ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুই বাসের রেষারেষিতেই থেমে গেল কলেজ শিক্ষার্থী মিম-রাজীবের স্বপ্ন

গতকাল রোববার রাজধানীর খিলক্ষেতে বিমানবন্দর সড়কে দুটি বাস পাল্লা দিয়ে চালানোর সময় একটি বাস সড়ক দীপে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলে ২ জন নিহত ও অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। ঘটনার প্রতিবাদে অন্য শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ছুটি হয়ে যাওয়ায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ১৫/২০ জন শিক্ষার্থী এমইএস বাসস্ট্যান্ডে মিরপুর ফ্লাইওভারের মুখে দাঁড়িয়েছিল। গতকাল রোববার দুপুর আনুমানিক সোয়া ১২টায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস ওই ফ্লাইওভারের মুখেই দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু পেছন থেকে একই পরিবহনের দ্রুতগতিসম্পন্ন আরেকটি বাস ওভারটেক করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটির সামনে টার্ন নিয়ে ঢুকতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিমিষেই দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায় বাসটি। কেউ  চাকার নিচে পিষ্ট হয় কেউবা ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যায়। ২০ থেকে ২৫ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দেন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, সব যেন দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল। কী থেকে কী হয়ে গেল। বাসে বসেই শিক্ষার্থীদের হাসাহাসি-খুনসুটি দেখছিলাম। কিন্তু পেছন থেকে আসা জাবালে নূরের আরেকটি বাসের রেষারেষিতেই নিমিষেই পড়ে যায় কান্নার রোল।
পেছন থেকে আসা বাসের যাত্রী রিপন বলেন, এমন ঘটনা আর কখনো দেখিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আহাজারি শুনতে হলো। কান্নার আওয়াজ আর জটলা দেখেই বাস থেকে নেমে পড়ি। কাছে যেতেই দেখি রক্তের গঙ্গা বইছে। দৌড়ে আসে অন্য ছাত্রছাত্রীরা। দৌড়ে আসে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে সেনা কর্মকর্তা ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তিনি বলেন, আমার দেখে মনে হলো, পেছনের বাসটি সামনের বাসটিকে আটকে দিতে চেয়েছিল। দ্রুতগতিতে টার্ন নিয়ে সামনে ঢুকতেই যাত্রীদের উপর উঠে পড়ে বাসটি।
পুলিশ জানায়, বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসে যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এ সময় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবদুল আহাদ জানান। নিহতরা হলেন- শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মানবিক শাখার দ্বাদশ শ্রেণির আবদুল করিম এবং একাদশ শ্রেণির দিয়া খানম। আরও আটজনকে আহত অবস্থায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার এএসআই রেজাউল ইসলাম বলেন, জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের কাছে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার পাশেই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। “ঘটনার সময় শিক্ষার্থীরা র‌্যাডিসনের গ্যাপ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, অনেকে বাসের জন্য ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস শিক্ষার্থীদের চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই দুইজনের মৃত্যু হয়।”
ট্রাফিক পুলিশ ও ক্যান্টনম্যান্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, রেডিসন ব্লু হোটেলের সামনের বিমানবন্দর সড়কে ওই দুর্ঘটনায় ১৪ জন শিক্ষার্থী হতাহত হয়েছে। এদের মধ্যে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিম রাজীবকে গুরুতর অবস্থায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট সজীব জানান, নিহত দুজনসহ মোট পাঁচজনকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। বাকিদের সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সেনাসদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, এখানে প্রায় দিনের মতো আজও ডিউটিতে ছিলাম। নিজের চোখে যেন কেয়ামত দেখছিলাম। কীভাবে একটি বাস আরেকটি বাসকে আটকাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ওপর উঠে গেল! বাসটির চালক ও হেলপার চাইলেই এই দুর্ঘটনা হতো না। কিন্তু তারা দ্রুতগতিতে ওভারটেক করতে গিয়েই দুর্ঘটনাটি ঘটালো।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত দিয়া খানম মিমের বাবার নাম জাহাঙ্গীর আলম। তাদের বাড়ি মহাখালী দক্ষিণপাড়ায়। অন্যদিকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিমের বাবার নাম মৃত নূর ইসলাম ও মা মহিমা বেগম। তাদের বাড়ি উত্তরা আশকোনা এলাকায়।
দুর্ঘটনার পর রাস্তা অবরোধ করে অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ জনতা ও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বাসে আগুনও ধরিয়ে দেয় । ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিপুলসংখ্যক ট্রাফিক ও ক্রাইম ডিভিশনের পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষার্থী নিহতের পর শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা হোটেল রেডিসন ব্লুর সামনে রাস্তা অবরোধ করে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় যানবাহন ভাঙচুর শুরু করে। শিক্ষার্থীরা ঘাতক বাস দুটিসহ জাবালে নূরের পাঁচটি বাস ভাঙচুর করে। এ ছাড়া তানজিল, বিআরটিসি, ভূঁইয়া পরিবহন ও বেশ কয়েকটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সর্বশেষ বিকেল সাড়ে ৩টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) প্রবীর কুমার দাস বলেন, সহপাঠী নিহতের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ এবং ভাঙচুর করে। এ সময় মহাখালী থেকে উত্তরা রোড়ের দুই দিকে যানজট দেখা দেয়। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিকের পাশাপাশি উত্তরা ও গুলশান জোনের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। দুই শিক্ষার্থী নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। আরও দুই-তিনজন মারা গেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে। তবে এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি।
কুর্মিটোলা হাসপাতলের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মঞ্জুর আল মোরশেদ জানান, দুর্ঘটনার পর মোট ১৪ জনকে তার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বাকি ১২ জনের মধ্যে আটজনকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি শাহান হক বলেন, তারা সবাই ওই কলেজের শিক্ষার্থী।
কুর্মিটোলা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল মো. ছগির মিয়া জানিয়েছেন, দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে একজন ছাত্র ও আরেকজন ছাত্রী। 
নিহত ছাত্রীর নাম নিশ্চিত করে তার বান্ধবীরা জানিয়েছেন, দিয়ার বাড়ি মহাখালী দক্ষিণপাড়ায়। সে একাদশ শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবার নাম জাহাঙ্গীর আলম। অন্যদিকে, আব্দুল করিম ওরফে সজীব ওরফে রাজু কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়তো বলে জানা গেছে।
গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল আহাদ জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। ঘটনাস্থল থেকে বাসচালক ও তার সহকারীকে (হেলপার) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার খবর পেয়ে কলেজটির শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও জনতা এ ঘটনায় ইসিবি চত্বরের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং আরও অর্ধশতাধিক বাস ভাঙচুর করে। এতে বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে সড়কটিতে যান চলাচল শুরু হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ