ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিচারহীনতার কারণে কমছে না মানব পাচার

ইবরাহীম খলিল : বিচারহীনতার কারণে বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার কমানো যাচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সুপ্রিমকোর্টের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে এ পর্যন্ত মানবপাচারের মামলা হয়েছে ৪ হাজার ১২৮টি, যার মধ্যে ১৫৭টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং ১৯টি মামলা বদলি হয়েছে। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৯৫২টি মামলা।
অন্যদিকে পুলিশ হেডকোয়াটারের হিউম্যান ট্রাফিকিং মনিটরিং সেলের তথ্য মতে, ২০১২ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ২০৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৭টি মামলা দায়ের হয়েছে শুধু এই বছরেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবির তথ্য মতে, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত মামলা দায়ের করেছে ৫৭টি।
মানবপাচার দমনে বাংলাদেশ সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিলেও তা কাজে লাগছে না বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। জুন মাসে প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ এ বছরেও টায়ার টু’র নিচের স্তর টায়ার টু নজরদারির তালিকায় রয়েছে। এর আগে ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় স্তর টায়ার-টু তে। ২০১৭ সালে এক ধাপ নামিয়ে বাংলাদেশকে টায়ার টু’র ‘নজরদারিতে থাকা দেশের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই অবস্থার পরিবর্তন এ বছরেও হয়নি।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে মাত্র একজন পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। পাচারের শিকার যারা তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থার বিষয়ে আদালতের আদেশ থাকলেও তাও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
এছাড়াও কারণ হিসেবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে. জনশক্তি রফতানিতে সরকার রিক্রুটমেন্ট ফি নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রম রফতানিকারক চুক্তি স্বাক্ষর করার পরও উচ্চ অভিবাসন খরচ অনুমোদন অব্যাহত রাখে এবং অবৈধভাবে যারা বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর কাজ করে তাদের নজরদারির মধ্যে আনায় ব্যর্থ। সাব এজেন্টদের কারণেই শ্রমিকদের পাচারের শিকার হতে হয় বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
মানবপাচার পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশগুলোকে তিনটি টায়ারে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে যেসব দেশ ট্রাফিকিং ভিকটিমস প্রোটেকশন অ্যাক্টসের ন্যূনতম মান পূরণে সক্ষম হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, সেসব দেশকে প্রথম স্তর বা টায়ার ওয়ানে রাখা হয়। টায়ার-টু আবার দুই ভাগে বিভক্ত, টায়ার-টু এবং টায়ার-টু ওয়াচলিস্ট। সবশেষে রয়েছে তৃতীয় স্তর বা টায়ার-থ্রি। বাংলাদেশকে ফের টায়ার টু নজরদারির তালিকায় নিয়ে আসার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বিচারহীনতার কথা।
ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দফতর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ২১৫ জন রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে ১১ হাজার ৭১৫টি আবেদন বাতিল করা হয়।
ইউএনএইচসিআর এর মতে ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ স্থানে।
এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) বাংলাদেশ থেকে ইতালির অনিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর সম্প্রতি এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার মাত্রা চরম আকারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এই মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। এমনকি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তালিকায় ২০১৭ সালের প্রথমভাগে অবস্থান করে। এছাড়া এতে আরও বলা হয়, ৯৬.৭ শতাংশ অভিবাসী কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরের পথটি ব্যবহার করে লিবিয়া উপকূল হয়ে ইতালি যায়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্য মতে, ১৯৭৬ সালে থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত ১১ মিলিয়ন বাংলাদেশি অভিবাসিত হয়েছে। যার মধ্যে কাজের উদ্দেশ্যেই ২০১৭ সালে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশি। এছাড়া ব্র্যাক আরও জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত  প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ গিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জন সুরক্ষা বিভাগের তথ্য বলছে প্রায় ৪ হাজারের ওপর মামলা হলেও সাজা হয়েছে মাত্র একটি মামলায়, বিচার হয়েছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ।
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এক প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতি বছর ৩০ জুলাই দিনটিকে বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটিকে কেন্দ্র করে নানা কর্মসূচি পালন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ