ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে বরিশালে ভোট বর্জন করলেন ৫ প্রার্থী

বরিশাল অফিস : বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়িয়েছেন ৫ প্রার্থী। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। নির্বাচন বর্জনকারী প্রর্থীরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে তাদের অভিযোগ তুলে ধরে নির্বাচন স্থাগিতেরও আবেদন করেন।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট বর্জন করে দুপুর পৌনে ১২টায় সংবাদিক সম্মেলন করেন বিএনপির প্রার্থী এডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার। স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। সোমবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন ও সোয়া ১টার দিকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী রিটানিং কর্মকর্তা বরাবর এই আবেদন করেন। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আবুল কালাম দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জন করেছেন। এর আগে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী ওবায়দুর রহমানও অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। বরিশাল টাউন হলের সামনে সাংবাদিকদের সামনে ইসলামী আন্দোলনের (হাতপাখা প্রতীক) প্রার্থী ওবায়দুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচনি এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ডিজিটাল কারচুপি, নৌকার পক্ষে সিল মারাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছি।’
জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন আবেদনে উল্লেখ করেন, তিনি বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখেছেন, বহিরাগত আওয়ামী লীগের লোকজন প্রশাসনের সহায়তায় মেয়র প্রার্থীর ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকায় সিল দিয়েছে এবং পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ১২৩টি ভোটকেন্দ্রে গ্রহণ করা সব ভোট বাতিলসহ স্থগিত করার দাবি জানান।
এদিকে একই দাবিতে করা একটি আবেদন মনীষা চক্রবর্তী রিটানিং কর্মকর্তা বরাবর জমা দিয়েছেন। পরে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানান।
এদিকে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বরিশাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট গ্রহণে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করেছেন। এর আগেই ইসলামী আন্দোলন ও বিএনপি ভোট বর্জন করেছে। উল্লেখ্য, বরিশাল সিটি করপোরেশনে সাতজন মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বশিরুল হক ঝুনু নামের স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন থেকে আগেই সরে যান। বাকি ছয়জন মাঠে ছিলেন।
পুরো ব্যালট বইয়ে নৌকার সিল
বরিশাল মহানগর পশ্চিম কাউনিয়া এলাকার সৈয়দা মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে নেয় আওয়ামী লীগের লোকজন। কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ ভোটারদের দীর্ঘ সারি থাকলেও তাঁরা ভেতর ঢুকতে পারেনি। ভেতরে শতাধিক ব্যক্তি মেয়র পদের ব্যালটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারে। এই স্কুলে দু’টি কেন্দ্র। রয়েছে ১৫টি বুথ।
সোমবার কেন্দ্রের চার নম্বর বুথ (পুরুষ) গিয়ে দেখা গেছে- টেবিলের ওপর মেয়র পদে ব্যালট বইয়ের মুড়িটি ভাঁজ করা অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি ব্যালটে নৌকা প্রতীকের ওপর সিল মারা। ওই বুথের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তৌহিদা খানম বলেন, একদল লোক এসে জোর করে এই ব্যালট বইয়ে সিল মেরে গেছে। সঙ্গে সিল-প্যাডও নিয়ে গেছে।
এই কেন্দ্রের তিন নম্বর বুথেও ভোট নেওয়া বন্ধ থাকে। ওই বুথের সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, মেয়রের ব্যালটের পুরো মুড়িটাই একদল লোক ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তাই ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার। তাঁর ভোট দিতে আসার পরে শুরু হওয়া উত্তেজনা এখনো আছে। মূলত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ॥ সাংবাদিকসহ আহত ১০
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সব সংষর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। সকাল সোয়া নয়টায় নগরীর ইউনিয়ায় মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্রে ধানের শীষ ও নৌকা প্রতিকের সমর্থকদেও মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাজিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ সময় বেশ কিছুক্ষন ভেখাট গ্রহণ বন্ধ থাকে। পাশাপাশি বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সদররোডে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ ও বাসদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহাবুব সদররোড দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় তার কাছাকাছি দূরত্বে বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী ও নেতাকর্মী নিয়ে আসছিলেন। হঠাৎ করেই সিটি কলেজের গেট থেকে তাদের উদ্দেশ্য করে কতিপয় যুবক ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এ সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাপারসন আহত হন।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের দাবি, নৌকার সমর্থকরা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমাদের ও বাসদের লোকদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এদিকে নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জয়নাল আবেদীন ও এটি এম শহীদুল¬াহ কবিরের সমর্থকদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে প্রথমে মারামারি ও পরে সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যা নগরের ফজলুল হক অ্যাভিনিউ থেকে সদর রোডে ছড়িয়ে পরে। প্রায় একঘণ্টার ব্যবধানে বিজিবি ও র‌্যাব-পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পাশাপাশি নগরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের গোরস্থান রোডে সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডি.ডি এফ সিনিয়র ও হাফেজি মাদরাসায় এবং নগরের দক্ষিণ আলেকান্দার কিশোর মজলিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইভিএম এ ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। এছাড়াও ভোট জালিয়াতির অভিযোগে এরইমধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বিএনপির প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ