ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আ’লীগের আস্থা সরকারি শক্তিমত্তার; বিএনপি’র লড়াই ভোট রক্ষার

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : আজ সোমবার রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এখানেও মূলত মেয়র পদে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। কাউন্সিলর পদে ওয়ার্ডভিত্তিক বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের প্রার্থীরা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগরীতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন দলের পাশাপাশি সরকারি ‘শক্তিমত্তা’ কাজে লাগানো সুযোগ পাচ্ছেন। অপরদিকে বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ভরসা কেবলই দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্য এবং সাধারণ ভোটারগণ। তিনি ভোট রক্ষার জন্য লড়াই করছেন বলেও জানা গেছে। এখানকার বিশ্লেষকদের মতে, ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন থেকে দুই মূল প্রতিপক্ষ দুই রকম অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাচ্ছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ চাচ্ছে, যে কায়দা ও কৌশল ব্যবহার করে এই দু’টি নির্বাচনে বিজয় অর্জিত হয়েছে সেগুলো রাজশাহীতেও প্রয়োগ করা যায় কি-না। অন্যদিকে, বিএনপি এসব অপকৌশলের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা ভাবছে। বিএনপি’র মতে, নগরীতে কোন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। নির্বাচন অফিস বলছে, সকলের সমান সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
ভোটের পরিসংখ্যান : রাজশাহী রিটার্নিং অফিস সূত্রে জানা যায়, রাসিক নির্বাচনে এবার মেয়র পদে প্রার্থী রয়েছেন পাঁচজন। এরা হলেন, বিএনপি’র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (ধানের শীষ), আ’লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (নৌকা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর শফিকুল ইসলাম (হাতপাখা), গণসংহতি আন্দোলনের মুরাদ মুর্শেদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমান হাবিব (কাঁঠাল)। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে মোট কাউন্সিলর প্রার্থী ১১২ জন। এর মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আছেন ১৬০ জন প্রার্থী এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর পদের প্রার্থী ৫২ জন। এবার রাসিক’র ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৮টি। এর মধ্যে ১১৪টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। গত শনিবার সকাল থেকেই নির্বাচনী এলাকায় র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় র‌্যাব ও বিজিবি টহল দিচ্ছে। র‌্যাব-৫-এর সূত্র জানায়, চার শতাধিক র‌্যাব সদস্য নগরীতে টহল দিচ্ছেন। ৩১ জুলাই পর্যন্ত তাঁদের মাঠে থাকার কথা। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হলে তা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাব মাঠে থাকবে। বিজিবি-১ ব্যাটালিয়নের সূত্র জানায়, নগরীতে ১৯ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এরা টহল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছেন। তাঁরা ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাঠে থাকবেন। রাজশাহী মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, নগরীতে ৩ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। পুলিশ সদস্যর পাশাপাশি আনসার বাহিনী কাজ করবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি যাতে ভঙ্গ না হয়, এ বিষয়ে সর্বাত্মক সতর্ক অবস্থানে পুলিশ থাকবে।
বিরোধীদের গ্রেফতার : রাসিক নির্বাচন ঘিরে গণগ্রেফতারের অভিযোগ উঠেছে। কোনো ওয়ারেণ্ট ছাড়াই ও বিনা কারণে রাজশাহীতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এছাড়া গ্রেফতার আতংকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের অনেকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি। এরই মধ্যে এই দু’টি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে এখন পর্যন্ত লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী চারজন মেয়র প্রার্থী। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তাদের অনেকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কার্যালয়ে একাধিকবার অভিযোগও দেয়া হয়েছে। তবে মহানগর পুলিশের দাবী, পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকেই গ্রেফতার করছে না। নির্বাচনের সাথে গ্রেফতারের কোনো সম্পর্ক নেই। নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ গ্রেফতার করছে।
নির্বাচন অফিসে বুলবুলের অভিযোগ : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে আজ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুরে রাসিকের কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে নেতাকর্মীদের বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার ও হয়রানির লিখিত অভিযোগ দেন বুলবুল। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। বুলবুল অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসব নির্যাতনের মধ্যে ধৈর্যের সঙ্গে আমরা গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছি। তাই কাফনের কাপড় মাথায় দিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাবো।’ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে বুলবুল বলেন, ‘গত দেড় মাস যাবত বিএনপি ও ২০ দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রাখা হয়েছে। শুধু নেতাকর্মী নয়, তাদের পরিবারকেও নির্যাতন মধ্যে রাখা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে মেয়র প্রার্থী বুলবুল তার দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বন্ধের দাবি জানান। এ সময় বিএনপি’র উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম সোমবার (৩০ জুলাই) সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু অযোগ্য কমিশন রাজশাহী সিটি নির্বাচন পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনসহ নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের ভাষ্য : অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন বিএনপি প্রার্থীর এ আশঙ্কাকে অমূলক এবং মিথ্যাচার ও অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, এখানে ভয় দেখানোর দরকার নেই। এমনিতে বিএনপির এজেন্ট-সংকট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রবল। তাই এজেন্ট হতে কেউ রাজি না-ও হতে পারে। রাজশাহী মহানগরীতে তার মেয়র থাকাকালে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মানুষ মনে রেখেছে। আগামীতে এই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে জনগণ তাকে আবারো নির্বাচিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএনপি’র পোলিং এজেন্টদের নির্দেশনা : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদেরকে ১৭ দফা নির্দেশনা দিয়ে আজ সোমবার সকাল সাতটার মধ্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দেয়া হয়েছে। এই নির্দেশনায় পোলিং এজেন্টদের ‘ইমান ও আখলাক’ এবং ‘দলের আদর্শের প্রতি’ শতভাগ অনুগত থাকতে বলা হয়েছে। ১৭ দফার ওই নির্দেশনায় পোলিং এজেন্টদের সারা দিনের করণীয় বলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রথমে ব্যালট বক্সের হিসাব নিতে হবে, ব্যালট পেপার ও সেন্টারের ভোটার সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, চিহ্নিত আওয়ামী কর্মী ভোট দেয়ার সময় কোনো অতিরিক্ত ব্যালট পেপার যেন বক্সে না ঢুকায়, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এতে আরো বলা হয়েছে, মনে রাখতে হবে, নৌকার ৮০টি ব্যালট পেপার ১০০ হিসাবে দেখানো হবে, আর ধানের শীষের ১২০টি ব্যালট পেপার ১০০ হিসাবে গণনা করা হবে। কোনো পুলিশ সিভিল ড্রেসে আসলে এবং আওয়ামী কর্মীর সঙ্গে জোর করে ব্যালট পেপার নিয়ে যেতে চাইলে ডাকাত বলে চিৎকার করে উঠতে হবে এবং বাইরের সাহায্য নিতে হবে। কোনো মতেই এক সেকেন্ডর জন্যও বাইরে বের হওয়া যাবে না। ভোট গণনার পর নতুন ধরনের ভোট ডাকাতি হতে পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। প্রতিটি বুথে ভোটসংখ্যা অনুযায়ী ব্যালট পেপার ও বক্স বুঝে নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ