ঢাকা, সোমবার 30 July 2018, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মৎস্য চাষের ভূমিকা

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : নদী মাতৃক বাংলাদেশে রয়েছে মৎস্য চাষের ঐতিহ্য। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ লক্ষ দিঘী পুকুর ছড়িয়ে আছে যার বেশির ভাগেই সনাতন পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ হচ্ছে। একটু চেষ্টা করলেই, যতœ নিলেই  এসব জলাশয় বা দিঘী পুকুরে অধিক হারে মৎস্য উৎপাদন করা সম্ভব। অতীতে এদেশে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ শুধু আহরণ করা হতো। চাষ করা হতো না। বর্তমানে বাংলাদেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমিষের উৎস মাছ আর আগের মত সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশে সকল অঞ্চলে মাছ চাষের প্রসার ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর আধুনিক মৎস্য চাষের কলা-কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছেন।
বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় পুষ্টি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে মৎস্য চাষ। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। প্রায় ২০ লক্ষ লোক সার্বক্ষণিকভাবে এবং ২ কোটি লোক খন্ডকালীন ভাবে অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ লোক তাদের জীবিকা অর্জনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্যে নিয়োজিত আছেন। দেশে রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮.৮০ শতাংশ আসে এই সেক্টর থেকে যা বৈদিশীক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থান। জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ এবং কৃষি সম্পদ থেকে আয়ের প্রায ২০ শতাংশ মৎস্য সম্পদের অবদান।
আমাদের বাংলাদেশে মাছের যে প্রাচুর্যতা এবং বহুমুখীতা রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে প্রাণীজ আমিষের অভাব দূর করা সম্ভব। এছাড়া ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে মাছ চাষের বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে বদ্ধ জলাশয়, পুকুর থেকে মৎস্য উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু নদী-নাল, খাল-বিল প্রভৃতি মৎস্য থেকে উৎপাদন মোটেই আশা ব্যাঞ্জক নয়। অথচ অতীতে এই সকল উৎস হতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো।
বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের মধ্যে বিলের সংখ্যা কত এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও মোট অভ্যন্তরীণ জল সম্পদের ৬% এর আওতাভুক্ত জরীপ করলে এর পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। দেশের প্রতিটি জেলাতেই ছোট এবং বড়  বাৎসরিক ও মৌসুমী বিল রয়েছে যে গুলির আকার ১ হেক্টর থেকে শুরু করে ১০০ হেক্টর বা তার উর্দ্ধেও হতে পারে। এই বিল গুলিকে চাষের আওতায় আনার জন্য সরকার ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা করলে বিলে মৎস্য চাষের মাধ্যমে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
মানুষ এখন অধিক চর্বি ও কোলেস্টরল যুক্ত মাংস গ্রহণ কমিয়ে দিয়ে অধিক মাত্রায় মাছ গ্রহণের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। এর ফলে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই দিন দিন মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে মৎস্য জাতীয় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে থাকে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলি যার অধিকাংশই এশিয়ায় অবস্থিত যা আমাদের জন্য সত্যিই আশা ব্যাঞ্জক। বাংলাদেশের সামগ্রীক অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান দুটি ভিন্ন ধারায় বিন্যস্ত। প্রথমটি দেশের অগণিত মানুষের প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে যা সাধারণ দৃষ্টিতে খুব একট মূল্যায়ন হয় না। অপরটি সরাসরি বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে যা অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। প্রকৃত বিচারে প্রথমটির জন্য দৈনিক প্রাণীজ আমিষের চাহিদা মেটানো সত্যিই বিরাট কঠিন কাজ। এখন পর্যন্ত চাষ ও আহরণগত মাছ মিলিয়ে দেশের প্রাণীজ  আমিষের শতকরা ৭০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয় মাছ থেকে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে মৎস্য চাষিরা নানা রকম রাসায়নিক ও কীটনাশক দ্রব্য দিয়ে মাছ চাষে সম্পৃক্ত হওয়ায় মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হতে চলেছে এবং মানুষের শরীরের এই সব কীটনাশক মারাত্মক বিষক্রীড়ার উদ্ভব হচ্ছে। মানুষের মৎস্য চাষে সঠিক জ্ঞান না থাকায় দেশের মানুষ বাধ্য হয়েই এ সকল ঝুঁকি পূর্ণ মৎস্য জাত দ্রবাদি দিয়ে তাদের প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণে বাধ্য হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সমস্ত জাতি স্বাস্থ্য ঝুঁকির দিকে ধাবিত হচ্ছে যা এখনো অধিকাংশ মানুষের ব্ধোগম্য হচ্ছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরণের শারীরিক ও মানসিক অসুবিধাসহ মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ মাছ ও মৎস্য জাত দ্রব্য বিদেশে রপ্তানীর মাধ্যমে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে সেখানেও এসব দ্রব্যাদি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে রাসায়নিক পর্দাথের ব্যবহার ও গুণগত মান বজায় না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই বাজারে অন্যান্য দেশ সেই স্থান দখল করে নিচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশের আপামর জনসাধারণের স্বাস্থ্য রক্ষার মাধ্যমে একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনের অংশ হিসেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য চাষ ও আহরণ উভয় ক্ষেত্রেই জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্ঠা চালাতে হবে। আমাদের দেশে এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতাকে জয় করতে হবে যা রাতারাতি সম্ভব নয় এবং সেখানে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন।
দেশের সৎস্য সম্পদের উন্নয়ন করতে হলে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রচুর জল মহালের দরকার। প্রযুক্তি যেও আছে জলমহাল রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে। যতদিন না প্রযুক্তি ও জলমহাল সংশ্লিষ্ট এক মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত এই সম্পদের উন্নয়ন অসম্ভব। পাশাপাশি এই মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের জন্য এই পেশায় নিয়োজিত মৎস্য জীবিদের উন্নয়ন প্রয়োজন। কেন না উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন। পেশাজীবীদের উন্নয়ন এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন।
এই লক্ষ্যে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও মৎস্যজীবিদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্য জীবি জেলে সমিতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে অদ্যাবধি বিভিন্ন জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন, মৎস্য আইনের  বাস্তবায়ন ও মৎস্য জীবীদের সু-সংগঠিত করার  লক্ষ্যে ৯৭টি বেসিক সেমিনার, প্রায় ৩০০টি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও মৎস্যজীবীদের সচেতনতার লক্ষ্যে বিভিন্ন পোষ্টার, লিফলেট প্রকাশ করে যাচ্ছে। এ সংগঠন আশা করে বাংলাদেশের এই অফুরন্ত পানি ও উর্বর মাটি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন সম্ভব।
জাতীয় উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের ভবিষ্যত ক্রান্তিকালে এ সেক্টরই দিতে পারে দেশ ও জনগণকে তুলনামূলক সহজভাবে খাদ্য, অর্থ, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা। সুস্থ, সবল, সুঠাম, বুদ্ধিদীপ্ত, মেধাবী ভবিষ্যত প্রজন্ম উপহার দেয়ার পিছনে এ সেক্টর অমূল্য অবদান রাখতে পারে। কারণ খাদ্য তালিকায় মানুষের জন্য প্রাণীজ আমিষের বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই। এই প্রাণীজ ও আমিষ বলতে গেলে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য আর এর সিংহভাগ সরবরাহ করছে এ সেক্টর। বাংলাদেশে মৎস্য চাষের বিভিন্ন বিষয়ে বিগত দশকে বিপুল গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকাশনা থেকে জানা  যায় যে, এ যাবত মাছ চাষ বিষয়ে  ৩০টিরও বেশী প্রযুক্তি বের করা সম্ভব হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এ সকল প্রযুক্তির কার্যকর ও ফলপ্রসু সম্প্রসারণ প্রয়োজন। আর এ জন্য প্রয়োজন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য  অধিদপ্তরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। আমিষের ঘাটতি পূরণ, বেকারত্ব দুরীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আর্থ সামাজিক আন্দোলন হিসেবে মৎস্য সেক্টরকে গড়ে তোলার জন্য বিগত ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতি বছর জাতীয় মৎস্য পক্ষ পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান ১৮ জুলাই থেকে এক সপ্তাহের জন্য সারা দেশে মৎস্য সপ্তাহ পালন হচ্ছে। ২৮ জুলাই ওই দিন মৎস্য সপ্তাহ সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা যায়। দেশীয় প্রজাতির মৎস্য সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ অভিযান ২০১৮ এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছেঃ
“স্বয়ং সম্পূর্ণ মাছে দেশ
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ