ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

২১ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা সাবেক এমডিকে দুদকে তলব

স্টাফ রিপোর্টার : বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম নূরুল আওরঙ্গজেবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুদক থেকে পাঠানো এক চিঠিতে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির বর্তমান এই এমডিকে তলব করা হয়েছে। দুদকের তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-পরিচালক শামছুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে সাবেক এমডি আওরঙ্গজেবকে তলব করা হয়েছে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তবে আওরঙ্গজেব কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তকালেই ২৬ জুলাই থেকে ৪২ দিনের ছুটিতে রয়েছেন। হজ্ব পালনের জন্য তার এই ছুটি মঞ্জুর করেছে পেট্রোবাংলা।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, আওরঙ্গজেব হজে¦র জন্য ছুটি নিলেও এখনও তিনি যাননি। আর এ জন্যই তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য আগে আগে তাকে তলব করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে একলাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা দুর্নীতির ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামী ১৯ জনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগে দুদক নিষেধাজ্ঞা দিলেও এই তালিকায় আওরঙ্গজেবের নাম রাখা হয়নি।
কয়লা উধাওয়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে দুদক। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা বলা হয়েছে। কমিটির প্রধান উপ-পরিচালক শামসুল আলম এবং অন্য দুই সদস্য হলেন দুদকের সহকারী পরিচালক এএসএম সাজ্জাদ হোসেন ও উপ-সহকারী পরিচালক এএসএম তাজুল ইসলাম।
২১ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
জালিয়াতির মাধ্যমে ১ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন কয়লা খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মামলার ১৯ আসামীসহ পেট্রোবাংলার ২১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞায় চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে দুদক উপপরিচালক মো. শামসুল আলম সই করা পাঠানো পৃথক চিঠিতে কর্মকর্তাদের বিদেশ যাত্রায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করা হয়েছে।
তার সাথে এ ঘটনায় ১ আগস্ট দুদকে তলব করা হয়েছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম নুরুল আওরঙ্গজেবকে।
নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ১৯ আসামী হলেন-সাময়িক বরখাস্তকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুর-উজ-জামান চৌধুরী, উপমহাব্যবস্থাপক (স্টোর) এ কে এম খালেদুল ইসলাম, সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ, সদ্য বিদায়ী কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাশেম প্রধানীয়া, ব্যবস্থাপক (এক্সপ্লোরেশন) মোশাররফ হোসেন সরকার, ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার, ব্যবস্থাপক ( প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট) অশোক কুমার হালদার, ব্যবস্থাপক ( মেইনটেনেন্স অ্যান্ড অপারেশন) আরিফুর রহমান, ব্যবস্থাপক (ডিজাইন, কন্সট্রাকশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) জাহিদুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপক ( সেফটি ম্যানেজমেন্ট) একরামুল হক, উপব্যবস্থাপক (কোল হ্যান্ডলিং ম্যানেজমেন্ট) মুহাম্মদ খলিলুর রহমান।
এদের মধ্যে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) প্রাক্তন এমডি হাবিব উদ্দিন আহমেদ, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম, খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও ডিজিএম (ভান্ডার) এ কে এম খালেদুল ইসলামকে গত ২৬ জুলাই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এছাড়া কোল মাইনিং কোম্পানির প্রাক্তন এমডি কামরুজ্জামান ও আমিনুজ্জামানের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই রাত ১২টায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। যা পরবর্তীতে দুদক তদন্ত শুরু করে।
প্রায় ২০০ কোটি টাকার কয়লা আত্মসাতের ঘটনায় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের ( পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. শামসুল হাসান মিয়ার বক্তব্যও নিয়েছে দুদক।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাগজে-কলমে বেশি কয়লার মজুত দেখিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খতিয়ে দেখতে ২৩ জুলাই তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল। দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন সহকারী পরিচালক এ এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও উপসহকারী পরিচালক এ এস এম তাজুল ইসলাম।
অভিযোগের বিষয়ে দুদক জানায়, ২০০৫ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু করা হয়। দীর্ঘ ১৩ বছরে কয়লা উত্তোলন হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টন। বর্তমানে কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুত থাকার কথা ১ লাখ ৩০ হাজার টন। কিন্তু বাস্তবে কয়লার মজুত পাওয়া গেছে ১৪ হাজার টনের মতো। ১ লাখ ১৬ হাজার টনের মতো কয়লার কোনো হদিস নেই। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন থেকে একটি চক্র চুরি করে খোলা বাজারে এসব কয়লা বিক্রি করে দিয়েছে।
পিডিবির সূত্র বলছে, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটো পুরনো ও একটি নতুন। পুরনো দুটির প্রতিটি ১২৫ মেগাওয়াটের। তবে এগুলোর বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে এক নম্বর ইউনিটটি মেরামতের জন্য বন্ধ রয়েছে। নতুনটির উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৪ মেগাওয়াট। চালু দুটি ইউনিট দিয়ে গত জুন মাসের প্রথম দিকে গড়ে ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল। কয়লা খনির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরের দিন অর্থাৎ ১৭ জুন এ দুই ইউনিট থেকে ৩৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। দুই ইউনিট চালাতে দৈনিক সাড়ে ৩ হাজার টন কয়লা লাগে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় কয়লার সরবরাহ হ্রাস পেতে থাকে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদনও কমতে থাকে। ২৫ জুন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ২৩০ মেগাওয়াট। পরে ২৯ জুন থেকে কর্তৃপক্ষ পুরনো ইউনিটটি বন্ধ করে শুধু নতুন ইউনিটটি চালু রাখে। ১৫ জুলাই এই ইউনিট থেকে ১৯০ মেগাওয়াট এবং ১৯ জুলাই শুক্রবার ১৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে যতটুকু মজুত রয়েছে, তা দিয়ে একটি ইউনিট চালালেও আর দুই-তিন দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। নতুন করে কয়লা উত্তোলন শুরু হতে পারে আগস্টের শেষে। ফলে প্রায় এক মাস কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ