ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাল ভোট কেন্দ্র দখল ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে সিসিক নির্বাচন সম্পন্ন

সিলেট ব্যুরো : ব্যাপক জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, বিরোধী মতের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, কেন্দ্রের সামনে ছাত্রলীগ যুবলীগের সশ্রস্ত্র মহড়া, সাংবাদিকের ওপর হামলা, কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার সিসিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনকে ‘মীর জাফরের নির্বাচন’ বলে অভিযোগ করেছেন। সিলেট নাগরিক ফোরামের প্রার্থী এডভোকেট জুবায়ের বলেছেন, স্বপ্নই থেকে গেল। মেয়র পদে ৪ প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন ও আবু জাফর নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। এছাড়া ৫ কাউন্সিলর প্রার্থী এ নির্বাচনকে ভোট ডাকাতির নির্বাচন আখ্যায়িত করে বর্জনের ঘোষণা করেছেন।
গতকাল সোমবার দিনব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভাগীয় নগরী সিলেটে তান্ডব চালিয়েছে। সকাল ৮টায় ভোট শুরু হয়েছে। এর আধঘন্টা এমসি কলেজ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে ধানের শীষ ও টেবিল ঘড়ি মার্কার এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। এই এলাকায় আজাদ-রঞ্জিত গ্রুপের তান্ডব দিনব্যাপী অব্যাহত ছিল। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিকুর রহমান, সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাল ভোটের মহোৎসব চালায়। জাল ভোট প্রদানের ছবি তুলতে গেলে দৈনিক প্রথম আলোর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মিসবাহ উদ্দিন পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। এ সময় পুলিশ তার মোবাইল কেড়ে নিয়ে জাল ভোট প্রদানের ভিডিও মুছে ফেলে। পরে আহত অবস্থায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার না করে পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামীয়া মাদরাসা কেন্দ্রে টেবিল ঘড়ি মার্কার কর্মী আব্দুল মুক্তাদিরের পায়ে গুলী করে। নগরীর চোহাট্টায় আলীয়া মাদরাসা সেন্টারে ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। রায়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ দলীয় জোটের শরীক সিলেট-২ আসনের জাতীয় পার্টির এমপি এহিয়া চৌধুরী তার ভাই কাউন্সিলর প্রার্থীর টিফিন মার্কায় এবং নৌকা প্রতীকে জাল ভোট প্রদান করেছেন এমন অভিযোগ মেয়র প্রার্থী জুবায়েরের। এ সময় এই কেন্দ্রে দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। যুবলীগ নেতা মুশফিক জায়গিরদারের নেতৃত্বে নগরীর শিবগঞ্জের হাতিম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ ও টেবিল ঘড়ির এজেন্টদের বের করে দিয়ে ঘন্টাব্যাপী নৌকা প্রতীকে জাল ভোট প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নগরীর এমসিক কলেজ কেন্দ্র, শাহজালাল জামেয়া ইসলামীয়া পাঠানটুলা, জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসা, ঝেরঝেরি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাতিম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়, গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাজী জালাল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, লামাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরাবাজার জামেয়া স্কুল এন্ড কলেজ, শিবগঞ্জস্থ স্কলার্স হোম, সোনারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌছ উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা, কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোটাটিকর উচ্চবিদ্যালয়, তেররতন প্রাথমিক বিদ্যালয়, হবিনন্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কেন্দ্রে সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা শফিক চৌধুরী, আজাদুর রহমান আজাদ, পিযুষ কান্তি ও মহানগর ছাত্রলীগের সেক্রেটারি তুষার আহমদের নেতৃত্বে আইনশঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা ব্যালট ছিনতাই করে জাল ভোট প্রদান করার অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন মেয়র প্রার্থী।
এদিকে, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগে দু'টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল সোমবার দুপুরে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহগাজী সৈয়দ বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা (১১৬) ও ২৭ নং ওয়ার্ডের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৩৪) কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন সিসিক নির্বাচনের তথ্য কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা প্রলয় কুমার সাহা।
জানা যায়, শাহগাজী সৈয়দ বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২ শত ২১ জন ও হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৫ শত ৬৬ জন।
আরিফুলের প্রেস ব্রিফিং:
বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘এ ধরনের নির্বাচন আমি আমার এ জীবনেও দেখি নাই। এটা মীরজাফরের নির্বাচন। দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আশফাক আহমদ, আজাদুর রহমান আজাদ, রণজিত সরকার মাইক্রোবাস দিয়ে ঘুরে ঘুরে ভোট জালিয়াতি করেছেন।’ আরিফ অভিযোগ করেন, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার নিজের কেন্দ্র দখল করা হয়েছে। কাজী জালাল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে অনবরত ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। মহিলা পুলিশরা বসে বসে ভোট দিয়েছেন। আমার এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। সকাল থেকে সব কেন্দ্রে ধারাবাহিকভাবে জাল ভোট দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত রাত ২টার পর থেকে কাজী জালাল উদ্দিনে আইনশৃঙখলা বাহিনীর সামনে ভেতরে ঢুকে ব্যালটে সিল মারা হয়।’ আরিফ বলেন, ‘আমরা কার কাছে বিচার দেব? আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ছাড়া এ দেশে বিচার দেয়ার আর জায়গা নাই।’ নগরবাসী ও ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত, আমার বাসায় গিয়ে বৃদ্ধ মহিলারা বলেছেন, ‘তুমি আমাদের মেয়র, আমরা তোমাকে ভোট দিতে গিয়েছিলাম, আমাদের ভোট হাইজ্যাক হয়েছে।’ আমি ভোটারদের প্রতি সম্মান জানাই, তারা এতো বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোট কেন্দ্র ছেড়ে যান নি।’ ‘নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ হলে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতেন বলেও মন্তব্য করেন আরিফ।
এদিকে, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন সিপিবি-বাসদ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবু জাফর। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় সিসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামানের নিকট অভিযোগ করে এ দাবি করেন তিনি। আরেক মেয়র প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী প্রফেসর ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন সিসিক নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন । গতকাল সোমবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। এসময় তিনি বলেন, সিলেট প্রায় সকল কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারা হচ্ছে। সিলেটের মাটিতে এরকম নির্বাচন কলঙ্কজনক।
২২ নম্বর ওয়ার্ডের ৫ প্রার্থীর ভোট বর্জন:
সিলেট সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৫ জনই নির্বাচন বর্জন করে ভোট স্থগিতের আবেদন করেছেন। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর এ আবেদন ও নির্বাচন বর্জন করেন তারা। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুড়ি প্রতীকের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. দিদার হোসেন রুবেল। তিনি বলেন, বহিরাগত মানুষ দিয়ে জোর করে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার কারণে আমরা উপশহরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ৫ কাউন্সিলর প্রার্থীই ভোট বর্জন ও নির্বাচন স্থগিতের আবেদন করেছি। রুবেল জানান, আমাদের পোলিং এজেন্ট বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়া হয়েছে। বারবার অভিযোগ করা সত্বেও এ সময় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করে নি। এমনকি আমাদের কেন্দ্রের ভেতরও ঢুকতে দেয়া হয়নি। আরেক কাউন্সিলর প্রার্থী ফজলে রাব্বী চৌধুরীর স্ত্রী শিপা বেগম সুপা বলেন, আমার চোখের সামনে তিনটি কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী সালেহ আহমদ সেলিমের পক্ষের লোকেরা জোর করে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারেন। এ সময় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এর প্রতিবাদে আমরা নির্বাচন স্থগিতের আবেদন ও ভোট বর্জন করেছি। ভোট বর্জনকারী ৬ কাউন্সিলর প্রার্থী হলেন- সদ্য সাবেক কাউন্সিলর রেডিও প্রতীকের মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, ঘুড়ি প্রতীকের মো. দিদার হোসেন রুবেল, মিষ্টি কুমড়া প্রতীকের ফজলে রাব্বী চৌধুরী, লাটিম প্রতীকের মো. আবু জাফর ও এসি প্রতীকের ইব্রাহীম খান সাদেক। একমাত্র টিফিন ক্যারিয়ার প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট সালেহ আহমদ সেলিম ভোট বর্জন করেননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ