ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তিন সিটিতেই আগাম জয়ের ঘোষণা আ’লীগের!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নির্বাচনের আগেই তিন সিটিতে আগাম জয়ের ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা এই জয়ের ঘোষণায় কোনো সন্দেহ-সংশয় রাখেন নি। সোজা সাপটাভাবে বলেই দিয়েছেন, তিন সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আজ সোমবার অনুষ্ঠিতব্য রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যে ভয়ঙ্কর একতরফার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেটি সরকারি দলের ঘোষণায় আরও স্পষ্ট হলো। তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে যদি সরকারি দল জয়ের ঘোষণা দিয়ে রাখে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছুই করার নেই। তারা তো যে কোনো মূল্যে বিরোধী নেতাকর্মীদের ভোট প্রদানে বিরত রাখবেই। তারা বলছেন, ক্ষমতাসীনদের আচরণে নির্বাচন একটি ঠাট্টা-তামাশার বিষয় হয়ে গেছে। সবাই যেন জানে কী নির্বাচন হবে!
সূত্র মতে, সোমবার অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদের বিজয় দেখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। গতকাল রোববার তার ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে একটি প্রতিষ্ঠানের করা জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে এই বিজয়ের কথা জানান তিনি। জয় লিখেছেন, ‘আমি যথেষ্ট আস্থা নিয়ে বলতে পারি, বরিশাল ও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় হবে। সিলেটেও আমরা সামান্য এগিয়ে। তবে সেখানে শক্ত প্রতিদ্বন্ধিতা হবে।’ জয় লিখেছেন, তিনি নির্বাচনের আগে রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরডিসি) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিন সিটিতে এ জরিপ করান। এই জুলাই মাসেই জরিপটি করা হয় বলে জানান জয়।
আরডিসির করা জরিপে দেখা গেছে, বরিশালে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৪৪ শতাংশ ভোটার। বিএনপির মুজিবুর রহমান সারোয়ারের প্রতি ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। আরডিসির করা জরিপে তিন সিটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি পেতে পারেন মোট ভোটের ৫৮ শতাংশ ভোট। আর বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পাবেন ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। জরিপের তথ্য অনুযায়ী সিলেটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ৩৩ শতাংশ ভোট পেতে পারেন বলে জানানো হয়েছে। আর বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী পাবেন ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। এই শহরে সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভোটারের সংখ্যা সবেচেয়ে বেশি, ২৩ শতাংশ। এই গবেষণার পদ্ধতি এবং জরিপের কৌশলগত নানা দিকও তুলে ধরেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি লিখেছেন, তিন সিটির ভোটার তালিকা ধরেই এ জরিপ হয়েছে। সেখানে আদমশুমারিতে জনসংখ্যার লিঙ্গভিত্তিক যে ধরন আছে, তার ওপর ভিত্তি করেই এ জরিপ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে থেকেই জরিপের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বিজয়ের ঘোষণা দিয়েছেন নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। গতকাল বিকেলে মাদারীপুরে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, তিন সিটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই বিজয়ী হবেন। তিন সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকেই ভোটাররা নির্বাচিত করবে। রাজশাহী, সিলেট, বরিশালে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই বিজয়ী হবেন।
আগাম জয়ের ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি বলেছেন, ৭০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পাবে নৌকা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রচারকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে বিএনপি আমাদের সম্পর্কে অপপ্রচার চালানোর কৌশল নিয়েছে। এখন পর্যন্ত তারা শতাধিক অভিযোগ করেছে। বলে বেড়াচ্ছে-ভোট করে কী হবে, নৌকা তো জিতেই আছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।’ তিনি বলেন, যতই তারা অভিযোগ দিক না কেন আমিই জয়লাভ করবো। জনগণ উন্নয়ন চায়।
আওয়ামী লীগের এমন ঘোষণার মধ্যেই ভোট ডাকাতির কথা বলেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গাজীপুর-খুলনার মতোই রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটিতেও ভোট ডাকাতি হবে। বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মীরা কেন্দ্রেই আসতে পারবেনা। তার আগেই ভোট শেষ হয়ে যাবে। রিজভী জানান, তিন সিটি কর্পোরেশনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো আলামত নেই। গাজীপুর ও খুলনায় নতুন মডেলের ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন কথা দিয়েছিল আগামী নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবে। কিন্তু তিন সিটি নির্বাচনে প্রচার শুরু হলে কমিশনের পুরনো চেহারা আবারও ফুটে উঠতে শুরু করে। তারা রাখঢাক না করে মুখোশের শেষ সুতোটুকুও খুলে ফেলেছে।
তিনি বলেন, গাজীপুর ও খুলনার ভোটের মতো নয়া সিস্টেমের ভোট ডাকাতি প্রত্যক্ষ করবে দেশবাসী। রিজভী বলেন, যেভাবে খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, নির্বাচনী এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল, ধানের শীষের নির্বাচনী এজেন্টদের এলাকাছাড়া করা হয়েছিল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে যেভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর রূপ দেখা যাচ্ছে তিন সিটি এলাকায়। তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে সরকারের দমননীতির উত্থান প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। বিএনপির এ নেতা বলেন, নির্বাচন এখন সরকারি সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত। সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলাই যেন এখন আওয়ামী লীগের প্রধান এজেন্ডা। গণতন্ত্রের সমাধি রচনা করেছেন শেখ হাসিনা। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন এখন স্বপ্নালোকে বিরাজ করছে।
সরকারি দল যখন বিজয়ের আগাম ঘোষণা দিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে তখন বিরোধী প্রার্থীরা ব্যস্ত নেতাকর্মীদের অভয় দেয়া নিয়ে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছেনা। গতকালও তিন সিটিতে বিরোধী নেতাকর্মীদেও গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজশাহী সিটির বিএনপি মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জানান, তার এজেন্টদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ আমাদের নির্যাতন করছে। ইতোমধ্যে ২৩-২৪ জন পোলিং এজেন্টকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদেরও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রশাসন-পুলিশ যেভাবে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছে, তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা কোনভাবেই করা যাবেনা।
এদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, আমাদের দলের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করার জন্য ডিএমপি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) থেকে ১৩৯ জন পুলিশকে সিলেটে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করে ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায়। তিনি বলেন, আমার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাককে পুলিশ নগরের মীরবক্সটুলা এলাকা থেকে প্রচারণা চালানোর সময় সাজানো মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে এসব বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েও লাভ হয়নি। সিলেটে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করছে না।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতাদের আগাম জয়ের ঘোষণায় এখন বিএনপিতে বিরাজ করছে ভয় ও শঙ্কা। এর পাশাপাশি এই তিন সিটি নির্বাচনে এখন পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকা বিএনপির এই শঙ্কা আরো বাড়াচ্ছে। মাঠে সরব উপস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করছে, পুলিশ যদি তাদের পক্ষে কাজ করে তাহলে ‘নো টেনশন’।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না সবার নজর এখন এই তিন শহরের ভোটের দিকে। এই তিন সিটি নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় শুরু হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা। তাই একই দিনে দেশের বড় তিন শহরের এই ভোটকে ঘিরে থাকছে বাড়তি নজর। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম এক দিনে বড় তিনটি নির্বাচন করছে ইসি। এই নির্বাচন থেকে ইসির সক্ষমতার একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তিন সিটিতে ইতিমধ্যে পুলিশ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। রাজশাহীতে বিএনপির কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিলেটে পরিবেশ যা একটু ভালো ছিল, সেখানেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। নির্বাচন একটি ঠাট্টা-তামাশার বিষয় হয়ে গেছে। সবাই জানে কী নির্বাচন হবে।
আওয়ামী লীগের সূত্র জানায়, তিন সিটিতে তারা যে শঙ্কা তৈরী করতে পেরেছে এটিই তাদেও বড় পুঁজি। এছাড়া মামলা ও গ্রেফতারে রতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ফলে খুলনা ও গাজীপুরের মতো এই তিন সিটিতেও বিএনপি ভোটের দিন মাঠে থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ