ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিমানবন্দর ও মিরপুর সড়ক অবরোধে অচল রাজধানী নৌমন্ত্রীকে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম

বাস চাপায় সহপাঠী হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে গতকাল সোমবার রাজধানীর কুর্মিটোলায় শহীদ বীর বিক্রম রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল সোমবার বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেছেন কলেজটির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ফলে সড়কের দুই পাশ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই ঘটনায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করেন। তাঁদের সঙ্গে আশপাশের আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা মিরপুর রোড অবরোধ করেন। ফলে রাজধানীর ব্যস্ততম দুটি সড়ক শিক্ষার্থীরা অবরোধ করায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। এই দুই সড়কের যানজট অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ে। বিকেল চারটার দিকে অবরোধ সরিয়ে নেয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বাসচাপায় প্রাণহানির ঘটনায় রোববার রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করছেন নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানমের (মিম) বাবা জাহাঙ্গীর আলম। এর আগে দুপুরের দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। নিহত দুই শিক্ষার্থী হলো শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মিম (১৬)।
বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
বাসের নিচে চাপা পড়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের এলাকায় শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের দুই দিক অবরোধ করে রাখে বলে ক্যান্টনমেন্ট থানার এসআই উম্মে সালমা জানিয়েছেন।
এদিকে বেলা ১২টার দিকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করে তাদের তুলে দেয়।
নিউ মার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, “বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বাস ভাঙচুর করলে পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়।”
ক্যান্টনমেন্ট থানার এসআই উম্মে সালমা বলেন, এঘটনায় রোববার রাতে দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম জাবালে নূর পরিবহনের বিরুদ্ধে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিয়াদ আহমেদ বলেন, “এই ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার আছে। এখন শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে কলেজে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
পুলিশ জানায়,সড়ক অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে । ফলে বিকেল চারটা থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সকাল থেকে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে রাখলেও দুপুর দেড়টার দিকে শেওড়া রেলগেটে রেললাইনের উপরে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তাজনিত কারণে দুপুর দেড়টা থেকে ঢাকার সঙ্গে সব ধরনের রেল চলাচল বন্ধ রাখে রেল কর্তৃপক্ষ। পরে দুপুর সাড়ে তিনটার পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানান ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোজাম্মেল হোসেন। এরপর হোটেল র‌্যাডিসনের সামনে থেকে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়া হলে বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিকেল চারটা থেকে বিমানবন্দর সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল শুরু হয় বলে জানিয়েছেন ডিসি ট্রাফিক প্রবীর কুমার রায়।
এর আগে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং বেপরোয়া গাড়ি চালকদের ফাঁসির দাবিসহ ৯ দফা দাবি জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটার দেয় আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি হচ্ছে,বেপোরোয়া ড্রাইভারকে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর গতকালের বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকাতে স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে, থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবে না। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
স্তানীয়রা জানায়,গতকাল সোমবার সকাল ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের সামনের রাস্তায় মানববন্ধনে দাঁড়াতে গেলে পুলিশের বাধায় শুরুতে কর্মসূচি পন্ড হয়ে যায়।এরপর কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে রাস্তা অরবোধ করতে গেলে সেখান থেকেও ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের সামনে ফের জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
 বলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসে বিক্ষোভে অংশ নিতে থাকে। দুপুর ১২টা নাগাদ বিএএফ শাহীন কলেজ, ভাষানটেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট, তেজগাঁও কলেজ, বাংলা কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বিমানবন্দর সড়কের উভয় পাশ বন্ধ করে দেয়।
অবরোধে অচল ঢাকা
শিক্ষার্থীদের অবরোধে অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা ও আশেপাশের সড়ক যোগাযোগ। সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের কারণে বিভিন্ন রুটের যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। ফলে শহরজুড়ে তৈরি হয় তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে নাকাল সাধারণ মানুষ। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা  ৯ দফা দাবি আদায়ে সাতদিনের আলটিমেটাম দিয়েছে। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নৌমন্ত্রীকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে বলে জানিয়েছে। গতকাল সোমবার  দুপুর পৌনে ১টায় আন্দালনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী শাহীন সিফাত সংবাদ সম্মেলন করে এ আলটিমেটাম ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়ে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও বাটা সিগন্যালের আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। অন্যদিকে সকাল থেকে বিএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা শাহীন কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীসহ আশপাশের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে তারা নৌমন্ত্রীর রোববার দেওয়া বক্তব্যের নিন্দা জানান। শিক্ষার্থীদের দাবী, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রীকে এই বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
সড়ক অবরোধে রাজধানীর বিমানবন্দর, মিরপুর, মহাখালী, নিউ মার্কেট, পল্টন, শাহবাগ, রামপুরা, ফার্মগেট ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। যানজট প্রধান সড়ক ছাড়িয়ে এলাকার অলিগলি পর্যন্ত ছেয়ে গেছে। এতে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য বাসা থেকে বের হওয়া যাত্রীরা পড়েছেন তীব্র যানজটে। যাত্রীরা বলছেন, টানা দু-তিন ঘণ্টা ধরে বাসে বসে থাকলেও মিলছে না গন্তব্যের দেখা। এমনকি দেড় দুঘণ্টা ধরে বাসও নড়াচড়া করছে না বলে হতাশা জানান যাত্রীরা।
যাত্রাবাড়ী থেকে মোহাম্মদপুরগামী পরিবহন ট্রান্সসিলভার যাত্রী অরুণ বিশ্বাস বলেন, ‘গুলিস্তান থেকে সাড়ে দশটায় বাসে উঠেছি। সোয়া ১১টায় প্রেসক্লাবের সামনে এসে গাড়ি এসে থেমেছে, এখন সাড়ে বারোটা বাজলেও বাসের নড়াচড়া দেখছেন না। তিনি উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, আন্দোলন তো যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু দুপুর ১টায় কৃষি মার্কেট এলাকায় একটা ইন্টারভিউ ছিল। এখন মনে হয় তা আর দিতে পারবো না। কারণ, শুনেছি সাইন্সল্যাবে শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করেছে।’
গুলিস্তানে রানা নামে একজন যাত্রী বলেন, ‘আমি সকাল দশটায় বাসা থেকে বের হয়েছি সদরঘাট হয়ে চাঁদপুর যাওয়ার জন্য। কিন্তু বিহঙ্গ গাড়ি করে শেওড়া পাড়া পর্যন্ত এসে দেখি গাড়ি আর যাচ্ছে না। দেখলাম গাড়ির দীর্ঘ যানজট। এক দিকে রাস্তা কাঁটা ছেঁড়া, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এ কারণে পাঠাও-তে গুলিস্তান পর্যন্ত এসেছি’।
পল্টন মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ রিয়াজ রায়হান বলেন, সকাল থেকেই যানজট। আমাদের কিছুই করার নেই। আন্দোলনের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত যানজটে তিনি নিজেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ অবরোধ তুলে নিতে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের বোঝানো হচ্ছে।
২ বাসচালক  ২ সহকারী গ্রেফতার
দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে দুই বাসচালক ও দুই সহকারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ঘটনাস্থলে পাওয়া তিনটি বাসে আগুন দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এসব বাসের কোনটির চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে তা তদন্তে জানা যাবে। “তবে এসব বাসের চালক এবং সহকারীদের গ্রেপ্তার অভিযান চালানোর পর্যায়ে দুইজন চালক এবং দুইজন সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” তবে তাদের নাম-পরিচয় এবং কখন তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেননি এই র‌্যাব কর্মকর্তা।
২ শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ
বাসচাপায় নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক সপ্তাহের মধ্যে তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। জাবালে নূর পরিবহন কর্তৃপক্ষকে এই ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণের অর্থ নিহতদের পরিবার পেল কিনা তা নিশ্চিত করে পরবর্তী শুনানির দিন ১২ অগাস্ট প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বিআরটিএকে।
নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গতকাল সোমবার এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেয়।
এর আগে দুপুরে হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনস্বার্থে এই রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্র সচিব, সড়ক পরিবহন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকার পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক), বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি এবং জাবালে নূর পরিবহন কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়।
আইনজীবী কাজল বলেন, মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক রুলস কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে অথবা নতুনভাবে আইন প্রণয়ন করে গণপরিবহনের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেপরোয়া গাড়ি চালকদের নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না এবং শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের নিহত শিক্ষার্থী আব্দুল করিম ও দিয়া খানম মিমের পরিবারকে দুই কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত। একই সঙ্গে ওই দুর্ঘটনায় হতাহতদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফরিদা ইয়াসমিনকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেয়।
দুর্ঘটনায় জাবালে নূর পরিবহনের দায় নির্ধারণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালককে প্রধান করে আদালত তিন সদস্যের কমিটি করে দিয়েছে বলে জানান আইনজীবী কাজল। কমিটিতে ঢাকার অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) এবং বিআরটিএর চেয়ারম্যান সদস্য হিসেবে থাকবেন। তাদেরকে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া গণপরিবহনের চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হয় এবং সড়কে চলাচলকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বিআরটিএকে। এই প্রতিবেদনটিও দিতে হবে আগামী ১২ অগাস্ট।
মামলার প্রতিবেদন ৫ সেপ্টেম্বর
জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় দুই কলেজশিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম এইচ এম তোয়াহা এজহারটি গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন রোববার রাতে নিহত শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে মামলা করেন। ক্যান্টনমেন্ট থানায় এ মামলা নং ৩৩।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি কাজী সাহান হক বলেন, মামলার আসামী অজ্ঞাত। তবে মামলার এজহারে দুর্ঘটনার জন্য জাবালে নূর বাসের চালক ও চালকের সহকারীকে দায়ী করা হয়েছে।

বাস চাপায় নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ : রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত শিক্ষার্থী দিয়া আক্তার মিম ও আব্দুল করিমের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ লাখ টাকা করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক সপ্তাহের মধ্যে জাবালে নূর পরিবহনের মালিককে এই টাকা দিতে বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে বাসচাপায় আহতদের চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করতে জাবালে নূর পরিবহনের মালিক ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেন।
রুলে নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে দুই কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে যাত্রী সাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়েছেন আদালত। এ ছাড়া কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে বিআরটিএ বাস-ট্রাক চালকদের লাইসেন্স প্রদান করে রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব, সড়ক পরিবহন সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, বিআরটিএর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে রিটকারী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফরিদা ইয়াসমিন।
রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আহতদের যথাযথ চিকিৎসার বিষয়ে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এর আগে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় আহতদের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের খোঁজ নিতে বলেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মৌখিকভাবে এই আদেশ দেন।
শুনানির শুরুতে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বাসচাপা দেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি নিজেই জনস্বার্থে এ বিষয়ে আবেদন করেছি। আবেদনে বাসচাপা দেওয়ার ঘটনার যথাযথ তদন্ত, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা ও নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছি।’
আদালত বলেন, ‘আপনি আপনার আবেদন এফিডেভিট আকারে আদালতে দুপুর ২টার পরে উপস্থাপন করুন।’
গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের সামনে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের শেষ প্রান্তে দুই বাসচালকের রেষারেষিতে প্রাণ হারায় দুই কলেজছাত্র। আরো কয়েকজন আহত হয়। তাদের পাশের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
নিহত দু’জন হলো শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আবদুল আহাদ ও ডিএমপির ট্রাফিক উত্তরের উপকমিশনার প্রবীর কুমার দাস জানান, মিরপুর-উত্তরা রোডের জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস মিরপুর থেকে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে আসছিল। এ সময় ফ্লাইওভারের শেষ দিকে, রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একদল শিক্ষার্থী। বাসটি ফ্লাইওভার থেকে নেমেই দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। আহত হয় আরো বেশ কয়েকজন।
খবর পেয়ে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ এমইএইচ বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে খিলক্ষেত পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে দুই পাশের সড়কে শতাধিক যানবাহনের গ্লাস ভাঙচুর করে এবং জাবালে নূর পরিবহনের দু’টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। গতকাল সোমবারও রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর সড়ক অবরোধ বিক্ষুব্ধ সহপাঠীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ