ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইমরান খান এবং চীন ও ভারতের সম্পর্ক

আশিকুল হামিদ : ইচ্ছা ছিল পাকিস্তানের নির্বাচন এবং বিশেষ করে নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সম্পর্কে লেখার। সাবেক ক্রিকেটার এবং বহু রসাত্মক গালগল্পের নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে সামনে এসে যাওয়া ইমরান খানের ব্যাপারে আগ্রহের কারণ ছিল ভারতের প্রতি তার মনোভাব এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপ। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হলে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হতে পারে- সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা। এর কারণ, ‘শত্রু রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের নাগরিক ও রাজনীতিক হলেও একজন খেলোয়াড় হিসেবে অনেক ভারতীয়র সঙ্গেই ইমরান খানের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে। ভারতে তার জনপ্রিয়তাও কম নয়। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী হলেই তিনি অন্য পাকিস্তানি সরকার প্রধানদের মতো অন্ধ ভারতবিদ্বেষী হবেন না। চাইলেও হতে পারবেন না।
নির্বাচনের আগে ইমরান খান নিজে কিন্তু অন্য রকম ধারণা দিয়েছিলেন। প্রচারণা চালানোর সময় দেয়া বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি এমনভাবে মোদি নয়, ‘নরেন্দ্র মোডি’ বলেছেন এবং তাকে তুমি তথা ‘তুম’ ও ‘তুমহারা’ বলে তুলোধুনো করেছেন, যা শুনে মনে হয়নি যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে অবস্থায় আদৌ কোনো শুভ পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের পরে ইমরান খান অবশ্য কিছুটা হলেও কথা ও সুর পাল্টেছেন। তিনি ভারতের সঙ্গে আলোচনা ও বন্ধুত্বের কথা বলেছেন, কিন্তু কাশ্মীর প্রশ্নে ইঞ্চি পরিমাণও সরে আসেননি। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সময়ও প্রকারান্তরে ভারতকে তিনি হুমকিই দিয়েছেন। চীন যে পাকিস্তানের পাশে রয়েছে এবং যে কোনো যুদ্ধ বা সংকটে পাকিস্তানের পাশেই থাকবে- সে কথাটা যথেষ্ট জোর দিয়েই ভারতকে শুনিয়েছেন তিনি। তার ইঙ্গিতও যথেষ্ট স্পষ্টই ছিল।
ইমরান খানকে নিয়ে এভাবে শুরু করার বিশেষ কারণ রয়েছে। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটি প্রবাদের কথা। অন্যের জন্য গর্ত বা কুয়া খুঁড়লে তার মধ্যে নিজেকেই পড়তে হয় বলে এদেশেই বহুল আলোচিত এক প্রবাদবাক্য রয়েছে। আর গর্ত বা কুয়ায় পড়লে হাত-পা ভাঙার পাশাপাশি কাদাপানিতে অতি সুন্দর শরীরের অবস্থাও হাস্যকর হয়ে পড়ে, যা দেখে অন্য মানুষেরা হাসাহাসি করে। তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতেও ছাড়ে না।
কথাটা হঠাৎ শুনলে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর কারণ সৃষ্টি করেছে ভারত। তার পেছনে আবার ‘অবদান’ রেখেছে গণচীন। বেশ কিছুদিন ধরেই খবরটি শোনা যাচ্ছিল। সম্প্রতি সে খবরকেই প্রাধান্যে এনেছেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের  রাজ্য পর্যায়ের নেতারা, যাদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। দেশটির রাজধানী দিল্লিতে দেয়া এক বিবৃতিতে কংগ্রেসের এই নেতা জানিয়েছেন, তাদের ‘শত্রু প্রতিবেশি’ চীন বিশাল এক বাঁধ নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। চীন সেই সাথে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং যথেষ্ট প্রশস্ত টানেল বা খালও খনন করে চলেছে। এই টানেলের মধ্য দিয়ে চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাবে জিন জিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায়।
এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের পানি ভারত আর আগের মতো পাবে না। পানির প্রায় সবটুকুই বরং চলে যাবে চীনের দখলে। বাঁধটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর কৃষি ও চাষাবাদ ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, এসব রাজ্য সেচের জন্য প্রধানত ব্রহ্মপুত্রের পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর আসাম যে সর্বনাশের মুখে পড়বে সে কথাটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তরুণ গগৈ। বলেছেন, পানির সংকটে পুরো রাজ্যই স্বল্প সময়ের মধ্যে শুকিয়ে যাবে। আসামের পাশাপাশি ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের ভবিষ্যৎও অন্ধকারের দিকেই এগোবে বলেও সাবধান করে দিয়েছেন সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সেই সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চীনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে কোনো সমাধান বের করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দাবি জানিয়েছেন।
বিজেপি-বিরোধী কংগ্রেসের নেতা হলেও তরুণ গগৈয়ের ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এবং চীনের বাঁধ ও টানেল নির্মাণ সংক্রান্ত বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এমনকি বিজেপির অনেক নেতাও। এটাই স্বাভাবিক। কেন না, ব্রহ্মপুত্রের উৎস তিব্বতে এবং চীনে এর নাম সাংপো। ভারত রয়েছে চীনের নিচের দিকে, যেমনটি বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ‘ভাটিতে’। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রের পানি ভাটির তথা নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলেই ভারত এতদিন নদটির পানি পেয়ে এসেছে- যেভাবে বাংলাদেশ এক সময় পেতো ভারত থেকে নেমে আসা গঙ্গা এবং অন্য ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি। সব নদ-নদীর পানিই ভারতের পর বাংলাদেশ হয়ে গিয়ে পড়তো বঙ্গোপসাগরে।
অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে ফারাক্কা ও টিপাইমুখসহ ভারতের নির্মিত অসংখ্য ছোট-বড় বাঁধের কারণে। পানির তীব্র অভাবে ‘নদীমাতৃক’ বাংলাদেশে এখন মরুকরণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাঁধের ভয়ংকর কুফল সম্পর্কে নিজেরা জানেন বলেই চীনের বাঁধ ও এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতারা। অন্ধকার ভবিষ্যতের একই চিন্তায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বিজেপি ও কংগ্রেসসহ সকল দলের নেতাদের মধ্যেও। খবরে জানা গেছে, ‘চীনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিআইএমও প্রধানমন্ত্রীর কাছে চীনের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
এটাই অবশ্য যে কোনো দেশের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের কর্তব্যÑ যার ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশে দেখা যায়। আর সে কারণেই ভারত গঙ্গাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার সুযোগ পেয়েছে। বঞ্চিত করে চলেছেও। ঘটনাক্রমিক প্রতিবাদ জানানো ছাড়া কোনো দলের পক্ষ থেকেই ভারতের এই পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন করা হয় না। ক্ষমতায় গিয়েও কোনো দলই ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না। এ অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভারত তার আগ্রাসনকে ক্রমাগত আরো ভয়ংকর করে চলেছে। ভারত এমনকি বারবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও এখনো তিস্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। সহজে করবে বলেও মনে করার মতো সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়নি। ভারতের এই পানি আগ্রাসনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বহু নদ-নদী অনেক আগেই ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নদী খালের রুগ্ন রূপ নিয়েছে আর খালগুলো গেছে সম্পূর্ণ শুকিয়ে। এককালের ‘প্রমত্তা’ পদ্মার বুকে পর্যন্ত ছেলেপেলেরা এখন ফুটবল খেলে। মানুষ একজন অন্যজনকে বলে, এইখানে আগে একটি নদী ছিল!
এ পর্যন্ত এসে পাঠকদের মনে হতে পারে যেন ভারতের পানি আগ্রাসনই আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু। অন্যদিকে আমার উদ্দেশ্য এশিয়ার এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত ও গণচীনের সম্পর্ক নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা করা। ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে তিক্ততা কোনদিকে কতটা গড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হলেও জানিয়ে রাখা দরকার, দেশ দুটির সম্পর্ক কিন্তু ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই ঘনিষ্ঠ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। চীন ও ভারত ১৯৬২ সালে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। মাঝপথে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থেমে গেলেও ভারতকে সেবার লজ্জাকর পরাজয় বরণ করতে এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে জওয়াহেরলাল নেহরু এবং লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সমাজতন্ত্রের নামে প্রতারণাপূর্ণ কৌশল নিয়েও কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে তিক্ততার অবসান ঘটাতে পারেননি। কাশ্মীর প্রশ্নে চীন এখনো পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা পাল করে চলেছে। চীন এখনো ভারতের রাজ্য অরুণাচলকে নিজের ভূখন্ড বলে মনে করে। রাজ্যটি চীনের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানায়। এর বাইরেও দীর্ঘ সীমান্তের অসংখ্য এলাকায় দেশ দুটির সেনারা মাঝেমধ্যেই যুদ্ধে  জড়িয়ে পড়ছে। এই তো মাত্র মাস কয়েক আগে, চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেও ডোকলাম সীমান্তে ছোটখাটো যুদ্ধ করেছে চীন ও ভারত। ওই এলাকায় এখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে জানা যায়। এভাবেই এগিয়ে চলেছে চীন ও ভারতের অবন্ধুসুলভ তথা শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক। এরই মধ্যে গত বছর ২০১৭ সালের আগস্টে দু’দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই ‘যুদ্ধ’ ব্যবসা-বাণিজ্যের সীমা ছাড়িয়ে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও অশুভ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ভুটান সংলগ্ন ভূখন্ড ডোকলামের মালিকানা নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলমান তীব্র উত্তেজনাকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে ভারত আগস্টে এসে হঠাৎ ৯৩টি চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক তথা অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করেছে। এর ফলে ভারতে চীনের রফতানিই কেবল অনেক কমে যাবে না, বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওদিকে নিজেদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারত সরকার অভিযোগ করেছে, দেশটির বাজারে বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চীন নাকি তার উৎপাদন খরচের চাইতেও কম মূল্যে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে। এর ফলে একদিকে ভারতে চীনা পণ্যের বিক্রি বাড়ছে অন্যদিকে ক্রমাগত কমছে ভারতীয় পণ্যের বিক্রি। এভাবে ভারতের দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে এবং ক্ষতি স্বীকার করতে গিয়ে অনেক শিল্প-কারখানা এমনকি বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। এসবের মধ্যে মোবাইল ফোনের মতো বেশি প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি ইস্পাতের তৈরি ভারি অনেক পণ্যও রয়েছে। মূলত দেশীয় পণ্যকে নিরাপত্তা দেয়ার অজুহাত দেখিয়ে অতীতেও ভারত চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে দেখেছে। কিন্তু পরিস্থিতিতে উন্নতি হয়নি। সে কারণেই ৯৩টি পণ্যের ওপর নতুন করে এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার।
অন্যদিকে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভারতকে ‘ভয়াবহ কুফল’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে চীন। দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের মুখপাত্র গ্লোবাল টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের এ ধরনের ‘দুর্বল সিদ্ধান্তের জন্য’ চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ সাময়িকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সত্য, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ কুফল ভোগ করার জন্য ভারতকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।
চীনা পণ্যের ব্যাপারে ভারতের নেতিবাচক ও শত্রুতাপূর্ণ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির কমিউনিস্ট সরকার চীনা কোম্পানিগুলোকে ভারতে বিনিয়োগ করার এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর আগে দ্বিতীয়বার ভেবে দেখার এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এককেন্দ্রিক কঠোর কমিউনিস্ট সরকারের অধীনস্ত বলে চীনের কোনো কেম্পানির পক্ষেই সরকারকে পাশ কাটিয়ে ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা উৎপাদনসহ ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। তেমন অবস্থায় বন্ধ হয়ে যাবে ভারতে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত অসংখ্য চীনা শিল্প-কারখানা এবং চাকরি হারাবে হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর। শুল্কবিরোধী প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এ বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে চীন।
দেশ দুটির অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডোকলামকেন্দ্রিক সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত। কারণ, চীনে ভারতের রফতানি কমেছে ১২ দশমিক তিন শতাংশ তথা এক হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য হলো, রফতানি কমলেও একই সময়ে চীন থেকে ভারতের আমদানি বেড়েছে প্রায় দুই শতাংশÑ মার্কিন মুদ্রায় যার পরিমাণ পাঁচ হাজার নয়শ’ কোটি ডলার। অর্থাৎ একদিকে ভারতের আয় কমেছে এক হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার, অন্যদিকে কমার পরিবর্তে উল্টো চীনের আয় বেড়েছে পাঁচ হাজার নয়শ’ কোটি ডলার! জানা গেছে, এমনিতেই ভারতের তুলনায় চীন চার হাজার সাতশ’ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করে থাকে।
এমন অবস্থায় ভারত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করলে এবং সিদ্ধান্তটি বজায় রাখলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে কমিউনিস্ট দেশটিকে। জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন যদি ভারতে চীনা কোম্পানিগুলোর শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেয় এবং চীনের শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা যদি আর বিনিয়োগ না করেন তাহলে ভারতীয় শ্রমিকরা তো চাকরি হারাবেই, অন্য অনেকভাবেও ভারতকে যথেষ্ট পরিমাণে খেসারত দিতে হবে।
এজন্যই ডোকলামের দখল ও মালিকানাকেন্দ্রিক সংকটের ঘটনাপ্রবাহে ভারতের প্রতি সংযম দেখানোর আহ্বান এসেছে বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। ভারতে আশ্রিত চীনের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা একথা পর্যন্ত বলেছেন যে, যুদ্ধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে চীনা বৌদ্ধদের আরো বেশি সংখ্যায় তীর্থে আসার সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে ভারতের উচিত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং শান্তি বজায় রাখা। যুদ্ধ শুরু হলে চীন ও ভারতের কেউই জিততে পারবে না বলেও মন্তব্য করেছেন দালাইলামা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দুই বিরাট প্রতিবেশি রাষ্ট্র চীন ও ভারতের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ডোকলামের দখল ও মালিকানা নিয়ে চলমান সংকট সকল বিচারেই অত্যন্ত আশংকাজনক। প্রায় তিনশ’ কোটি জনসংখ্যার কারণে শুধু নয়, উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলেও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কামনা করে। প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও চায় চীন ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যাতে সংঘাতমুখী না হয়। বাংলাদেশের মানুষ আশা করে, ডোকলাম সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য উভয় দেশই উদ্যোগী হয়ে উঠবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে দু’ দেশের বাণিজ্য যুদ্ধের অবসান ঘটবে। এশিয়ার এ অঞ্চলের জন্য তো বটেই, বিশ্বশান্তির জন্যও চীন ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া ও বন্ধুত্বপূর্ণ থাকা দরকার।
এ প্রসঙ্গেই ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের নির্মিত বিশাল বাঁধ এবং জিন জিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলকেন্দ্রিক সমস্যাকে সামনে আনা দরকার। এ ব্যাপারে চীনের সঙ্গে  বৈঠকে বসারও আগে ভারতের উচিত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার পানি আগ্রাসন বন্ধ করা এবং বাংলাদেশকে গঙ্গা ও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়া। তেমন অবস্থায়ই ভারত চীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার আশা করতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নীতি-সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ডে পরিবর্তন না করে তাহলে চীন এমনকি এ বিষয়টিকেই ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি হিসেবে হাজির করার সুযোগ নিতে পারে। অমন সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতেই নিবন্ধের শুরুতে বলতে হয়েছে, ‘অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে...!’ এখন দেখা দরকার, ভারত ঠিক কোন পথে পা বাড়ায় এবং আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের দাবি ও বক্তব্য ‘ব্রহ্মপুত্রের জলে’ ভেসে যায় কি না! তাছাড়া পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভূমিকা দেখার জন্যও যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গেই অপেক্ষা করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ