ঢাকা, রোববার 29 July 2018, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাতক্ষীরায় নার্সারীর কদর বাড়ছে বেকার যুবকরা স্বাবলম্বী

রফিকুল ইসলাম, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) থেকে: সাতক্ষীরা জেলায় নার্সারী করে স্বাবলম্বী হচ্ছে হাজারো বেকার যুবক। প্রতিবছর কয়েক লক্ষ বৃক্ষের চারা এ জেলা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এ জেলায় উৎপাদিত নার্সারীর কদর সারাদেশে। সাতক্ষীরা জেলায় ২০৪ জন পেশাদার বৃক্ষ প্রেমিকী সারা বছরই ফলদ,বনজ,ভেষজ,ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা উৎপাদন করে থাকে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এখানকার উৎপাদিত নার্সারী কোটি টাকা বেচা-কেনা হয়ে থাকে বলে নার্সারীর মালিকরা জানান। সাতক্ষীরা জেলার সদরে,  শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, নলতা, নাজিমগঞ্জ, রতুনপুর, তারালি, পারুলিয়া, ঝাউডাঙ্গা, কলারোয়া, পাটকেলঘাটা, ভোমরা সহ বিভিন্ন হাট-বাজারে কলম কেনা-বেচার ধুম পড়ে গেছে। জেলার বাহিরে থেকে পাইকারী ব্যবসায়ীরা এখন সাতক্ষীরাতে কলম কিনতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
ছায়া, বাতাস, জ্বালানি, আসবাবপত্র, ঘরবাড়ি তৈরী, পুষ্টি ও খাদ্যের প্রয়োজনে মানুষ বসত বাড়ির আশেপাশে রোপণ করছে প্রচুর ফলজ, বনজ, ও ভেষজ বৃক্ষের চারা। যতদিন যাচ্ছে উদ্যান উদ্ভিদের চারার চাহিদা ততই বাড়ছে। সাতক্ষীরা জেলাতে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য মানসন্মত নার্সারী। অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় নার্সারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও এ খাতকে এখনো দেওয়া হয়নি শিল্পের মর্যাদা। এর উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য নেয়া হয়নি কোনো প্রতিষ্টানিক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা। নেই এ শিল্পের দক্ষ জনশক্তি গড়ার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। ফলে সুবিধা বঞ্চিত এ পেশায় সংশ্লিষ্টরা।
জি এম আব্দুল্লাহ তিনি একজন নার্সরীর মালিক। ছোট বেলা থেকে নার্সারী করে আসছেন তিনি। বর্তমানে ১৫ বিঘা জমিতে তার বিভিন্ন ধরণের নার্সারী। প্রায় ২ লক্ষ গাছের চারা তার নার্সারীতে। সাতক্ষীরা শহরের টিবি হাসপাতাল সংলগ্ন মিয়াসাহেবের ডাঙ্গা জমিতে তার বেশি ভাগ নার্সারী। মায়া কানান তার নার্সারীর নাম। ২০১০ সালে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছ থেকে নার্সারীতে পুরুস্কার গ্রহণ করেন। এ ছাড়া জেলা উপজেলাসহ বিভিন্ন মেলাতে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রতি বছর ৩ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রায় ৫ লক্ষ টাকার গাছের চারা বিক্রি করেন তিনি। এ বছর তার ক্ষেতে মাল্টার বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিটা গাছে ম্ল্টা ধরে গাছ নুয়ে পড়েছে। জাম, জামরুল, পেয়ারা, লেবু, জলপাই, লিচুসহ বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ, ভেষজ, ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছে লক্ষাধিক কলম বেধেঁছে।  চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়াতে এ বছর তিনি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
সরকারীভাবে নার্সারীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সাতক্ষীরা জেলা নার্সারী মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল আমিন জানান, তাদের সমিতিতে ২০৪ জন নার্সারী মালিক রয়েছে। তিনি জানালেন, এক সময়ে এ পেশায় ব্যাপক লাভ হত কিন্তু বর্তমানে কোনো রকমে খরচটা উঠে। সরকারীভাবে তদারকী বৃদ্ধি ও নার্সারী মালিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলে এ খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
সাতক্ষীরা জেলাতে পাঁকা বাড়ির ছাদে নার্সারীর আবাদ শুরু হয়েছে। দিন দিন বাড়ছে এর জনপিয়তাও। 
সাতক্ষীরা শহরের উপকন্ঠের লাবসা এলাকায় চোখ জুড়ানো এ বাড়ির ছাদে বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শেখ মনিরুজ্জামান ও তার স্ত্রী শাহিনা আক্তার এটি গড়ে তুলেছেন। এই দম্পতি তাদের ৩ হাজার ২ শত বর্গফুট বাড়ির ছাদে কয়েক শত গাছ-গাছালির একটি বাগান গড়ে তুলেছেন।
তার ছাদে দেশি-বিদেশি ফুল, ফল, সবজি ও ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন। শেখ মনিরুজ্জামান-শাহিনা দম্পতি জানালেন, বাড়ির ছাদে বাগান করা খুব একটা কঠিন কাজ না। ইচ্ছে করলে যে কেউই ছাদে ফলমুল, শাক-সবজির বাগান করতে পারেন।
এতে করে শাক-সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কোন কোন পরিবার আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বী হতে পারে। পাশাপাশি মানুষের বেচে থাকার ক্ষেত্রে অক্সিজেন যোগায় গাছ-গাছালি।    
শাহিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হলেও সেই ছোটবেলা থেকে তিনি গাছ লাগাতেন। আমি স্কুলের টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে বাবার বাড়িতে বাগান করতাম। শ্বশুড় বাড়িতে এসে দেখি স্বামীরও বাগান করার শখ। দুই বৃক্ষ প্রেমিক মিলে শুরু করে দিলাম গাছ লাগানো।
সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে ও পরিবেশ সংরক্ষণে নার্সারীর গুরুত্ব অপরিসীম। নার্সারী হলো এমন একটি জায়গা যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফুল, ফল, সবজি, ভেষজ ও বনজ গাছের চারা ও কলম উৎপাদন করে বিক্রি বা বাজারজাত করার পূর্ব পর্যন্ত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা হয়।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশে নার্সারী শিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে। ১৯৭৪ সালের দিকে সাতক্ষীরায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে নার্সারী ব্যবসা চালু করা হয়। নব্বই দশকের শুরুতে এখানে হাতে গোনা কয়েকটি নার্সারী ছিল। বর্তমানে ছোট-বড় মিলে ৪ শতাধিক নার্সারী রয়েছে।
নার্সারী মালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, জেলাতে এখানে ৫ শ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। প্রায় হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নার্সারী ব্যবসার সাথে জড়িত। গত এক দশক ধরে সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও বনবিভাগের নার্সারী ছাড়াও বেসরকারী এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নার্সারী স্থাপনের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
এ জন্য নার্সারী উদ্যোক্তাদের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বনবিভাগ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেয় হচ্ছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। নার্সারী ব্যবসার সাথে পরিবেশ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, দারিদ্র্য বিমোচন সহ অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত রয়েছে। নার্সারী ব্যবসা করে জেলার বহু ভুমিহীন দরিদ্র মানুষ লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন।
সাতক্ষীরা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল মান্নান জানান, নার্সারী খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের কৃষি বিভাগ, বনবিভাগ সহ বিভিন্ন মন্ত্রনালয় চাষীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নিয়েছে। সাতক্ষীরায় নার্সারী মালিকদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে খোজ খবর নেয়া সহ বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ