ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আজ ভয়-শংকা আতংক আর অসমতার নির্বাচন বরিশালে

শাহে আলম, বরিশাল অফিস : বরিশাল সিটি কার্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গতকাল বিকাল ৩টা নগরীর একটি রেষ্টুরেন্টে ইসলামী আন্দোলন আর নিজ বাসভবনে বিএনপি প্রার্থী এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার এ সংবাদ সম্মেলন করেন। তারা সিটি নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন। নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার বলে উল্লেখ করেন। প্রশাসন এবং বহিরাগত দিয়ে এই পাতানো নির্বাচনে জনগণের ভোটের প্রতিফলন হবেনা বলে বিএনপি প্রর্থী এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার অভিযোগ করেন।
ধানের শীষ প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, আমরা আগেও বলেছি এই নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছে আমরা তার কথা বিশ্বাস করে নির্বাচন করছি। এখন কি দেখছি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সরকারী দলের প্রার্থী হাজার হাজার লোক রাস্তায় জড়ো করে নির্বাচনী করেছে। আর আমরা দলীয় কর্মীদের নিয়ে গনসংযোগ ও প্রচার কাজে বের হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ আমাদেরকে ব্যাড়িকেড দিয়ে আটকে দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, বিজিবি মোতায়েন করা হচ্ছে কার স্বার্থে কার নিরাপত্তায়? সরকারী দল বরিশলের সকল জেলা ও থানা থেকে বহিরাগত দলীয় ক্যাডার জড়ো করে নির্বাচনী কেন্দ্র ভাগ করে দেওয়ার খবর পেয়েছি। তারা ভোট ডাকাতি করে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নিতে প্রস্ততুতি নিচ্ছে। তাদেরকে আইন শৃংখরা রক্ষাকারী বাহিনী চ্যালেঞ্জ না করে আমাদে নেতাকর্মীদের বাড়ী ছাড়া করছে। জনগনের মধ্যে ভয় শংকা আর আতংক বিরাজ করছে।
সরোয়ার আরো এসময় বলেন এই দিন দিন না আরো দিন আছে এই দিন নিয়ে যাবে সেই দিনের কাছে। আমরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে শ্রদ্বা করে বলছি আইন কি শুধু ধানে শীষের প্রার্থীর বেলায় কার্যকর করার জন্য সরকার বলেছে। পুলিশ দিয়ে অত্যাচার চালিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংশ করা হচ্ছে। এমন দিন আসবে যেদিন এদেশের জনগণ কোনো আইন মানবে না। তারা গণতন্ত্র উদ্বারের জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসবে তা প্রতিরোধ করতে পারবেন না। তাই তিনি নির্বাচনের দিন জনসাধারনকে তাদেরকে নিরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে এই অত্যাচার জুলুমের জবাব দেয়ার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান (মাহবুব) বলেছেন, সরকারকে বলবো ৩০ জুলাই (সোমবার) একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করুন। মুখে মুখে শান্তিপূর্ণ ভোটের কথা না বলে নিশ্চিত করুন যাতে প্রত্যেকটি ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পারে এবং যাকে খুশি তাকে দিতে পারে। রোববার বিকেল ৩টার দিকে বরিশাল নগরের সদর রোডের চায়না প্যালেস রেস্তোরাঁয় ইসলামী আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরিশাল মহানগরের সেক্রেটারি মাওয়ালা জাকারিয়া হামিদী।
এদিকে আজ ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দী প্রর্থীদের মধ্যে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগই প্রধান। বরিশালের বাস্তবতায় এটা বিএনপির ঘাটি হিসাবে পরিচিত। আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক ভাবে কোন নির্বাচনে এই নগরীতে বিজয়ী হতে দেখা যায়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায় নগরীর মোট ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিএনপি সমর্থক আর বাকী অন্যসব দলের। এই বাস্তবতায় এখানে নির্বাচন আসলে বিএনপি পন্থীদের খুব বেশি ভাবনা করতে হয়না। কিন্ত এবারের চিত্র ভিন্ন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং সমকালীন সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সর্বেইবো প্রশ্নবিদ্য। সদ্য সমাপ্ত খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনে যে চিত্র উঠে এসেছে বরিশালে তার চেয়ে সতর্ক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যাতে করে মানুষ বুঝতে পারলেরও টের নাপায়। এরকম সতর্কতা অবলম্বন করে প্রশাসনযন্ত্র নির্বাচনের প্রস্ততুতি সম্পন্ন করেছে বলে অনকেটাই নিশ্চিত।
২৮ জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত ছিল সর্বশেষ প্রচারের সময়। এদিন বিকেল ৩ টায় ধানের শীষ প্রতিকের এ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার তার দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে গণসংযোগ বের করলে প্রশাসনের বাঁধায় প- হয়ে যায়। অপরদিকে সরকার সমর্থক নৌকা প্রতীতের সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ প্রায় একই সময় বিশাল শো-ডাউন করেছে। যাকে অ।নেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজয় মিছিল বলে আখ্যায়িত করে না। এমতবস্থায় অন্য আরো চার মেয়র প্রর্থী নির্বাচন কমিশনের কাছে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের অভিযোগ এবং অসম আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিরোধী মেয়র প্রার্থীরা সংবাদ মাধ্যমেও তাদের অভিযোগ এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
অপরদিকে সরকার দলীয় নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচার প্রচারণায় বরিশালসহ সারা দেশের অনেক নেতাকর্মী অংশ নিয়ে এখনও নগরীতে অবস্থান করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল ভিভাগের আওয়ামী পন্থী জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়ররা তাদের সরকারী গাড়ি ব্যবহার করে প্রচারে অংশ নিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এক্ষত্রে নির্বাচন কমিশন কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করে উল্টো বিরোধী প্রার্থী ও কর্মী সমর্থকদের উপর আইনের খড়গ চালিয়ে পক্ষপাতিত্ব করেছেন বলেও অভিযোগ।
নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন-সামগ্রী বিতরণ শুরু
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আজ অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে ভোটগ্রহণের জন্য বরিশালে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন ও নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। রোববার দুপুর ২টা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, অমোছনীয় কালি, স্ট্যাম্প, প্যাড ও সিলসহ ভোটের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে নির্বাচনী সামগ্রী হাতে পেয়ে কর্মকর্তারা তা নিয়ে যানবাহনযোগে স্ব-স্ব কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সিটি নির্বাচনের রিটার্নি কর্মকর্তা মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেছি। আমরা কেন্দ্রের ভোটের মালামাল বিতরণ শুরু করেছি যা আজকের মধ্যেই সব ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাবে। এছাড়া আমাদের ঢাকা থেকে পর্যবেক্ষক এসেছেন, তারাও নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শন করছেন।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সিটি করপোরেশন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ২২ জন সদস্য এবং অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এসবের মধ্যে ১০ জন শুধু লাঠি ধারী আনসার বাকিরা সবাই অস্ত্রধারী। এর বাইরে র‌্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও বিজিবি নির্বাচনী মাঠে থাকবে। কোনোটা থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে, কোনোটা থাকবে মোবাইল ফোর্স হিসেবে। আর এই মোবাইল ফোর্সের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে।
তিনি আরো বলেন, প্রতি দুই ওয়ার্ডে এক প্লাটুন করে বিজিবি থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে র‌্যাবের একটি করে টিম থাকবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। তবুও যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত যে সব অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে কিছু কিছু ঘটনায় সত্যতা পাওয়া গেছে আবার কোনোটায় পাওয়া যায়নি। যেগুলো পেয়েছি সেগুলোর ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পোলিং এজেন্টদের বিষয়ে তিনি বলেন, পোলিং এজেন্টদের তালিকা এখন পর্যন্ত কেউই পায়নি। তাহলে তাদের কীভাবে বাধা দেওয়া হবে। অনেক প্রার্থী রয়েছেন এরা পোলিং এজেন্ট না দিয়েও এমন অভিযোগ করেন। তাই বিষয়গুলোর ওপর খেয়াল রাখা হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৩০ জুলাই বিসিসির চতুর্থবারের নির্বাচনে ১২৩টি ভোট কেন্দ্রের ৭৫০টি কক্ষের জন্য ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। যা বিকেল ৩টা থেকে বিতরণ করা হবে। এছাড়া মোট ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১টিতে ৭৮টি কক্ষে ভোটগ্রহণের জন্য ইভিএম মেশিন দেওয়া হবে। বরিশাল সিটি নির্বাচনে মোট দুই লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন ভোটারের মধ্যে এক লাখ ২০হজার ৭৩০ জন নারী ও এক লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ জন পুরুষ রয়েছেন। নির্বাচনে এবারে মেয়র পদে লড়ছেন সাতজন এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৯১ জন ও সংরক্ষিত আসনে ৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ১৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ২ হাজারের অধিক, র‌্যাব সদস্য ৩ শতাধিক এবং আনসার থাকবে ২ হাজারেরও বেশি। এছাড়াও নির্বাচন চলাকালীন সময় ৫৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১০ জন জুডিশিয়াল হাকিম দায়িত্বে থাকবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ