ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রবাসে বাংলাদেশীদের সামাজিক অবস্থা

আখতার হামিদ খান : [তিন]
এতে করে তাদের ভেতর সন্দেহ ও অবিশ্বাসের শক্ত দেয়াল গড়ে ওঠে। অন্যদিকে টাকা দেয়া নতুন স্বামী-স্ত্রীরা আমেরিকায় আসতে না পেরে তাদের আত্মীয়-স্বজনের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করে। এমন অবস্থায় স্ত্রী তার পাতানো ডিভোর্সের প্রাক্তন স্বামী ও চার সন্তানের জনককে বাড়ি থেকে বের করে দেন। বিদেশী এক যুবককে গ্রিন কার্ডের টোপ দেখিয়ে একত্রে বসবাস শুরু করেছেন। এ অবস্থায় তাদের স্কুলগামী সন্তানরা অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। গৃহ থেকে বিতাড়িত প্রাক্তন স্বামী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে অনেকের রুমমেট হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তার রাত কাটছে কখনো মসজিদে। কখনো সাবওয়েতে। বৃস্টলে গ্রোসারী শপের ব্যবসা আছে সাহেদ আলীর। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে ও দেশে আছেন। দু-চার বছর পরপর দেশে ফেরেন। শেষ বয়সের ঠিকানা দেশের মাটিতে গড়ে তুলতে চান। স্ত্রীর ইচ্ছাও তাই। ছেলে-মেয়েরাও দেশে থাকতে পছন্দ করে। অর্থবিত্ত পেলেও সাহেদ আলীর হৃদয়ে প্রবাসজীবনের দুঃখ কাঁটা রয়ে গেছে। এক ছেলে এক মেয়ে। আলাদা আলাদা থাকে। ছেলের ক্যাটারিং সার্ভিসের ব্যবসা। খ্রিস্টান ধর্ম মতে বিয়ে করেছে এক শ্বেতাঙ্গীনীকে। চার বছর সংসার করার পর এক কন্যাসন্তান রেখে স্ত্রী চলে গেছে আরেক পুরুষের সঙ্গে। মেয়ে টেলিফোন বিভাগে চাকরি করে। এক ইহুদি যুবকের সাথে একই ফ্ল্যাটে থাকে। পরিণত বয়সে পৌঁছানোর পর সে দেশের আইন অনুযায়ী সন্তানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো শাসনের দেয়াল তোলার ক্ষমতা বাবা-মায়ের থাকে না। কথা প্রসঙ্গে সাহেদ আলী জানান, প্রতিটি প্রবাসী পিতামাতা চেষ্টা করেন সন্তানদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে। একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশে সামাজিক মূল্যবোধ লালন ও ধারণ করা সম্ভব হয়। টিভি-ইন্টারনেটের যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতির মুক্ত হাওয়ায় খুব বেশিদিন তাদের আটকে রাখা সম্ভব হয় না। অসহায়ের মতো তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা মেনে নেয়া ছাড়া বাবা-মায়ের আর কিছু করা হয়ে ওঠে না। প্রবাসে বিয়ে উপযোগী ছেলে-মেয়েদের পাত্র-পাত্রী খুঁজে পাওয়া রীতিমতো সমস্যার ব্যাপার। আবার দেশ থেকে বিয়ে করিয়ে নিয়ে গেলেও উদ্ভূত হয় আরেক সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলে পাওয়া গেল। বিয়ের পর পাত্রকে নিয়ে যাওয়া হলো বিদেশে, কনের কাছে। সেখানে গিয়ে পাত্রকে কর্মক্ষেত্রে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে হয়। পাত্রী সেই পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে পেশাগত ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই স্বামীর চাইতে এগিয়ে থাকেন। এ নিয়েও সৃষ্টি হয় আরেক ধরনের সামাজিক সমস্যা। সাহেদ আলী জানান, এ ধরনের পরিস্থিতি প্রবাসীদের মাঝে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এ কারণে অনেক সচেতন প্রবাসী অভিভাবক এখন পরিণত বয়সে পৌঁছানোর আগেই সন্তানদের দেশে পাঠিয়ে দেন। নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারার মতো উপযুক্ত হলে নিজেরাই ঠিক করে নেয় কোথায় হবে তার ঠিকানা-স্বদেশে না কি পরবাসে?
তরুণ প্রজন্মের ক্ষয়িষ্ণু চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে আরো একটি সাম্প্রতিক ঘটনায়। অন লাইনে ১৪ বছরের বালককে যৌন সঙ্গমে প্রলুব্ধ ও নিজের রুমে আসার আহ্বান জানানোর অভিযোগ পুলিশ ভ্যালহাল্লাস্থ নিউইয়র্ক মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র জাহিদ ইকবাল (২৪)-কে গ্রেফতার করেছে।
ওয়েস্টচস্টার ডিস্ট্রিক্ট এটর্নী জেনিন পিরোর উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদে প্রকাশ, একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ১৪ বছরের বালক ভেবে অভিযুক্ত ইকবাল আমেরিকা অন লাইনে চাটরুম কথোপকথনে তাকে যৌন সঙ্গমে প্রলুব্ধ ও নিজের রুমে আহ্বান জানায়। গোয়েন্দা কর্মকর্তা এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের পরিচয় তুলে ধরেন। তাকে বিচারের জন্য সোপর্দ করা হয়। আমেরিকায় ইন্টারনেট অপরাধীচক্রের যে ৩৯ জনকে আটক করা হয়েছে ইকবাল তাদের একজন। ইকবাল আমেরিকার নিউজার্সির বাসিন্দা। দোষী সাব্যস্ত হলে ৪ বছরের কারাদ-ের আশঙ্কা আছে। এ অপরাধের জন্য তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ চলছে।
বিড়ম্বনার আরেক দিক : অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই মানুষ দেশান্তরী হয়। প্রিয়জন, আবাসভূমি ছেড়ে পাড়ি জমায় পরবাসে। নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থভাগ্য ফিরলেও অপূর্ণতার ছোঁয়া রয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই। পর্যাপ্ত অর্থে প্রয়োজনের অনেক কিছুই মেলে। এই ‘অতিরিক্ত’ বিষয়টি অনেকাংশে কাল হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক-অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি জটিল আরো অনেক বিষয় এসে যোগ হয়। ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ও ডেকে আনে। যেমন ফ্লোরিডা প্রবাসী আইনুলের পরিবারে সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয় তিনি দেশ ছাড়ার পর। দেশ ছেড়েছেন চার বছর আগে। এখনও গ্রীন কার্ড হাতে পাননি। অভিবাসন সংক্রান্ত আইনগত ঝামেলায় আছেন। এগুলো শেষ না করে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। একবার ফিরলে আর কখনও কোনোভাবে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা যাবে না। এসবের পাঠ চুকিয়ে তিনি দেশে ফেরার কথা ভাবেন। প্রতি মাসে দেশে নিয়মিত টাকা পাঠান। মোটা অংকের টাকা। এই টাকায় চলছে দুই সন্তান, স্ত্রী, বৃদ্ধ মা এবং ছোট বোনের সংসার। টাকা নিয়ে সংসারে বিরোধ।
অতিরিক্ত অর্থের কারণে খরচের বাহুল্য খাত বেড়ে যায়। সবার প্রয়োজন এবং দাবির খাত এত বেশি বেড়ে যায় যে, প্রত্যেকের নামে নামে খাত ভাগ করে দেবার পরও সঙ্কট কমে না। বরং বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে সৃষ্টি হয় পারিবারিক বিরোধ। স্বামীর সঙ্গে আলাপ করে মিসেস আইনুল শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে আলাদা সংসার পাতেন। এরপর থেকে তাকে নিয়মিত স্ত্রী ও মায়ের জন্য ভিন্ন খাতে টাকা পাঠাতে হয়। আর্থিক ভাবনা না থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে সমস্যা সৃষ্টি হয় সন্তানদের নিয়ে। বাবা বিদেশে থাকে বলে ছেলেমেয়েদের বায়না সমবয়সীদের চাইতে অনেক বেশি। পূরণ না হলে তাদের স্বভাব বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সন্তানদের ব্যাপারে দিশেহারা হয়ে ওঠেন মিসেস আইনুল। স্বামীর কাছে পরিস্থিতি জানানোয় পুরো দায় তার ওপর ফেলা হয়। ওদিকে মা-বোনের সংসারে চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। গ্রামের গরীব আত্মীয়-স্বজনের দায়দেনা উদ্ধারে দায়িত্ব নিয়েছেন মা। এই তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ হয়। প্রবাসে থাকার কারণে শিক্ষিত ও সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও বোনকে দেখতে আসা পাত্ররা বাড়তি কিছু চেয়ে হাত কচলায়। এ ছাড়া নিকটাত্মীয়, বন্ধু স্থানীয়দের বিপদ-আপদ বার্তা অনিয়মিতভাবে ফ্লোরিডায় পৌঁছে যায়। সব মিলিয়ে মি. আইনুলের অভিজ্ঞতা হচ্ছে- আমরা, প্রবাসীরা হচ্ছি মরা গরু। অনেক শকুন-শকুনীর প্রয়োজনের দায় মেটানোই আমাদের কাজ। নইলে খুবলে খুবলে খাবে। এর বাইরে আনন্দের কোনো জীবন নেই।
স্বামী প্রবাসী। স্ত্রী পরকীয়ায় ব্যস্ত। এ ধরনের উদ্বেগজনক সংবাদ মাঝে মাঝে পত্রিকায় স্থান পায়। এ ধরনের প্রবণতার ব্যাপৃতি যতবেশি, সংবাদ হয়ে আসে তার ছিটেফোঁটা। সামাজিক অবক্ষয়ের দিকটি অনিবার্য হয়ে ওঠে স্বজন পরবাসে থাকার কারণে। রাজধানীতে একটি ভাবীচক্রের কথা শোনা যায়। এদের সবার স্বামী বিদেশে থাকেন। ওদিক থেকেই যোগাযোগ। একের কাছ থেকে অন্যরাও স্বামীর সংবাদ পান নিয়মিত। এই ভাবীচক্রের সবাই পরকীয়া প্রেমে ডুবেছেন। একজনের বন্ধুর কথা আরেকজনে জানে। নিজেদের ভেতর কোনো সমস্যা দেখা দিলে অন্যে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। ডেটিংয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করে। ভাবীচক্রের দর্শন হচ্ছে, বয়স তো বসে থাকবে না। অযথা সময় ফুরিয়ে লাভ কী? মানসিক নির্ভরতার জন্য তো একজন কাছের মানুষ দরকার। নিজের মানুষটি দূরে চলে গেলে কাছে থাকে কে? এ ধরনের আরো অনেক বাস্তব যুক্তি ভেঙে ফেলছে অনেক প্রবাসী দম্পতির সোস্যাল কমিটমেন্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ