ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘জাবালে নূর’ কারো ধার ধারে না

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর ‘মিরপুর থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর’ ও ‘মিরপুর থেকে গুলশানের নতুন বাজার’-এই দু’টি রুটে যাত্রী পরিবহন করে ‘জাবালে নূর’ পরিবহন। এই দু’টি রুটে তাদের মিনি বাসের সংখ্যা ৬০টির মতো। সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আর্শীবাদ নিয়ে তার এক নিকটাত্মীয়ের মালিকানার অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই নগরীর রাজপথ দাপিয়ে বেড়ায় জাবালে নূর পরিবহন। এই পরিবহনের মালিকদের প্রভাবের কারণে চালক, কন্ডাক্টার আর হেলপারসহ সকল শ্রমিকদের কাছেই পনবন্দী হয়ে আছেন যাত্রী সাধারণ। মন্ত্রীর আর্শীবাদের কারণে গাড়ির চালক ও হেলপারদের দাপট চরমে। অন্য পরিবহনকে তারা তোয়াক্কা করে না। কথায় কথায় হুমকি দিয়ে বলে, ‘এটা মন্ত্রীর গাড়ি’। তারা কারও কোনো ধার ধারে না। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন রুটের একাধিক পরিবহনের চালক, হেলপার ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে, রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে রোববার দুপুরের দিকে কলেজ শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়া ঘাতক বাস জাবালে নূরের (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯২৯৭) চালকের নাম-পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য জানেন না পরিবহনটির চেয়ারম্যান জাকির হোসেন। গতকাল বাসটির চালক ও হেলপারদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে খোঁজখবর নিয়ে শুধু চালকের নাম সোহাগ বলে জানাতে পারলেও হেলপারদের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেননি।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে আব্দুল্লাহপুর-মিরপুর ও মিরপুর-নতুন বাজার রুটে জাবালে নূর পরিবহনের ৬০টি গাড়ি চলে। এ দুই রুটের অন্য বাসচালকদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে কথা বলে এ গাড়ির চালকরা। বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যেখানে-সেখানে পার্কিং, ওভারটেকিং সবই প্রভাবের সঙ্গেই করে জাবালে নূর পরিবহনের চালকরা।
রোববার দুপুরের দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। তারা হলেন শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ওরফে সজীব ও একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মিম।
এ ঘট্নায় অভিযুক্ত চালক বা হেলপারের নিয়োগপত্র কিংবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নন জাবালে নূর পরিবহনের চেয়ারম্যান জাকির হোসনে। তবে তিনি জানান, লাইসেন্স অবশ্যই থাকার কথা। কারণ, লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালককে তারা গাড়ি দেন না।
জাকির হোসেন বলেন, ‘চালক অপরাধ করেছে। সে জন্যই আমরা তাকে র‌্যাবের হাতে তুলে দিয়েছি। দোষ করে থাকলে তার অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। আমরা কখনও বেপরোয়া গাড়ি চালানোকে সমর্থন দিই না।’
তাদেরকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘আসলে তারা তো আমাদের পারমানেন্ট (স্থায়ী) কোনো কর্মচারী না। তারা এই আছে, এই নেই। এই আসে, এই যায়। এ জন্য তাদের বিস্তারিত কোনোকিছু রাখা হয় না। তবে চাকরি দেওয়ার আগে তাদের একটা সিভি (বায়োডাটা) রাখা হয়। রেজিস্টার খাতায় নাম উল্লেখ রাখা হয়।’
হেলপারের কোনো তথ্য নেই তার কোম্পানির কাছে। এসব কারণে দুর্ঘটনা বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটিয়ে চালক ও হেলপাররা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া এই বাসটির চালক চুক্তিভিত্তিক বাস চালাতো বলে জানা গেছে। চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় চালকের বিস্তারিত কোনো তথ্য কোম্পানির কাছে নেই। কেননা এ ধরনের চালকরা ট্রিপভিত্তিক মজুরি পেয়ে থাকেন।
জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘রুট পারমিট দেওয়ার সময় বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তখন কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নয়, নিয়োগভিত্তিকের কথা উল্লেখ আছে। চালকদের বেতনসহ ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু মালিকরা তা মানছেন না। চুক্তিভিত্তিক হওয়ার কারণেই চালকরা সড়কে যাত্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। সে কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটছে।’
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে পরিবহন চালক ও মালিকদের অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ, মালিকের ভাড়া পরিশোধের পর যা থাকে তা-ই পান চালক। তাই রাস্তায় কার আগে কে যাবেন, কে বেশি যাত্রী তুলবেন- এমন প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রাজধানীর পরিবহন চালকরা। তীব্র যানজট থাকার পরও এ প্রতিযোগিতা দেখা যায় বিভিন্ন রুটে একই প্রতিষ্ঠান কিংবা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবহনের মধ্যে। আবার একই রুটে একই মালিকে গাড়ির সঙ্গেও তাদের প্রতিযোগিতা দেখা যায়।
রোববারের দুর্ঘটনাও একই সূত্রে গাঁথা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দিন দুপুরে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। অনেকেই আবার বাসের জন্য ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস আসলে শিক্ষার্থীরা সেটিতে ওঠার চেষ্টা করে। পাশাপাশি একই পরিবহনের আরেকটি বাস বাম পাশ দিয়ে ঢুকে শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম সজীব নিহত হন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘যদি বেতনভিত্তিক নিয়োগ হতো তাহলে এই চালক যাত্রী ওঠানোর জন্য তার একই কোম্পানির অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতো না।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘আমরা সব মালিককে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছি কোনো বাস চুক্তিভিত্তিক চালানো যাবে না। এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক মালিক তা মানছেন না।’

ঘাতক বাসটি নৌমন্ত্রীর শ্যালকের
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া বাস জাবালে নূরের (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯২৯৭) পরিচালক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের শ্যালক মো. নান্নু মিয়া (৫০)। একই সঙ্গে তিনি মন্ত্রীর খালাতো ভাইও। থাকেন রাজধানীর বনশ্রী এলাকায়। জাবালে নূর পরিবহনের সঙ্গে মাহমুদ হোসেন নামে নৌপরিবহনমন্ত্রীর আরেক আত্মীয়ও জড়িত আছেন বলে জানা গেছে।
বিআরটিএ’র তথ্যমতে, জাবালে নূর পরিবহনের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন। তিনি সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও মন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। পরিবহনটি মো. নান্নু মিয়ার প্রভাবেই সড়কজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে পরিবহন জগতে প্রভাবশালী পরিচালক হিসেবেও নান্নু মিয়ার পরিচিতি আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিবহনের মালিক ও শ্রমিক জানান, আগারগাঁও, মিরপুর ১০, কালশী, বিশ্বরোড, এয়ারপোর্ট, উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুর রুটে জাবালে নূর পরিবহন এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করছে। বর্তমানে এই রুটে কোম্পানিটির ৬০টির মতো বাস চলছে। বাস মালিক সমিতির বিভিন্ন বৈঠকে এই পরিবহনের চালকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও নৌপরিবহনমন্ত্রীর শ্যালক নান্নু মিয়ার কারণে কেউ উচ্চবাচ্য করেন না।

কথা শোনে না ড্রাইভার-হেলপার
জাবালে নূর পরিবহনের গাড়ির চালক ও হেলপারদের দাপট চরমে। অন্য পরিবহনকে তারা তোয়াক্কা করে না। কথায় কথায় হুমকি দিয়ে বলে, ‘এটা মন্ত্রীর গাড়ি’। বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যেখানে-সেখানে পার্কিং, ওভারটেকিং সবই প্রভাবের সঙ্গেই করে জাবালে নূর পরিবহনের চালকরা।
রোববার কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজিব নামে দুই শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয় এ পরিবহন, আহত হয় আরও বারোজন। এ ঘটনায় নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। এর দেড় মাস আগে কুড়িল ফ্লাইভারের কাছে একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে দেয় জাবালে নূর, যেটি এখনও ক্যান্টনমেন্ট থানা হেফাজতে আছে।
তুরাগ পরিবহনের ড্রাইভার শাহিন বলেন, জাবালে নূরের সব গাড়ির ড্রাইভাররা অন্য গাড়িগুলোকে ওভারটেকিং করে, গাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখে। তবে কিছু বললেই হুমকি দিয়ে কথা বলে। তাদের ওভারটেকিং আর প্রতিযোগিতায় দুর্ঘটনা ঘটে।
তবে গাড়ির মালিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মানতে নারাজ। পরিবহনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এএইচএম নোমান বলেন, আমাদের কোনো গাড়ির চালক কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করে না। দুর্ঘটনা ঘটে চালকদের প্রতিযোগিতার কারণে। যেটা সব চালকদের মধ্যেই দেখা যায়। এটা কমালে দুর্ঘটনা কমবে।
দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় আপনাদের পদক্ষেপ কী- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি। যেহেতু নিহত একজনের বাবা মামলা করেছে তাই প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।

চলছে না জাবালে নূর
দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জাবালে নূরের কোনো গাড়ি চলবে না বলে জানিয়েছে মালিকপক্ষ। গতকাল সোমবার পরিবহনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এএইচএম নোমান একথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি। যেহেতু নিহত একজনের বাবা মামলা করেছে, তাই প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। ঘটনার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জাবালে নূরের কোনো গাড়ি চলবে না।
রোববার কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজিব নামে দুই শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয় এ পরিবহন, আহত হয় আরও বারোজন। এ ঘটনায় নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন।
তবে দুর্ঘটনার পরপরই রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা নৌপরিবহনমন্ত্রীকে বলেন, চালকদের স্বেচ্ছাচারিতায় সড়কে নিয়মিত প্রাণ ঝরছে। আজও ঢাকার কুর্মিটোলায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে এদের (চালক-হেলপার) আপনিই প্রশ্রয় দেন। আপনার প্রশ্রয়ে তারা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে।
এর জবাবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘যে অপরাধ করবে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। এই শাস্তি নিয়ে বিরোধিতা করার কারও কোনও সুযোগ নেই।’
এ সময় তিনি অনেকটা চালকদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, ‘ভারতের মহারাষ্ট্রে এক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মারা গেছে, তা নিয়ে কোনও হইচই নেই। অথচ বাংলাদেশে সামান্য কোনও ঘটনা ঘটলেই হইচই শুরু হয়ে যায়।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ