সাব্যস্ত হন। তবে দোষ স্বীকার করার কারণে তার শাস্তির মাত্রা লঘু করে দুই বছরের কারাদ- দেয়া হয়। এ ছাড়াও আদালত এই দম্পতিকে আড়াই লাখ ডলার জরিমানা করে। জরিমানার অর্থ শেফালীর গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজের বকেয়া ও সম্ভ্রমহানির ক্ষতিপূরণ বাবদে প্রদান করা হবে। জরিমানার অর্থ আদায় না হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, কারাবাসের মেয়াদ দীর্ঘায়িত এবং অভিবাসন মর্যাদা কেড়ে নিয়ে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এ ঘটনা আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের মাঝে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
সুখের বসতে দুঃখের জলছাপ
প্রবাসজীবনের এই সামাজিক অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে বৈবাহিক জীবনে তিক্ত ও ভীতিকর অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। এ দেশের বিয়ের বাজারে প্রবাসী পাত্র/পাত্রীর চাহিদা প্রচণ্ড। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রবাসী পাত্র-পাত্রী নিয়ে দস্তুরমতো দরদামের প্রতিযোগিতা চলে বলে জনশ্রুতি আছে। কিন্তু আমরা কি জানি অসম মানসিকতা ও পরিবেশের এই বৈবাহিক সম্পর্কের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? ঢাকার সেই সুখী দম্পতির কথাই ধরা যাক। প্রেম করে বিয়ে করা এরা দু’জন দশ বছর আগেও স্থানীয় বিনোদন সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন। পরিচিত মহলে তারা ছিলেন দৃষ্টান্ত। একসাথে কাজ করা, আড্ডা মারা, বাজারঘাট, ঘরে ফেরা। হঠাৎ করে একযোগে আমেরিকা পাড়ি জমালেন দু’জন। বছরের চাকা ঘুরতে না ঘুরতেই খবর এলো- ওদের ঘর ভেঙেছে। পরিচিত মহলে খবরটি শোকাবহ হলেও এটাই ছিল বাস্তব। এর কারণ হিসেবে আপনজনরা মুক্ত পরিবেশ ও ব্যক্তিত্বের সংঘাতকেই দায়ী করেন। রুলিয়া জানেন না, কোন অপরাধে তার গোটা জীবনচিত্রই পাল্টে গেলো এভাবে। চোখে পড়ার মতো সুন্দরী ও মেধাবী রুলিয়া কলেজ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর নানান দিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। বাবা নেই। বড় মেয়েকে নিয়ে পাত্রপক্ষের এতো কৌতূহল বিয়ের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে। দেখে-শুনে পরিবারের সবাই মিলে তার জন্য প্রবাসী পাত্র পছন্দ করেন। পাত্রের বাবা-মা ঢাকায় সম্মানজনক পদে ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র পরিবার। পাত্র লন্ডনে থাকে। এমবিএ। উচ্চ বেতনে সেখানে চাকরি করে। নিজস্ব গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট আছে। ঢাকায় নিজের জায়গা, বাড়ি। নায়কসুলভ চেহারা। সব মিলিয়েই সুপাত্র। দিনক্ষণ ঠিক করে বিয়ে হলো ওদের। বিয়ের পর ঢাকায় থাকা দিনগুলো চমৎকার কাটে। রুলিয়াকে রেখে কিছুদিন পর স্বামী চলে যান কর্মস্থলে। স্ত্রীকে কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দু’মাস পর রুলিয়াও নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে লন্ডনে স্বামীর কাছে পাড়ি জমান। দাম্পত্যজীবনের সুখময় স্বপ্নে ফাটল ধরতে সময় লাগে না। এখানে এসে স্বামীকে প্রতিপদে আবিষ্কার করেন নতুনরূপে, নতুন চরিত্রে। একাধিক গার্লফ্রেন্ড তার। নিত্য গার্লফ্রেন্ড বদল হয়। তাদের নিয়েই সময় কাটে। স্ত্রীর সব ধরনের দাবিই তার কাছে উপেক্ষিত। স্ত্রীর ভূমিকা গৃহপরিচারিকা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। প্রতিবাদ জানানো দূরে থাক, কোনো ব্যাপারে আপত্তি অথবা প্রশ্ন তুললে সেই নায়কসুলভ চেহারার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ভিলেনের ভয়াল রক্তচক্ষু। ভয়ে গুটিশুটি হয়ে যান রুলিয়া। মাঝে মাঝে দেশ থেকে তার কাছে মা-ভাই-বোনের ফোন আসে। বাস্তবতা এবং অশ্রু লুকিয়ে রুলিয়া জানান, ‘জানো আম্মু, লাস্ট উইকএন্ডে নেহালের সাথে শেফিল্ড ঘুরে এলাম। ছবি তুলেছি। পাঠাবো, দেখো কত সুন্দর জায়গা।’ নেহাল সারাক্ষণ সাথে নিয়ে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। খাওয়া-দাওয়াও বাইরে। তাই ফোন করার সময় পায় না ইত্যাদি। আসল ব্যাপার হচ্ছে, বাপের বাড়ির সঙ্গে ঘন ঘন ফোনে কথা বলার ব্যাপারে স্বামীর নিষেধাজ্ঞা। পরিবারের সবাই জানেন, মেয়ে সুখে আছে। স্বামী চরিত্রের সবটুকুই রুলিয়ার অজানা ছিলো। এমনকি বিয়ের আগে তার সম্পর্কে যা জানানো হয়েছিল, পুরোটাই মিথ্যা। কিছুদিনের ভেতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রকৃত সত্য। নেহালের শিক্ষাগত যোগ্যতা টিটিএমপি (টেনে টুনে ম্যাট্রিক পাস)। দেশে থাকতে অসৎ সঙ্গে পড়ে বিপথগামী হতে শুরু করে। একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় ক্ষমতাবান বাবা-মা তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। সেখানে এসেও তার স্বভাব-চরিত্র বদল হয় না। ওয়ার্কশপে কাজ করে। কাজের বাইরেও একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত। সে দলে কালোদের সংখ্যাই বেশী। নিজেরা সাংকেতিক ভাষায় ফোনে কথা বলে। ঘরের দরজা বন্ধ করে গোপন আলাপ সারে। মাঝে মাঝে কিছুদিনের জন্য ডুব দেয়। কোথায় যায় রুলিয়া জানেন না। অনুমান করতে পারেন কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে তার স্বামী জড়িত। বাড়িতে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে পার্টি হয়। মদের বন্যা বয়ে যায়। তার সামনেই চলতে থাকে গ্রুপ সেক্সের মতো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এ সময়ে রুলিয়ার দায়িত্ব হচ্ছে বেসামাল নরনারীদের দেখাশোনা করা। প্রয়োজনে যোগান দেয়া। আপত্তি করায় একবার নায়কসুলভ চেহারার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা ভিলেন তার গলাটিপে ধরেছিলো। সব মিলিয়ে দুঃস্বপ্নের ঘোরে কাটতে থাকে রুলিয়ার জীবন। কথা ছিলো, এখানে তাকে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ দেয়া হবে। যতদূর রুলিয়া যেতে চান তার সমর্থন যোগাবেন স্বামী। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে অভিভাবকদের ওপর। একসময় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মায়ের কাছে আসল ঘটনা খুলে বলেন। যোগাযোগ করা হলো তার শ্বশুরবাড়ির সাথে। ছেলেকে ফেরানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। স্ত্রী যদি না পারে স্বামীকে সুপথে ফেরাতে তাদেরই বা কি করার আছে- এ ধরনের জবাব এলো ওদিক থেকে। হঠাৎ একসময় ঘুরে দাঁড়ালেন রুলিয়া। স্বামীর মুখোমুখি হয়ে বললেন, এভাবে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। ভদ্রলোকের তাতে কোনো ভাবান্তর হয় না। হাসি মুখে বললেন, ওয়েল, ডোর ইন ওপেন অ্যান্ড ইউ মে গো, কিন্তু কোনো আর্থিক ক্লেইম করতে পারবে না। স্বপ্নভঙ্গের ক্ষতিপূরণ কী অর্থদ-ে সম্ভব? খালি হাতে শুধু এক সুটকেস ব্যবহার্য কাপড়চোপড় নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলেন রুলিয়া। সাথে থাকে চার বছর প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে কাটানো দুঃস্বপ্নের মানসিক বিপর্যয়।
কন্ট্রাক্ট ম্যারিজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের ফন্দি করার পরিণতিতে নিউইয়র্কের ব্রুকলীনে চার সন্তানের বাংলাদেশী একটি পরিবারে সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে এসেছে। পরিবারের কর্তাটি উদ্বাস্তু হয়ে এখানে-সেখানে দিনাতিপাত করছেন এবং গৃহিণী বসবাস করছেন ভিন্ন ভাষার এক পুরুষের সাথে। এ সংবাদ প্রকাশ করে স্থানীয় সাপ্তাহিক ঠিকানায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশী অধ্যুষিত চার্চ ম্যাকডোনাল্ড এলাকায় বসবাসরত গৃহকর্তা বেশ কয়েক বছর আগে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন। তার স্ত্রীও আমেরিকার নাগরিক। ভালোই চলছিলো তাদের দিনকাল। আরো চাওয়ার আকাক্সক্ষায় তারা নিজেদের ভেতর সমঝোতার ভিত্তিতে আমেরিকার নিয়ম অনুসারে ডিভোর্স করেন। এরপর শুরু হয় অর্থোপার্জনের নেশা পূরণের প্রক্রিয়া। স্ত্রী দেশে ফিরে বিয়ে করে নতুন স্বামীকে আমেরিকায় আনার জাল ছড়িয়ে তিনজনের কাছ থেকে মোটা দাগের টাকা আদায় করেন। একইভাবে স্বামী দেশে এসে বিয়ে করে নতুন বউ আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতান। ইমিগ্রেশন বিভাগের কঠোর নিয়ম ও চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশ থেকে নতুন স্বামী-স্ত্রীদের আমেরিকায় আনার ব্যবসা সফল হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ