ঢাকা, রোববার 29 July 2018, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তাড়াশের রাস্তা-ঘাট সংস্কারে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ

শাহজাহান তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) থেকে: সিরাজগঞ্জ উন্নয়ন প্রকল্প ও বৃহত্তর পাবনা-বগুড়া উন্নয়ন প্রকল্প জিওবি রক্ষণাবেক্ষণ আরটি আইপি-২ প্রকল্পের আওতায় তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী অধিদপ্তর থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৪৯টি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি, ৪৫ লক্ষ (প্রায়) টাকা। ওই সকল প্রকল্পের নিম্নমানের খোয়া, কম বালু, এএস না করা, একই প্রকল্প ২বার গ্রহন করা এবং এলাকার লোকজনের নিকট থেকে রাস্তার করে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ কাজের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ওই সব প্রকল্পে নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করে কাজ করায় এলাকার লোকজন কাজ বন্ধ করে দিলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার হুমকির মুখে এলাকাবাসি নিরব ভুমিকা পালন করছেন। এলাকাবাসি সিরাজগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সচেঞ্জ) কে অবহিত করার পরও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেন নাই বলে অভিযোগ করেছেন। সিডিউল মোতাবেক কাজ না হওয়ায় রাস্তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ঠ সুত্রে ও সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, তাড়াশ রানীর হাট পাকা রাস্তা হতে গুল্টা হাসান রাস্তা মেরামতের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৬লক্ষ টাকা। সিডিউল মোতাবেক এ রাস্তার উপরিভাগ মেশিন দিয়ে ভেঙ্গে বেড সমান করে রোলিং করে বালু বিছিয়ে দেওয়ার পর খোয়া বিছানোর নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তাছাড়া নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ করা হয়েছে। ফলে রাস্তাটির দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাটিকুমরুল বনপাড়া মহা সড়কের ১০ নং ব্রীজ থেকে নাদোসৈয়দপুর বাজার পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ওই রাস্তা নির্মানে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯লক্ষ ৯১হাজার টাকা। এ রাস্তা নির্মাণে বিভিন্ন অংশে ৬ইঞ্চি বালি, ৬ইঞ্চি খোয়া ও বালুর মিশ্রন এবং ৬ইঞ্চি শুধু খোয়া ধরা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সিডিউল মোতাবেক কাজ না করায় রাস্তার ফিটনেস ও দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বারুহাস রানীর হাট পাকা রাস্তা থেকে সান্ডা প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তার নির্মানে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০লক্ষ টাকা। এ কাজে পোচা ও নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া গাইড ওয়াল সিডিউল মোতাবেক না করায় ইতিমধ্যে ধঁসে পড়েছে। এলাকাবাসি নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের সময় বাধা দিলে তাদের বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দিলে ব্যাপক সংঘর্ষের আশংকা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় লোকজন নিয়ে বসে নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে ফেলে ভাল খোয়া দিয়ে রাস্তা করার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত করা হয়নি। গোন্তা হতে বস্তুল হাট রাস্তা কার্পেটিং কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩ লাখ টাকা। রাস্তাটি নির্মাণের নামে এলাকার লোক জনের নিকট অর্থের বিনিময়ে সংযোগ সড়কের নামে বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। জিওবি প্রকল্পের আওতায় তারুটিয়া হতে কাটাগাড়ি হাট রাস্তা মেরামত কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকা। ওই কাজে সিডিউল বহিভুত নিম্নমানের ইট ও খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে।
রাস্তা নির্মাণের নামে উপজেলার মাধবপুর মথুরাপুর রাস্তা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা এবং জিকেএস স্কুল থেকে শ্রীকৃষ্ণপুর রাস্তাটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সরকারী নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে ওই ২টি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার দুই দিকে কাচা এবং মাঝখানে পাকা করণ করা হয়েছে। এতে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা অপচয় করা হয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করেন। গুল্টা গোলাপুর বটতলা হতে উপর সিলট রাস্তা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬লক্ষ টাকা। নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন কাজটি ফেলে রাখা হয়েছে। এতে সাধারন মানুষের চলাচলের ব্যাপক সমস্যার সৃষ্ঠি হচ্ছে। নওগা জিসি হতে খালকুলা আরএইচডি ভায়া সাকুয়াদিঘী রাস্তাটি বিগত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে জিওবি প্রকল্পের আওতায় ০০ থেকে ৮৪০ মিটার এবং ৫১৪৪ থেকে ৬০৭৫ পর্যন্ত মেরামত করা হয়। একই রাস্তা বর্তমান ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহন করা হয়। যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭২ লক্ষ টাকা। একই রাস্তা ২বার প্রকল্প দিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ আলী সংশ্লিষ্ঠ উপ-সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ ইসমাইল হোসেনের নিকট ব্যাখ্যা চাইলে উপ-সহকারী ইসমাইল হোসেন অন্য রাস্তা করার পায়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নিয়োজিত উপ-সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ ইসমাইল হোসেন ইতিপুর্বে তাড়াশ উপজেলায় অর্থের বিনিময়ে রাস্তার নাম পরিবর্তন, মুল রাস্তার পরিবর্তে সংযোগ রাস্তা নির্মান, রাস্তার দিক পরিবর্তনসহ রাস্তার দৈর্ঘ্য পরিবর্তনেরও অভিযোগ রয়েছে। যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে। তাড়াশে আরও গুরুত্বপুর্ণ রাস্তা নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও অর্থের বিনিময়ে কম গুরুত্বপুর্ণ রাস্তা প্রকল্প দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে লাকী নামের এক ঠিকাদার কে দিয়ে তাড়াশের অনেক রাস্তা নির্মান ও মেরামত করা হচ্ছে। তিনি মুল ঠিকাদারের নিকট থেকে কাজ ক্রয় করে তা করছেন। আর এ কাজের জন্য সহযোগিতা করছেন তাড়াশের ভারপ্রাপ্ত এক উপসহকারী প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট সুত্র আরও জানাগেছে তাড়াশে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে যে সকল রাস্তা নির্মান করা হয়েছে তার প্রায় সকল রাস্তায় নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও নির্মান প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা জানান খোয়া না পাওয়া তারা নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করছেন।  এব্যাপারে তাড়াশ প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী সুভাষ দত্ত জানান, নিয়মনীতি ও সিডিউল মোতাবেক কাজ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশী প্রকল্প তদারককারী উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ ইসমাইল হোসেন টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন ঢাকা থেকে কাজ বের করে আনতে অফিসে খরচ দিতে হয়। নিম্নমানের মালামাল দিয়ে রাস্তা নির্মাণ ও মেরামত করার ব্যাপারে তিনি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি না করার অনুরোধ জানান। তাছাড়া অন্যান্য প্রকল্প সম্পর্কে তিনি আরও বলেন যে টুকু কাজ করা হয়েছে সেই টুকুর বিল দেওয়া হবে। উপজেলায় যে সকল প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে তার অধিকাংশ প্রকল্পই আপনি তদারকি করছেন সম্পর্কে বলেন উপজেলা প্রকৌশলী আমাকে যা দিয়েছে তাই করছি। সবাইকে বাঁচিয়ে রেখেই কাজ করতে হবে। উপ-সহকারী মোঃ রাশেদুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই।
তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ আলীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। জানাগেছে তিনি পবিত্র হজ্ব পালন করতে গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক্য এক ঠিকাদার জানান, উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ আলী যোগদান করার পর থেকে অফিস এলোমেলো হয়ে গেছে। তার নিকট কাজের চেয়ে টাকা বড়। টাকা ছাড়া তিনি কিছুই বোঝেন না। টাকা দিলে তার নিকট ভাল মন্দ বলে কোন কথা নেই।
এব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলার এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সচেঞ্জ) মোঃ মিজানুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন প্রকল্প গুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ