ঢাকা, রোববার 29 July 2018, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অর্ধশত বাড়িঘর ও সড়কসহ সেতু বিলীন হুমকির মুখে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

এইচ এম হাসিবুল হাসান, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : মানিকগঞ্জের ঘিওরে কালীগঙ্গার তীব্র ভাঙনে বিশটি গ্রামের চলাচলের একমাত্র রাস্তা সেতুসহ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া বিলীন হয়েছে অর্ধ-শতাধিক বসত বাড়ি। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো দুই শতাধিক বসতবাড়ি, একটি বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, এতিমখানা, একটি ব্রিজ, বাজার, রাস্তাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণসহ সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ভাঙন কবলিত এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বানিয়াজুরি ইউনিয়নের পূর্ব কুমুল্লী, কেল্লার চর, নকিববাড়ী, তরা গ্রামের কমপক্ষে ১০টি পরিবারের ঘরের চালের টিন, আসবাবপত্র, গবাদি পশু সরিয়ে নিচ্ছে নিরাপদ স্থানে। ভিটে মাটি হারা মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। জাবরা, তরা, উত্তর তরা, নকিববাড়ী, পূর্ব কুমুল্লী, কেল্লার চর এলাকার মানুষজনের দিন কাটছে ভাঙনের শব্দ শুনে। গত কয়েক বছরে কালীগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙনে ক্ষতি হলেও নেয়া হয়নি ভাঙনরোধে স্থায়ী কোন ব্যবস্থা। এ কারণে ভাঙন অব্যাহত থাকায় পার্শ্ববর্তী বিশটি গ্রামের চলাচলের একমাত্র রাস্তা ও সংযোগ সড়কটিও গত কয়েকদিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের শিক্ষার্থী কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীসহ হাজারো মানুষ হয়ে পড়েছেন দিশাহারা।
পূর্ব কুমুল্লী গ্রামের প্রফেসর শরীফ উদ্দিন জানান, ‘গত তিন বছরে আমার বাবা, চাচার ১২ বিঘা বসতবাড়ি মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ সবটুকুই গেছে নদীর পেটে। আক্ষেপের সুরে বললেন, ঘর আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও অন্তত ভিটে মাটিটুকু অবশিষ্ট থাকে কিন্তু নদীর ভাঙনে সবকিছু শেষ হয়ে যায়।’
সাবেক ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম বিশ্বাস (গ্যাদন) জানান, নদী ভাঙনের কারণে গত কয়েক বছরে এখানকার শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এখানকার আরো শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা খন্দকার বলেন, আমি ভাঙনের খবর পেয়েছি। ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে যাব। তবে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হবে।
অপরদিকে জেলার দৌলতপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা, ৮টি গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার গৃহহীন ও ১০০ একর ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত ইউনিয়নগুলো হলোÑ চরকাটারী, বাঁচামারা ও বাঘুটিয়া ইউনিয়ন। সহায়সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ওই সব এলাকার মানুষ। ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে চরকাটারী ইউনিয়নের লালপুর, চরকাটারী, কাঁঠালতুলি, চরকাটারী মন্ডলপাড়া, বোর্ডঘর বাজার, চরকাটারী বাজার এলাকায়। যমুনা পাড়ে হুমকির মুখে পড়েছে ওই সব এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিসসহ শত শত বাড়িঘর ও ফসলি জমি। নদীভাঙনে ইতোমধ্যে ঐতিহ্যবাহী চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চবিদ্যালয়, চরকাটারী বাজার, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূমি মসজিদ, মাদরাসা ও অর্ধশত বাড়িঘর আবাদি জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার ওই এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ ঘরবাড়ি-জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমির ওপর আশ্রয় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কমপক্ষে ৫০টি পরিবার গৃহহীন ও ১০০ একর ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।
প্রতিদিনই একের পর এক নতুন পরিবার গৃহহীন ও ফসলি জমি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। অসময়ে ভাঙনের শিকার এসব এলাকার মানুষ বাঁধের পাদদেশে ও খোলা আকাশের নীচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কেউ কেউ আবার আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
দৌলতপুর উপজেলার চরবারাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ সমেজ প্রামাণিক। গত ২ যুগে ৮ দফা ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তার ৪০ বিঘা জমি ও ঘরবাড়ি ছিল। এখন কিছুই নেই, সবই যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। ইপিজেড এলাকায় কুলির কাজ করে চলে তার সংসার।
দৌলতপুর উপজেললায় যমুনার তীরবর্তী বাচামারা ইউনিয়নের ৪৪ নম্বর বাচামারা উত্তরখন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষার্থীর কোলাহলে মুখরিত ছিল সেই স্কুলটি যে কোনো মুহূর্তে যমুনা নদীতে বিলীনের পথে।
৪৪ নম্বর বাচামারা উত্তরখন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক রিক্তা আক্তার জানান, তিন বছর ধরে বিদ্যালয়টি ভাঙনের আশঙ্কার মধ্যে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকে কয়েকবার চিঠি লেখা হলেও তারা ভাঙন রোধ কিংবা ভবন স্থানান্তরের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। ১৯৬৯ সালে স্থাপিত এ বিদ্যালয়ে বিগত অর্থ বছরে ৩৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয় করে দ্বিতল ভবনটি করা হয়েছিল।
বাচামরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ জানান, এ এলাকাটির ভাঙন ঠেকাতে সাড়ে ৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরইমধ্যে তার ইউনিয়নের ৩০-৪০ একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিদ্যালয়টির এক হাজার ৫০০ ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক তোজা বলেন, এই এলাকার মানুষের মনে নদী ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করে। নদী ভাঙনে সর্বশ্বান্ত হয়ে কিংবা ভাঙনের হুমকীর মুখে থাকা বাড়ির মানুষজন মাথা গোজার ঠাঁইটুকু রাক্ষা করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবে মওলা মোঃ মেহেদি হাসান বলেন, ‘আরো কয়েকটি স্থানে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কালীগঙ্গা নদীর কয়েকটি পয়েন্টে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য বাজেট চাওয়া হয়েছে। এটার নামও তালিকায় দিয়ে দিব। বাজেট পাস হয়ে গেলেই আমরা কাজ শুরু করব। অস্থায়ী প্রকল্প এখনও হাতে নেওয়া হয়নি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ